kalerkantho


ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন কারাগারে

৪০ জন বন্দির সঙ্গে সাধারণ ওয়ার্ডে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৪ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন কারাগারে

মানহানির মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে গতকাল ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

রংপুর আদালতে দায়ের করা একটি মানহানির মামলায় গ্রেপ্তার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করার পর তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তাঁর জামিনের আবেদনও নামঞ্জুর করা হয়। ঢাকার কেরানীগঞ্জের কারাগারে নেওয়ার পর ব্যারিস্টার মইনুলকে সাধারণ ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। আমদানি ওয়ার্ড নামে পরিচিত ওই ওয়ার্ডে বিকেল ৩টার দিকে মইনুলকে যখন নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সেখানে বন্দি ছিলেন ৩৫ জন। ওই ওয়ার্ডে খাট কিংবা চেয়ারের ব্যবস্থা নেই।

গতকাল দুপুরে মইনুল হোসেনকে আদালতে হাজির করা হলে তাঁর পক্ষে জামিনের আবেদন করা হয়। অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কায়সারুল ইসলামের আদালতে শুনানি হয়। মইনুল হোসেনের পক্ষে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, সানাউল্লাহ মিয়া ও মাসুদ আহমেদ তালুকদার শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পিপি আবদুল্লাহ আবু, অতিরিক্ত পিপি তাপস কুমার পালসহ বেশ কয়েকজন সরকারি আইন কর্মকর্তা জামিনের বিরোধিতা করেন। অন্যদিকে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির পক্ষে অ্যাডভোকেট কাজী নজিবুল্লাহ হিরু জামিনের বিরোধিতা করেন।

মইনুল হোসেনের পক্ষে আইনজীবীরা আদালতকে বলেন, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা। তিনি জামিন পেলে পালাবেন না। আইনজীবীরা আরো বলেন, এই মামলার ধারা জামিনযোগ্য। উচ্চ আদালতের বহু সিদ্ধান্ত রয়েছে জামিনযোগ্য ধারায় জামিন দেওয়ার জন্য। এ ছাড়া আইনেও বলা আছে, জামিনযোগ্য ধারার মামলায় আদালত জামিন দেবেন।

মইনুল হোসেনের আইনজীবীরা বলেন, যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলাটি রংপুরে করা হয়েছে, সেটি চলতে পারে না। কারণ মাসুদা ভাট্টি নিজেই একটি মামলা করেছেন। সারা দেশে কয়েকটি মামলা হয়েছে। একই ঘটনায় একাধিক মামলা চলতে পারে না বলেও আইনজীবীরা উল্লেখ করেন।

শুনানিতে মহানগর দায়রা আদালতের পিপি আবদুল্লাহ আবু বলেন, মইনুল হোসেন একজন নারী সাংবাদিককে অপমান করেছেন। তাঁকে চরিত্রহীন বলেছেন। এটা গর্হিত অপরাধ। যে ধারায় মামলা হয়েছে, তা জামিনযোগ্য হলেও জামিন দেওয়া-না দেওয়া আদালতের এখতিয়ার।

সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির আইনজীবী কাজী নজিবুল্লাহ হিরু জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, মইনুল যে বক্তব্য দিয়েছেন তার দ্বারা পুরো নারী জাতি কলঙ্কিত হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে দেশে একটা সেন্টিমেন্ট তৈরি হয়েছে। মামলাটি হয়েছে রংপুরে। সেখানেই জামিনের আবেদন শুনানি হওয়া উচিত। অ্যাডভোকেট নজিবুল্লাহ আরো বলেন, মামলাটি জামিনযোগ্য ধারা। কিন্তু মইনুল হোসেনের বক্তব্যে পুরো জাতি স্তম্ভিত। এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে আদালত জামিন নাও দিতে পারেন। এই এখতিয়ার আদালতের আছে।

উভয় পক্ষ শুনানি করার সময় ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন নিশ্চুপ ছিলেন। এ সময় আদালত জামিন নামঞ্জুর করে মইনুল হোসেনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তারসংক্রান্ত নথি রংপুর আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

গত সোমবার রাতে মইনুলকে রংপুরে দায়ের করা ওই মামলায় আ স ম আবদুর রবের উত্তরার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। পরে তাঁকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখান থেকেই গতকাল তাঁকে ঢাকার আদালতে নেওয়া হয়।

গত ১৬ অক্টোবর একাত্তর টেলিভিশনের একটি টক শোতে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির এক প্রশ্নে রেগে গিয়ে মইনুল হোসেন বলেন, ‘আপনার দুঃসাহসের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। আপনি চরিত্রহীন বলে আমি মনে করতে চাই। আমার সঙ্গে জামায়াতের কানেকশনের কোনো প্রশ্নই নেই। আপনি যে প্রশ্ন করেছেন তা আমার জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর।’ মইনুলের এ ধরনের বাক্য ব্যবহারে সমালোচনা শুরু হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে ঢাকাসহ দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় মানহানির মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে কয়েকটিতে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন।

গতকাল মইনুল হোসেনকে আদালতে হাজির করার পর বিএনপি-জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা তাঁর পক্ষে মিছিল করেন। আদালতেও আইনজীবীদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়।

আদালতের পরোয়ানার ভিত্তিতে মইনুল গ্রেপ্তার : আইনমন্ত্রী

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন টেলিভিশন টক শোতে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে যা বলেছেন তাতে শুধু মাসুদা ভাট্টির মানহানি হয়নি, বাংলাদেশের নারীসমাজ মনে করে, তাঁর ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথাটি পুরো নারীসমাজকে অপমানিত করেছে। সেখান থেকে মামলা হয়েছে। এই মামলা করার পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশের নারীসমাজ ক্ষুব্ধ হতো এবং এ ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অশ্লীল বক্তব্য দেওয়াকে উৎসাহ দেওয়া হতো। সে জন্যই আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ কথা বলেন। আইনমন্ত্রী আরো বলেন, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করার আগে থেকে সরকারের বিরুদ্ধে টক শোতে অনেক কথাই বলতেন। তখন কিন্তু তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার কারণে।

বিএনপির প্রতিবাদ

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বলেছেন, ‘মইনুল হোসেন আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একজন ব্যক্তি। অপশাসনের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্রের পক্ষে তাঁর কথা বলাটাকেই অপরাধ হিসেবে গণ্য করছে সরকার। মানহানির মামলায় প্রথমেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার নজির নেই। প্রথমে সমন জারি করে আসামিপক্ষের বক্তব্য নেওয়া হয়। আসামিপক্ষ উপস্থিত না হলে পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। মইনুল হোসেনের গ্রেপ্তার সম্পূর্ণ বেআইনি। তাঁকে দ্রুত মুক্তি দেওয়ার দাবি জানাই।’

গতকাল দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রিজভী এসব কথা বলেন।

কক্সবাজার ও মাগুরায় মইনুলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

কক্সবাজার ও মাগুরায় ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে পৃথক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। কক্সবাজার থেকে কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, গতকাল সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহর আদালত এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফখরুল ইসলাম গুন্দুর একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ওই পরোয়ানা জারি করেন।

ব্যারিস্টার মইনুল নারী সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে লাঞ্ছিত করেছেন। বিষয়টি আদালতের গোচরে এনে তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৫০০/৫০১ ধারায় মামলাটি দায়ের করেন অ্যাডভোকেট ফখরুল ইসলাম গুন্দু। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে ব্যারিস্টার মইনুলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। বাদীপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইকবালুর রশিদ আমিন সোহেলসহ অর্ধশতাধিক আইনজীবী।

অন্যদিকে কালের কণ্ঠ’র মাগুরা প্রতিনিধি জানান, মাসুদা ভাট্টিকে কটূক্তি করায় ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের নামে মাগুরায় ৫০০ কোটি টাকার মানহানি মামলা হয়েছে। মাগুরার সিনিয়র জুডিশিয়াল দ্বিতীয় আদালতে গতকাল মামলাটি করেন মাগুরা জেলা মানবাধিকার সংস্থার মহিলাবিষয়ক সম্পাদক ফরিদা রহমান। ওই মামলায় গ্রেপ্তারি পারোয়ানা জারি করেন আদালত।

মইনুলের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহে মামলা

ময়মনসিংহ থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহে ডিজিটাল আইনে মামলা হয়েছে। গতকাল মামলাটি দায়ের করেন ভালুকা উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক মনিরা সুলতানা মনি। ময়মনসিংহের এক নম্বর আমলি আদালতে এ মামলা দায়ের করা হয়।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট পীযুষ কান্তি বলেন, আদালত মামলাটি গ্রহণ করে তা সাইবার ক্রাইম আদালতে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।

 



মন্তব্য