kalerkantho


আলেমসমাজকে শেখ হাসিনা

অপপ্রচারে কান দেবেন না

► ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করলে বিচার হবে, আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না
► শোকরানা মাহফিলে ‘কওমি জননী’ উপাধি পেলেন শেখ হাসিনা
► আল্লামা শফী বললেন, প্রধানমন্ত্রীর অবদান ইতিহাসে সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৫ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



অপপ্রচারে কান দেবেন না

কওমি মাদরাসা সনদের স্বীকৃতি দেওয়া উপলক্ষে গতকাল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আলেম-উলামা আয়োজিত শোকরানা মাহফিল মঞ্চে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : বাসস

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রশ্নে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির পুনরুল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এই বাংলাদেশে কোনো জঙ্গিবাদের স্থান হবে না। সন্ত্রাসের স্থান হবে না। মাদকের স্থান হবে না। দুর্নীতির স্থান হবে না। বাংলাদেশ হবে একটি শান্তিপূর্ণ, উন্নত, সমৃদ্ধিশালী দেশ।’ ইসলামকে শান্তির ধর্ম হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গুটিকতক লোক ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে আজকে সারা বিশ্বে ইসলাম ধর্মকে বদনাম দিচ্ছে। অথচ ইসলাম কখনো সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে না।’

অপপ্রচার ও গুজবে কান না দিতে আলেম-উলামাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা জানি, সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা রকম অপপ্রচার করা হয়। এগুলো বিশ্বাস করবেন না। এই অপপ্রচার প্রতিরোধে এরই মধ্যে আমরা সাইবার ক্রাইম আইন তৈরি করেছি। কেউ যদি কোনো ধরনের অপপ্রচারে লিপ্ত হয় তাহলে সাথে সাথে সেই আইনে তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের সম্মুখীন করা হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের ধর্ম ইসলাম এবং নবী করিম (সা.) সম্পর্কে কেউ কোনো কটু কথা বললে সেই আইন দ্বারাই তার বিচার হবে।’

আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আইন নিজেদের হাতে তুলে নেব না, আইন দ্বারাই তাদের বিচার করে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে দেব, যাতে কখনো তারা এ ধরনের অপপ্রচার চালাতে না পারে।’

প্রধানমন্ত্রী গতকাল রবিবার দুপুরে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কওমি মাদরাসার আলেম ও শিক্ষার্থীদের শোকরানা মাহফিলে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন। কওমি মাদরাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স বা স্নাতকোত্তর সমমানের স্বীকৃতি দিয়ে সরকার জাতীয় সংসদে আইন পাস করায় কৃতজ্ঞতা জানাতে ‘হাইআতুল উলয়া লিল জামিয়াতিল কওমী বাংলাদেশ’ ওই শোকরানা মাহফিলের আয়োজন করে।

শোকরানা মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন হাইআতুল উলয়া লিল জামিয়াতিল কওমী বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান ও হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী। কওমি শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই অবদান ইতিহাসে সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে। মাহফিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধিতে ভূষিত করেন কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড গওহরডাঙ্গার চেয়ারম্যান ও গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদরাসার মহাপরিচালক মুফতি রুহুল আমিন।

শোকরানার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই শোকরানা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের। যত দিন বাঁচব, মানুষের যাতে সেবা করে যেতে পারি, কল্যাণ করে যেতে পারি, এটাই আল্লাহর কাছে আমার চাওয়া।’

হাতে গোনা কিছু লোক ধর্মের নামে জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে ইসলাম ধর্মের ‘বদনাম দেয়’—এমন মন্তব্য করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমি যখনই কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যাই, কেউ যদি বলে ইসলামিক টেররিস্ট, আমি সাথে সাথে প্রতিবাদ জানাই। আমি বলি, এটা বলতে পারবেন না। কারণ সবাই টেররিজমে বিশ্বাস করে না বা সন্ত্রাসে বিশ্বাস করে না। যারা সন্ত্রাসী তাদের কোনো ধর্ম নাই। তাদের কোনো দেশ নাই, তাদের কোনো সমাজ নাই। তারা হচ্ছে সন্ত্রাসী, জঙ্গিবাদী। যারা সত্যিকার ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করে, তারা কখনো সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদী হতে পারে না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের শাস্তি বিঘ্নিত হোক তা আমরা চাই না। দেশে শান্তি থাকলেই উন্নতি হবে। উন্নতি থাকলে সবাই লাভবান হবে।’ তিনি বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা আমাদের অনেক নেয়ামত দিয়েছেন এবং তা দিয়েই আমরা বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।’

সরকারপ্রধান ওই সময় সমাজে শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে আলেম-উলামাদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একসময় এই উপমহাদেশের মুসলমানদের শিক্ষা গ্রহণের একমাত্র ক্ষেত্রই ছিল এই কওমি মাদরাসা। এই কওমি মাদরাসার মধ্য দিয়েই মুসলমানদের শিক্ষা গ্রহণের শুরু। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন যাঁরা শুরু করেছিলেন, তাঁদের হাত ধরেই এই কওমি মাদরাসার শিক্ষার প্রচলন; যাঁদের আমরা সব সময় সম্মান করি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজকে কওমি মাদরাসার যে স্বীকৃতি এটা শুধু স্বীকৃতি নয়, এ দেশের লাখ লাখ ছেলে-মেয়ে কওমি মাদরাসায় শিক্ষা গ্রহণ করছে। শুধু তাই নয়, সব থেকে বড় কাজ আপনারা যেটা করছেন—যারা এতিম হয়ে যাচ্ছে, যারা হতদরিদ্র, যাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই, আপনারা তাদেরকে আশ্রয় দেন, খাদ্য দেন, শিক্ষা দেন। এতিমকে আশ্রয় দিচ্ছেন, এর থেকে বড় কাজ আর কী হতে পারে। কাজেই সেখানে আপনাদের স্বীকৃতি দেব না এটা তো কখনো হতে পারে না।’ তিনি বলেন, তাঁর সরকার যে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে সেখানে ধর্মীয় শিক্ষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কারণ তিনি মনে করেন, একটা শিক্ষা তখনই পূর্ণাঙ্গ হয় যখন এর সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষাও গ্রহণ করা হয়।

আর কেউ যাতে বন্ধ করতে না পারে সে জন্য আইন করেছি : লাখ লাখ ছেলে-মেয়ে শিক্ষা গ্রহণ করছে, সেখানে তাদের ডিগ্রির যদি স্বীকৃতি না থাকে তাহলে তারা কোথায় যাবে, কী করে চলবে—এই প্রশ্ন উত্থাপন করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘তারপর হাইআতুল উলয়া লিল জামিয়াতিল কওমী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যখন বলা হলো দাওরায়ে হাদিস মাস্টার ডিগ্রির যেন সমমর্যাদা পায়, আমরা কিন্তু সেটা করে দিলাম পার্লামেন্টে আইন পাস করে। কারণ, আইন পাস না করলে এটার বাধ্যবাধকতা থাকে না।’ তিনি বলেন, ‘আর কেউ ক্ষমতায় এলে সাতাত্তর সালের মতো যাতে এটা আর কেউ বন্ধ করতে না পারে সে জন্য আমরা আইন পাস করেছি।’ তিনি বলেন, ‘ঘাতকচক্র ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে কেবল হত্যাই করে নাই সাতাত্তর সালে এই কওমি মাদরাসার স্বীকৃতিটা বন্ধ করে দেয়, বাতিল করে দেয়।’

প্রধানমন্ত্রী ওই সময় এই শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা এমনভাবে কাজ করবেন যাতে এই মাদরাসা থেকে যাঁরা শিক্ষা নেন তাঁরা যেমন মাস্টার ডিগ্রির স্বীকৃতি পেলেন তেমনি তাঁরা দেশ ও জাতির জন্য যেন কাজ করতে পারেন।’ তিনি বলেন, ‘এই দেশকে যেন আমরা উন্নত করতে পারি। এই দেশে আর একটা মানুষও যাতে গরিব না থাকে, ক্ষুধার জ্বালায় এবং রোগে ভুগে যেন কেউ কষ্ট না পায়।’

আমি বললাম, সংবর্ধনা নয়, বরং এটা হবে শুকরিয়া : শোকরানা মাহফিলে যোগদান করতে পারায় শেখ হাসিনা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন। তিনি বলেন, ‘যাঁরা দ্বিন ইসলামের খেদমত করছেন তাঁদের মধ্যে উপস্থিত হতে পারাটা সৌভাগ্যের বিষয়। আমাকে যখন আল্লামা শফী সাহেব বললেন যে এই বিল আমরা পার্লামেন্টে পাস করেছি, তিনি একটি সংবর্ধনার আয়োজন করবেন; তখন আমি বললাম, সংবর্ধনা আমার জন্য নয়, বরং এটা হবে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করার মাধ্যমে।’

বিশ্ব ইজতেমার জায়গা দিয়ে যান জাতির পিতা : স্বাধীনতার পর ইসলামের প্রসারে জাতির পিতার পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি এ দেশে ইসলামের প্রসারে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে যান, টঙ্গীতে যে বিশ্ব ইজতেমা হয় সে জন্য জায়গাটিও জাতির পিতাই বরাদ্দ দিয়ে যান এবং বাংলাদেশে যাতে বিশ্ব ইজতেমা হতে পারে আন্তর্জাতিকভাবে তিনিই এটা আদায় করে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘ওআইসির সদস্যপদও পেয়েছিলাম জাতির পিতার উদ্যোগে এবং জাতির পিতা একটি জাহাজ ক্রয় করে হাজিদের স্বল্প খরচে হজে প্রেরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাঁরই কন্যা হিসেবে এ দেশের স্বাধীনতাকে অর্থবহ করা এবং বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা এবং তাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাকে আমি আমার কর্তব্য বলে মনে করি। আর সেই দায়িত্ববোধ থেকেই দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘আমার বাবা আমাদের সব সময় এই শিক্ষাই দিয়েছেন যে মানুষের সেব করো আর সাধারণভাবে জীবন যাপন করো।’

প্রধানমন্ত্রী ওই সময় পঁচাত্তরের বিয়োগান্তক অধ্যায় স্মরণ করে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘মাত্র ১৫ দিন আগে বিদেশ যাওয়ার আগে অনেক কেঁদেছিলাম। আর ১৫ দিন পরেই শুনি আমাদের আর কেউ নাই, আমরা এতিম, নিঃস্ব, রিক্ত হয়ে গেছি।’ তিনি বলেন, ‘তখন যারা ক্ষমতা দখল করেছিল তারা আমাদের দেশে পর্যন্ত ফিরতে দেয়নি। ৬টা বছর বিদেশে রিফিউজির মতো থাকতে হয়েছে। আর আমার বাবা তো সৎপথে জীবন যাপন করতেন কাজেই তিনি তো আর দেশে-বিদেশে পয়সা বানান নাই যে আমরা সেখানে আরাম-আয়েশে থাকব। আমাদের কষ্ট করে থাকতে হয়েছে।’ বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘আমি কোথায় থাকব, কী খাব, কিছুই জানি না, কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করেই আমি দেশে চলে এসেছিলাম। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে কোনো রকম কষ্ট করে থেকেছি। আর দেশের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছি। কারণ আমার বাবা এ দেশ স্বাধীন করেছিলেন।’ সেই দুঃসময়ের কথা উল্লেখ করে তিনি অরো বলেন, ‘সব সময় আমি একটা কথাই বলতাম, যে কথা বাবার কাছ থেকেই শিখেছিলাম, একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করবে না।’

ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য ট্রাস্ট করে দিয়েছি : সরকারপ্রধান ইসলামের প্রসারে তাঁর সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য ট্রাস্ট করে দিয়েছি। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি নিরক্ষরতামুক্ত করার অংশ হিসেবে মসজিদভিত্তিক উপানুষ্ঠানিক শিশু ও গণশিক্ষার ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রদানকারীদের জন্য ভাতার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এর জন্য ৮০ হাজার আলেম-উলামার কর্মসংস্থান হয়েছে।’ তিনি ওই সময় তাঁর সরকারের সারা দেশে উপজেলা পর্যায়ে ৫৬০টি মডেল মসজিদ-কাম ইসলামিক কালচারাল সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, এটি দেশীয় অর্থায়নে প্রথমে তিনি করার উদ্যোগ নিলেও তাঁর সাম্প্রতিক সৌদি আরব সফরের সময় সৌদি বাদশাহ এই প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দের আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘দুটি পবিত্র মসজিদের জিম্মাদার সৌদি বাদশাহ এই মসজিদ নির্মাণে আমাদের পাশে থাকবেন এবং সহযোগিতা করবেন এবং এজন্য একটি টিমও তিনি বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন।’

দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে আরবি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী আলেম-উলামাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা আপনাদের কাছে দোয়া চাই, দোয়া করবেন। কারণ আমরা সব সময় নবী করিম (সা.)-এর পথ অনুসরণ করে চলি। কারণ তিনি আমাদের শিখিয়েছেন ইসলাম ধর্মের মূল কথাই হচ্ছে হচ্ছে শান্তি, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যদি বিশ্বাস করি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ইশারা ছাড়া গাছের পাতাটাও নড়ে না, ভালো-মন্দ যা কিছু তা তিনিই করে দিয়েছেন। তাহলে আমরা এই বিশ্বাস নিয়েই পথ চলব।’

ইসলাম শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের ধর্ম এবং ইসলাম ধর্ম মানুষকে শান্তির পথ দেখায়—এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ওই সময় বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বিদ্যমান থাকার প্রসঙ্গ উত্থাপন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এর ফলে লাভবান হচ্ছে কারা? যারা অস্ত্র তৈরি করে, অস্ত্র বিক্রি করে তারা লাভবান হয়। আর রক্ত যায় আমাদের মুসলমানদের।’ তিনি বলেন, ‘এই কথাটা আমি ওআইসি সেক্রেটারির কাছেও তুলে ধরেছি, জাতিসংঘে আমরা একটা সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদবিরোধী সম্মেলন করেছিলাম সে সময়ও এই কথাটা বলেছি এবং সৌদি বাদশাহকেও এই কথাটা বলেছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘মুসলিম উম্মাহ এক হয়ে শান্তির পথে আমাদের যেতে হবে। কারো মাঝে যদি কোনো রকম দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকে তো আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সেটার আমরা সমাধান করব। ইসলাম যে শান্তির ধমর্, সেটাই আমরা প্রমাণ করতে চাই।’

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের কালরাতে একসঙ্গে পিতা-মাতা-ভাই হারানোর দুঃসহ বেদনার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা নিজের, পরিবারের এবং দেশবাসীর জন্য আলেম-উলামাদের কাছে দোয়া চান। তিনি বলেন, ‘আমি নিঃস্ব, রিক্ত, আমি এতিম, আমরা দুটি বোন আছি, আমাদের জন্য, আমাদের ছেলে-মেয়ে, নাতি-পুতিদের জন্য দোয়া করবেন, আর দোয়া করবেন বাংলাদেশের জনগণের জন্য।’ তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহর কাছে আমি শুধু এই টুকুই চাই যে আল্লাহ আমাকে যে শক্তি দিয়েছেন, আমি বাংলাদেশের জনগণের সেবা করে যেতে চাই আর এই বাংলাদেশকে একটা সুন্দর দেশ হিসেবে গড়ে তুলে রেখে যেতে চাই।’

আপনাদের দোয়া চাই, সামনে নির্বাচন : শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনাদের দোয়া চাই, সামনে নির্বাচন আছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যদি ইচ্ছা করেন তাহলে তিনি নিশ্চয়ই আবার বাংলাদেশের জনগণের খিদমত করার সুযোগ আমাকে দেবেন। আর যদি না দেন আমার কোনো আফসোস থাকবে না। কারণ আমি সব কিছু আল্লাহর ওপরই ছেড়ে দিয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার পর তাঁর হাতে শুকরিয়ার স্মারক তুলে দেন আহমদ শফী। তাঁর পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মাওলানা নুরুল আমিন।

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক শেখ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন এবং হাইআতুল উলয়া লিল জামিয়াতিল কওমি বাংলাদেশের সহসভাপতি আল্লামা আশরাফ আলী, মাওলানা আজহার আলী আনোয়ার, আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ, আবু তাহের নদভী, মওলানা আহমাদুর রহমানী, মওলানা আব্দুল কুদ্দুস।

আল্লামা শফীকে স্বাধীনতা পদক দেওয়ার অনুরোধ : হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফীকে স্বাধীনতা পদক দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমাদের একজন আপনাকে ‘কওমি জননী’ বলেছেন। আপনি মায়ের দরদ দিয়ে ইমামদের পাঁচ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিনদের তিন হাজার টাকা করে ভাতা দেবেন।”

পিপার স্প্রেসহ আটক ২ : শোকরানা মাহফিলে পিপার স্প্রেসহ সন্দেহভাজন দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। তাঁরা হলেন আবিদুর রহমান ও আবদুল্লাহ মামুন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কালিমন্দির গেট দিয়ে তাঁরা ঢোকার চেষ্টা করেন। পোশাক ও আচরণ দেখে সন্দেহ হওয়ায় তাঁদের আটক করা হয়েছে বলে জানান সেখানে কর্তব্যরত হাজারীবাগ থানার এএসআই রফিক।

গতকাল ফজরের নামাজের পর থেকেই শুরু হয় কওমি মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানমুখী যাত্রা। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই সোহরাওয়াদী উদ্যান পরিণত হয় জনসমুদ্রে। প্রধানমন্ত্রী সবাবেশস্থলে উপস্থিত হন সকাল ১১টায়। সামাবেশের শৃঙ্খলা ছিল চোখে পড়ার মতো।

 

 



মন্তব্য