kalerkantho


একঝাঁক তারকার ‘নৌকা-দৌড়’

তৈমুর ফারুক তুষার   

১৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



একঝাঁক তারকার ‘নৌকা-দৌড়’

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বনামধন্য একঝাঁক তারকা। তাঁদের মধ্যে খেলোয়াড়, রুপালি পর্দার তারকা যেমন আছেন, তেমনি আছেন চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, সাবেক আমলা ও সামরিক কর্মকর্তাসহ খ্যাতিমান ব্যক্তিরা। গতকাল সোমবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত অন্তত দুই ডজন তারকা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। আগামীকাল বুধবার ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হবে।

এসব তারকার মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন ক্ষেত্রে খ্যাতিমান অনেকেই আমাদের মনোনয়ন চেয়েছেন। তাঁদের বিষয়ে দলের মনোনয়ন বোর্ডের সভায় সিদ্ধান্ত হবে। যেসব আসনে তাঁরা মনোনয়ন চেয়েছেন সেখানে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা ও জয়ের সম্ভাবনা কেমন সেসব বিবেচনা করে মনোনয়ন দেওয়া হবে।’

রুপালি পর্দার তারকাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন চিত্রনায়ক আকবর হোসেন পাঠান (নায়ক ফারুক) গাজীপুর-৫, অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী ঢাকা-১৭, অভিনেত্রী শমী কায়সার ফেনী-৩, রোকেয়া প্রাচী ফেনী-৩, নায়ক শাকিল খান বাগেরহাট-৩, অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতি ময়মনসিংহ-৩, অভিনেতা মনোয়ার হোসেন ডিপজল ঢাকা-১৪।

কণ্ঠশিল্পী ও সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম মানিকগঞ্জ-২, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম টাঙ্গাইল-৬ আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। জানতে চাইলে মহিলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক রোকেয়া প্রাচী বলেন, ‘আমি হুট করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিই নাই। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাঠ গোছানোর কাজ করছি, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছি। এলাকার মানুষের জন্য কিছু করতে চাইলে জনপ্রতিনিধি হওয়ার বিকল্প নেই। দল যদি আমাকে মানুষের কল্যাণে কাজের জন্য যোগ্য মনে করে তবে মনোনয়ন দেবে। আমি আমার সাধ্যমতো কাজ করব। আমি মনোনয়ন যদি নাও পাই তবু নৌকার পক্ষে কাজ করব।’

জ্যোতিকা জ্যোতি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসলে আমি আমার দেশ ও এলাকার জন্য কাজ করতে খুব আগ্রহী। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারলে কাজগুলো আরো বড় আকারে করার সুযোগ থাকে। আমার রাজনীতিতে আসার বিষয়ে আমার চেয়ে এলাকার মানুষই বেশি আগ্রহী। এলাকার মানুষ যোগ্য, আধুনিক, শিক্ষিত এবং জনগণের জন্য নিবেদিত নেতৃত্ব চায়। সেই শূন্যতার জায়গা থেকে তারা যখন আমাকে নিয়ে এগোতে চায় তখন আমার ইচ্ছাগুলোও ডানা মেলে। নমিনেশন আমি বা যেই পাক, নৌকার জন্য কাজ করে যাব।’

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা নড়াইল-২ আসনের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করে এরই মধ্যে দেশব্যাপী আলোচনার ঝড় তুলেছেন। তিনি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের আগে গণভবনে গিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার আশীর্বাদ নিয়েছেন।

ফেনী-৩ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন আলোচিত এক-এগারোর সময়ের প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তা লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তিনি গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন। পরে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসে হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন।

খ্যাতিমান ব্যবসায়ীদের অনেকেই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি সালমান এফ রহমান ঢাকা-১ আসনে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। নিটল-নিলয় গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সেলিমা আহমাদ কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন।

এ ছাড়া এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক মাসুদ পারভেজ খান, তাবারুকুল তোসাদ্দেক খান টিটু, আমিনুল হক শামীমসহ আরো একাধিক পরিচালক আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। এর বাইরে ব্যবসায়ী নেতা এস এম মান্নান কচি, আতাউর রহমান খান আখির, আসলাম সানিও মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন।

বিভিন্ন পেশায় নিজের অবদানের মাধ্যমে খ্যাতি অর্জন করেছেন এমন অনেকেই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, খ্যাতিমান চিকিৎসক প্রাণ গোপাল দত্ত কুমিল্লা-৭ আসনে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন হবিগঞ্জ-৪ আসনে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ কিশোরগঞ্জ-২ আসনে মনোনয়ন দৌড়ে নেমেছেন।

জানতে চাইলে অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডাক্তার হয়ে আমি সারা জীবন মানুষের সেবা করে আসছি। এটা অব্যাহত রাখতে চাই। কুমিল্লা-৭ আসন থেকে দলের মনোনয়ন চাইব। দলের সভাপতি মনোনয়ন দিলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করব।’ 

মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী ড. ফরাসউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকার সব নেতাকর্মী আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। পরিকল্পিতভাবেই কাজ এগোচ্ছে। সবার সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে মতামত নিয়ে নির্বাচনী কৌশল প্রণয়ন করব। আমি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। ফলে রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে আমার অসুবিধা হবে না।’

সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘গত রবিবার মনোনয়ন ফরম কিনে ওই দিনই জমা দিয়েছি। এরপর গণভবনে গিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে আমার মনোনয়ন নিশ্চিত করেছেন। গত দুই বছর নির্বাচনী এলাকার এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে যাইনি। নির্বাচনী প্রচারণার সময়ে মানুষের ব্যাপক সাড়া পেয়েছি।’

১২ কোটি টাকার মনোনয়ন ফরম বিক্রি

আওয়ামী লীগের দপ্তর সূত্র জানায়, মনোনয়নপ্রত্যাশীরা চার হাজার ২৩টি ফরম সংগ্রহ করেছেন। প্রতিটি ফরমের মূল্য ছিল ৩০ হাজার টাকা। সে হিসাবে ফরম বিতরণ থেকে ১২ কোটি ছয় লাখ ৯০ হাজার টাকা আওয়ামী লীগের তহবিলে জমা হয়েছে; যা দশম জাতীয় নির্বাচনে ফরম বিক্রি থেকে প্রাপ্ত টাকার প্রায় দ্বিগুণ। গতবার ফরম বিতরণ করে প্রায় সাত কোটি টাকা আয় করে দলটি।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম জমা নেওয়া গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা আজ বিকেল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে আজ কোনো মনোনয়ন ফরম বিতরণ করা হবে না। আগামীকাল বুধবার সকাল ১১টা থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেবে আওয়ামী লীগের নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ড। এতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করবেন।



মন্তব্য