kalerkantho


পল্টনে হামলায় এরা কারা?

নিজস্ব প্রতিবেদক    

১৫ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



পল্টনে হামলায় এরা কারা?

রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গতকাল সংঘর্ষের একপর্যায়ে হেলমেট ও মুখোশ পরা যুবকরাও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে অংশ নেয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

লাঠি হাতে বেশ কিছু যুবক পুলিশের দিকে দফায় দফায় তেড়ে যাচ্ছিল। এদের একটি অংশ একপর্যায়ে শুরু করে গাড়ি ভাঙচুর। পুলিশ গাড়ি ছেড়ে দূরে সরে গেলে হেলমেট পরা অন্তত তিনজন পুলিশের প্যাট্রল কারের ওপর উঠে ভাঙচুর চালায়। গাড়ির ওপর লাফাতে লাফাতে তারা স্লোগান দেয়, ‘শেখ হাসিনার গদিতে, আগুন জ্বালো একসাথে।’ কালো শার্ট পরা এবং বুকের বোতাম খোলা এক যুবক ভাঙচুর করছিল রীতিমতো বীরের ভঙ্গিতে, যা অনেক দর্শক ভিডিও করছিল। মুখোশ পরে খালি গায়ে ভাঙচুর করে আরেকজন। সবুজ টি-শার্ট পরা একজন খোলা মুখেই ছিল। এরই মধ্যে একটি ঘটনা ঘটে। সাদা শার্ট পরা এবং মুখ খোলা এক যুবক এগিয়ে এসে পুলিশের প্রাইভেট কারটিতে দিয়াশলাই দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িটি। বিকেল হতে না হতেই অগ্নিসংযোগের ওই ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়।

রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কাছে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় হেলমেট পরা বেশ কিছু যুবককে লাঠি হাতে বেপরোয়া ভঙ্গিতে দেখা যায়। কালের কণ্ঠ’র আলোকচিত্রীর তোলা অসংখ্য ছবির ভিড়ে একটি ছবিতে ধরা পড়ে একই যুবকের দুটি হামলায় অংশগ্রহণের দৃশ্য। মাথায় ‘খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই’ লেখা ব্যাজ, বুকেও দলীয় ব্যাজ লাগানো। দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে তোলা ছবিতে তাকে পুলিশের কালো গাড়িটি ভাঙচুরে অংশ নিতে দেখা যায়। ১টা ৩৭ মিনিটের ছবিতে একই যুবক ক্যামেরায় ধরা পড়ে একটি ভ্যান গাড়ি ভাঙার দৃশ্যে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, পুলিশের দুটি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া একটি এপিসি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলাকারীদের চিহ্নিত করতে হামলার ছবি ও ভিডিও ফুটেজ দেখা হচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী। তবে এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ।

যে যুবকটি পুলিশের সাদা গাড়িতে আগুন দিয়েছিল এক পক্ষ ফেসবুকে তাকে গুলশান থানা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক অপু বলে দাবি করছিল। অন্য পক্ষের দাবি, অগ্নিসংযোগকারী পল্টন থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শাহজালাল খন্দকার।

এ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক দেলোয়ার শাহজাদা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই ছবির যুবকটি ছাত্রলীগের কেউ নয়। গুলশান থানার ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদকের নাম মাহবুবুর রহমান মিঠুন।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে, বিএনপির নেতাকর্মীদের ভেতর থেকে বের হয়েই একটি দল হামলা শুরু করে। কয়েকজন হেলমেট ছাড়াই প্রথমে সংঘর্ষে অংশ নেয়। একপর্যায় হেলমেট পরা কিছু যুবক পুলিশের গাড়িতে আক্রমণ করে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পুলিশের গাড়ি সরিয়ে নেওয়া নিয়ে তর্ক থেকে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় পুলিশ প্রথমে শান্ত ছিল। তবে এরই মধ্যে দলবেঁধে পুলিশকে ধাওয়া দেওয়া হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অ্যাকশনে যায়। তবে পুলিশ পেরে উঠতে না পেরে কাকরাইল মোড়ের দিকে চলে যায়। এই সুযোগে তাদের গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়। বেশি টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়।

জানতে চাইলে ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিএনপির নেতাকর্মীদের ভেতর থেকেই এই হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ঘটনায় মামলার তদন্ত করে হামলাকারীদের শনাক্ত করা হবে। অনেক ছবি আছে। আর ঘটনা অনেকটাই প্রকাশ্যে ঘটেছে।’ তিনি দাবি করেন, ‘পুলিশ শুধু তাদের রাস্তা থেকে সরে যেতে বলেছিল, যেন যান চলাচল স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু তারা এ কথা না শুনে হঠাৎ করে বিনা উসকানিতে পুলিশের ওপর হামলা করে। পরে তারা আমাদের (পুলিশের) দুটি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়। পুলিশের কয়েকজন সদস্যও এ সময় আহত হয়।’

বিকেলে নাইটিঙ্গেল হোটেল মোড়ের কাছে থাকা ফুটপাতের এক দোকানি পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হঠাৎ করেই হৈচৈ গণ্ডগোল লেগে যায়। তখন আমরা সরে যাই। দূর থেকে দেখি বিএনপির ইয়াং কিছু ছেলে পুলিশের সঙ্গে ইট মারামারি করছে। পুলিশ টিয়ার শেল মারে। ওই সময় কয়েকজন পুলিশের গাড়ি ভাঙে। আগুনও দেয়। এরা বিএনপির লোকই। তখন অন্য কোনো গ্রুপ সেখানে ছিল না।’ ওই দোকানি আরো দাবি করেন, ‘গণ্ডগোলের আগে ও পরে আমি ওই ছেলেদের পার্টির অফিসের কাছে দেখেছি। এরাই হেলমেট পরে আসছে। গণ্ডগোলের পরে এরা গলি দিয়ে সরে যায়।’

ওই চা দোকানির মতোই বক্তব্য দেন আরেক প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি বিএনপি অফিসের উল্টোদিকের একটি গাড়ির শোরুমের কর্মী। তিনি বলেন, ‘এখানে থার্ড পার্টি ছিল না। আর ভাঙচুর ও আগুন তো প্রথমেই কিছুক্ষণের মধ্যে হয়েছে। তখন তারাই (বিএনপির নেতাকর্মী) ছিল।’  

ডিএমপির আহ্বান : সাদা শার্ট পরিহিত ওই যুবককে ধরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গতকাল সন্ধ্যায় কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের ফেসবুক পেজে ছবি প্রকাশ করে তার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে পুলিশের এই বিশেষ ইউনিট। সিটিটিসির উপকমিশনার মহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগকারী ওই ব্যক্তিকে আমরা খুঁজছি। নাগরিকদের অনুরোধ করছি, তার বিষয়ে কারো কাছে কোনো তথ্য থাকলে ডিএমপিকে জানান।’



মন্তব্য