kalerkantho


বৃহত্তর ঐক্য নিয়ে টানাপড়েন

দিনভর নাটকীয়তা শেষে বৈঠক স্থগিত

এনাম আবেদীন   

১২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



বৃহত্তর ঐক্য নিয়ে টানাপড়েন

বিএনপির সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সম্ভাব্য জোটের কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়ে গেলেও হঠাৎ নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। সে কারণে পরবর্তী বৈঠকের স্থান ও প্রক্রিয়া নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার দিনভর নাটকীয়তা শেষে বৈঠকটি স্থগিত হয়ে যায়। আজ শুক্রবার ওই বৈঠক হওয়ার কথা। নেতারা দাবি করেছেন, ঐক্যপ্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর কারণে শেষ পর্যন্ত বৈঠকটি স্থগিত হয়েছে। কিন্তু বস্তুত গতকাল সকাল থেকেই বৈঠক নিয়ে দলগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। দিনভর এ নিয়ে নেতারা তৎপরতা চালান।

সংশ্লিষ্ট দলগুলোর সূত্রে জানা গেছে, টানাপড়েন তৈরি হয় গত ৮ অক্টোবর আ স ম রবের বাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠকের সূত্র ধরে। ওই বৈঠকে আ স ম রব এবং বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) মান্নানের মধ্যে তর্কবিতর্ক হয়েছিল। কারণ সম্ভাব্য জোটের রূপরেখা বা ঘোষণাপত্রের আগে আসন বণ্টন ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা চায় বিকল্পধারা। তবে বিএনপি ও যুক্তফ্রন্টের অন্য দুটি দল জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য এবং ঐক্যপ্রক্রিয়া তথা গণফোরাম ওই আলোচনা চায় একসঙ্গে আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার পরে। ওই ইস্যুতে অন্য দলগুলোর সঙ্গে বিকল্পধারার টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। দলগুলোর নেতারা বলছেন, ওই টানাপড়েন শিগগিরই কাটবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ বিকল্পধারার পক্ষ থেকে এরই মধ্যে বিএনপির কাছে ১৫০ আসন দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও তারা সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব দিয়েছে, যেগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় ওঠেনি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের এই দুঃসময়ে বৈঠকটি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কী কারণে হলো না জানি না।’ তিনি আরো বলেন, ‘দেশে এ মুহূর্তে বৃহত্তর ঐক্যের প্রয়োজন। অথচ এ সময়ে বৈঠক বাতিল বা স্থগিত হওয়ায় স্বৈরাচারকে আরো উৎসাহিত করা হলো।’ 

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ অক্টোবর উত্তরায় জেএসডি সভাপতি আ স ম রবের বাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে ওই ইস্যুতে রব ও মান্নানের মধ্যে তর্কবিতর্ক হয়। ওই বৈঠকে বিএনপির সঙ্গে ঐক্যপ্রক্রিয়ায় যাওয়ার আগে দাবিদাওয়ার বিষয়টি নিষ্পত্তি করার প্রস্তাব দেন মান্নান। বিশেষ করে আসন বণ্টন ও ক্ষমতার ভারসাম্য ইস্যুতে তিনি আলোচনা করার কথা বলেন। কিন্তু এতে আপত্তি জানান রব। তিনি বলেন, ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিলে হবে না। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি পর্যায়ে গেলে এ বিষয়গুলো নিষ্পত্তি হতে পারে। একটি সূত্রের দাবি, বিকল্পধারার ওই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা এরপর অনেক দূর গড়ায় এবং বৈঠকে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। দুয়েকজন নেতা বৈঠকে বেশ চড়া গলায় কথা বলেন। বৈঠক থেকেই অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে ফোন করে মান্নান বলেন, তাঁর কথা আমলে না নিয়েই যুক্ত ঘোষণা তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, যুক্ত ঘোষণায় তাহলে লিখতে হবে যে সেখানে আসন ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা হয়নি। তখন রবসহ উপস্থিত অন্য নেতারা বলেন, এটি লেখার প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া বৈঠকে যোগ দেওয়া নেতাদের ‘অথরিটি’ আছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা ওঠে। বলা হয়, বিকল্পধারার নেতারা দলের মহাসচিবকে অথরিটি দেননি।

সূত্র মতে, বৈঠক শেষ হওয়ার আগে অবশ্য নেতারা শান্ত হন এবং সিদ্ধান্ত নেন যে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পরবর্তী বৈঠক হবে বেইলি রোডের বাসায়। গণফোরাম নেতা মোস্তফা মহসিন মন্টু ওই প্রস্তাব করেন বলে জানা যায়। সে অনুযায়ী সব ঠিক ছিল। কিন্তু গত বুধবার মেজর (অব.)

মান্নান তাঁর দলের প্রধান বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে জানান, এ ধরনের বৈঠকে তিনি যাবেন না। বৈঠকের বিষয়ে বি চৌধুরীকে বেশ নেতিবাচক অনেক কথাও বলেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর মধ্যে বুধ ও বৃহস্পতিবার আলোচনা চলে।

সূত্র মতে, এমন পরিস্থিতিতে বৈঠকে যোগদানের জন্য বি চৌধুরী তাঁর দলের পক্ষ থেকে যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী ও সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার ফারুককে দায়িত্ব দেন। এদিকে এসব ঘটনা জানাজানি হওয়ায় অন্য দলগুলোর মধ্যে নেতিবাচক আলোচনা ও অস্বস্তি তৈরি হয়। মাহীকে অন্যান্য দলের সিনিয়র নেতারা মেনে নেবেন কি না সে প্রশ্নও সামনে আসে। কারণ কথা ছিল ড. কামাল হোসেনের বাসায় বৈঠক হবে। সংগত কারণেই সেখানে বি চৌধুরী, ড. কামালসহ শীর্ষ নেতারা থাকবেন। কিন্তু মাহীকে দলের পক্ষে দায়িত্ব দেওয়ায় ঐক্যপ্রক্রিয়ার নেতারা সকালেই বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেন যে ড. কামাল হোসেনের বাসায় বৈঠক হবে না।

ঐক্যপ্রক্রিয়ার সদস্যসচিব আ ব ম মোস্তফা আমিন গতকাল সকালে টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে জানান, বিএনপির সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট ও ঐক্যপ্রক্রিয়ার বৈঠকের বিষয়ে তাঁদের কিছু জানা নেই। তিনি দাবি করেন, ড. কামাল হোসেনের বাসায় বৈঠকের বিষয়ে তাঁদের কিছু জানানো হয়নি এবং ৮ অক্টোবরের বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনাও হয়নি।

এদিকে বৈঠকে মান্নানের অসম্মতির কথা জানতে পেরে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বারিধারায় যান বি চৌধুরীর বাসায়। তিনি বি চৌধুরীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে মাহী তরুণ নেতা, ফলে তাঁর উপস্থিতিতে বৈঠক কতখানি ফলপ্রসূ হবে, তা বলা মুশকিল। তিনি আকার-ইঙ্গিতে সিনিয়র নেতাদের যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। তবে বি চৌধুরী আশ্বস্ত করেন যে মাহী মাথা ঠাণ্ডা রেখেই বৈঠকে অংশ নেবেন।

সূত্র মতে, গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বৈঠক হবে কি হবে না, তা নিয়ে নানা আলোচনা চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়, রাত ৯টায় উত্তরায় আ স ম রবের বাসায় আবার বৈঠক হবে। বিকেল ৪টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে জেএসডির ভাইস চেয়ারম্যান তানিয়া রব, ঐক্যপ্রক্রিয়ার মোস্তফা আমিন ও মাহী বি চৌধুরী কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেন যে বৈঠকটি হচ্ছে। যদিও প্রায় একই সময়ে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর অন্য দু-একজন নেতার সংশয় ছিল, শেষ পর্যন্ত বৈঠক হয় কি না সে নিয়ে। ওই নেতাদের মতে, বিকল্পধারা কোনোভাবেই বৈঠক করতে দেবে না। আবার দিলেও বৈঠক ফলপ্রসূ হবে না বলে উল্লেখ করেন তাঁরা। যদিও মাহী বি চৌধুরী বিকেলে কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছিলেন যে বৈঠকে তিনি যোগ দিচ্ছেন। কিন্তু এর আগেই অন্য ঘটনা ঘটে যায়। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে দলগুলোর মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যায় গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে ডায়ালিসিস চলাকালে গোয়েন্দা পুলিশ হাসপাতালটি ঘিরে ফেলে বলে খবর ছড়ায়। এরপর তানিয়া রব, মোস্তফা আমিন ও মাহী বি চৌধুরী কালের কণ্ঠকে জানান, বৈঠক হচ্ছে না।

মাহী বি চৌধুরী জানান, জেএসডি নেতা তানিয়া রব তাঁকে জানিয়েছে যে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ওখানে পুলিশ গিয়েছিল, তাই বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তাঁর অফিসে নাকি পুলিশ গেছে। আমি বললাম, পুলিশ গেছে সন্ধ্যা ৬টায়, কিন্তু তাতে রাত ৯টার বৈঠক স্থগিত হবে কেন? বরং বৈঠক করে আমরা ওই ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে পারতাম।’

আ ব ম মোস্তফা আমিন বলেন, জাফরুল্লাহ চৌধুরী বৃহত্তর ঐক্যের পক্ষে একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার কারণে তিনি অফিস থেকে বেরুতে না পারায় বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে।

 



মন্তব্য

shawkat commented 6 days ago
বিকল্পধারাকে বাদ দিয়ে এগোনো উচিত অন্য দলগুলোর