kalerkantho


গুমট কাটবে সংলাপে?

গণভবনে সন্ধ্যায় বসছেন ক্ষমতাসীনদের ২৩ ও ঐক্যফ্রন্টের ১৬ নেতা

আবদুল্লাহ আল মামুন   

১ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



গুমট কাটবে সংলাপে?

কঠিন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংশয় ও সন্দেহ সামনে রেখে আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত সংলাপ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষে দলটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন এ সংলাপের নেতৃত্ব দেবেন। সন্ধ্যা ৭টায় গণভবনে অনুষ্ঠেয় এ সংলাপে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে ২৩ নেতা এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে ১৬ জন অংশ নেবেন।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে এ সংলাপ দেশের রাজনীতির জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। যদিও গত তিন দিনে একটি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা, আরেকটিতে সাজা বাড়ানোর ঘটনায় বিএনপি এই সংলাপ নিয়ে খুবই হতাশ। তফসিল এবং সংলাপের আগে এ দুটি ঘটনাকে সরকারের কূটকৌশল বলেই মনে করছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক কর্মসূচিতে বলেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া সংলাপ সফল হবে না। বিএনপির প্রাধান্য থাকা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের মধ্যেও এ প্রশ্নে সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছে।

‘কী হবে’ এটি জেনেও কেউ কেউ সংলাপে যাচ্ছেন বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান ফ্রন্ট নেতারা। তাঁদের মতে, এসব সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মহলের পাশাপাশি নির্বাচন প্রশ্নে ইতিবাচক অবস্থান সৃষ্টি করার লক্ষ্যে নবগঠিত এই জোট সংলাপে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে গতকাল রাতে সর্বশেষ পাওয়া খবরে জানা গেছে, ৭ দফা দাবির বিষয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কঠোর অবস্থানে থাকবে।

ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আমরা চাই, জাতীয় স্বার্থ নিয়ে সংলাপ হোক।’ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল এই অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আমরা আশা করব প্রধানমন্ত্রী সত্যিকার অর্থেই একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃ প্রতিষ্ঠা করবার জন্য, মানুষের অধিকারগুলোকে ফিরিয়ে আনবার জন্য, সত্যিকার অর্থে একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ করবার জন্য যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, এই সংলাপের মধ্য দিয়ে সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার তিনি করবেন। আমরা সাত দফা দাবি দিয়েছি, তা অবশ্যই পূরণ করবেন। এ ছাড়া বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের কোনো সমাধান হবে না।’

এদিকে জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহলের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় ইতিপূর্বে প্রকাশ্যে নেতিবাচক থাকলেও তফসিলের আগে সংলাপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল এতে ক্ষমতাসীন মহলের দুই ধরনের লাভ দেখছে। প্রথমত নির্বাচনকে সামনে রেখে সৃষ্ট গুমট পরিস্থিতি কিছুটা দূর হবে এবং বিরোধী জোটের আন্দোলনও অনেকটা দমে যাবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও সংলাপকে কেন্দ্র করে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, সংলাপে খোলা মনে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আলোচনা হবে।

সাত দফা দাবি ও ১১ দফা লক্ষ্যের ভিত্তিতে সংলাপের দাবিতে গত ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ক্ষমতাসীন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে চিঠি দেয় নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এর পরদিন সোমবার আওয়ামী লীগ সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, সংলাপ হবে। গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেনকে চিঠি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংলাপের আমন্ত্রণ জানান। আজ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর সেখানে নৈশভোজের আয়োজন থাকলেও ঐক্যফ্রন্টের নেতারা অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ঐক্যফ্রন্টের সাত দফায় রয়েছে—সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার গঠন, খালেদা জিয়াসহ রাজবন্দিদের মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার নিশ্চিত করা, যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করা, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থী, সাংবাদিকসহ সবার বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সব কালো আইন বাতিল, নির্বাচনের ১০ দিন আগে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন, দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগ ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা এবং নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে ফলাফল চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান সব রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা ও নতুন কোনো মামলা না দেওয়া।

সংলাপে বসছেন আওয়ামী জোটের ২৩ নেতা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সংলাপে ক্ষমতাসীন জোটের ২৩ নেতা অংশ নেবেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের পাশাপাশি দলটির নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক নেতাদেরও এই টিমে রাখা হয়েছে। বুধবার আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ড. আব্দুস সোবহান গোলাপের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সংলাপে উপস্থিত থাকবেন। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের মধ্যে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও কাজী জাফর উল্যাহ, ১৪ দলের শরিকদের মধ্যে সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, জাসদ একাংশের সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, জাসদ আরেক অংশের কার্যকরী সভাপতি মাঈনুদ্দিন খান বাদল সংলাপে অংশ নেবেন। এ ছাড়া থাকবেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু ও রমেশ চন্দ্র সেন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আব্দুর রহমান, প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, দপ্তর সম্পাদক ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ এবং আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ১৬ সদস্য : সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ১৬ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন গণফোরামের সভাপতি ও ফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। এই দলে বিএনপির পাঁচজন থাকছেন। তাঁরা হলেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ও মির্জা আব্বাস। এ ছাড়া গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, জেএসডি সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, সহসভাপতি তানিয়া রব, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক রতন, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ও এস এম আকরাম, ঐক্যপ্রক্রিয়ার নেতা সুলতান মুহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও আ ব ম মোস্তফা আমিন এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সংকট সমাধানে জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব তারানকো মোট তিনবার বাংলাদেশ সফর করেন। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেন তিনি। তারানকোর উপস্থিতিতে ২০১৩ সালের ১০ ও ১১ ডিসেম্বর প্রথম ও দ্বিতীয় দফার বৈঠকে নির্বাচন পেছানোর দাবি জানান উপস্থিত বিএনপির নেতারা। জবাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারা নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা চান। অবশ্য ১৩ ডিসেম্বর তৃতীয় দফা ও শেষ বৈঠকে তারানকো উপস্থিত ছিলেন না। গুলশানে ইউএনডিপির একটি প্রকল্প অফিসে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বিএনপি নেতারা ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ স্থগিতের দাবি জানান। বরাবরের মতো তৃতীয় দফার এ বৈঠকও ব্যর্থ হয়। তারপর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির নেতাদের আর কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রায় পাঁচ বছর পর আজ আবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিরোধী জোট তথা বিএনপি নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।  



মন্তব্য