kalerkantho


আদালতের পর্যবেক্ষণ

রাষ্ট্রীয় মদদে হামলা

►বিরোধীদলীয় নেতাদের হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করা মোটেই গণতান্ত্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ নয়
► সভা-সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের ও সাধারণ মানুষকে হত্যার ধারা চালু থাকলে জনগণ রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়বে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



রাষ্ট্রীয় মদদে হামলা

পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দীন রোডের এই বিশেষ আদালতেই গতকাল ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা ও বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের কী ধরনের মনোভাব থাকা উচিত, তা নিয়ে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত। বর্বরোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে গতকাল বুধবার এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, রাজনীতিতে অবশ্যই ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে। তাই বলে বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রয়াস চালানো হবে? এটা কাম্য নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যে দলই থাকবে, বিরোধী দলের প্রতি তাদের উদার নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকতে হবে। বিরোধীদলীয় নেতাদের হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করা মোটেই গণতান্ত্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ নয়। সাধারণ জনগণ এ রাজনীতি চায় না।

সাধারণ জনগণ চায় যেকোনো রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে যোগ দিয়ে সেই দলের নীতি, আদর্শ ও পরিকল্পনা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ধারণ করার। আর সেই সভা-সমাবেশে আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণ করে রাজনৈতিক নেতাদের ও সাধারণ জনগণকে হত্যার এ ধারা চালু থাকলে পরবর্তী সময়ে দেশের সাধারণ জনগণ রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়বে। এ আদালত চায় না সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ শরিফের ঘটনার, সাবেক অর্থমন্ত্রী এস এ এম এস কিবরিয়ার ওপর নৃশংস হামলার, রমনা বটমূলে সংঘটিত বোমা হামলার এবং এ মামলার ঘটনায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর নৃশংস বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার পুনরাবৃত্তি।

আদালত তাঁর রায়ের পর্যবেক্ষণে আরো বলেন, ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা অর্জন করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, রক্ত ও মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে। আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জাতি একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়। ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তি এ দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের

চেতনাকে ব্যাহত করার অপচেষ্টা চালাতে থাকে। পরাজিত শক্তি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিকে রোধ করে। অগ্রগতির চাকাকে পেছনে ঘোরানোর চেষ্টা

চালিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ও লাল-সবুজ পতাকাকে হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা চালায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরাজিত শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। বিচার না হওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়। ইনডেমনিটি বিলের মাধ্যমে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র দেশে শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যার দীর্ঘ ২৩ বছর দুই মাস পর জাতি জাতির পিতা হত্যার দায় থেকে কলঙ্কমুক্ত হয় বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করার পর চার জাতীয় নেতাকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। কিন্তু ষড়যন্ত্র না থেমে বহমান থাকে। পরে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার হীন প্রচেষ্টা চালানো হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘শেখ হাসিনাকে হালকা নাশতা করানো হবে’—এই উদ্ধৃতি দিয়ে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনের কতিপয় সদস্য আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় হামলা করে। তৎকালীন রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের সহায়তায় প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটনাস্থল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ২৩ নম্বর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সামনে যুদ্ধে ব্যবহৃত স্পেশালাইজড মারণাস্ত্র আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটনা ঘটানো হয়। প্রশ্ন ওঠে কেন এই মারণাস্ত্রের ব্যবহার? রাজনীতি মানেই কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ? শুধু আক্রমণই নয়, দলকে নেতৃত্বশূন্য করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, এই আদালত সাক্ষীর কাঠগড়ায় গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত মাকে দুর্বিষহ কষ্ট পেয়ে মৃত্যুবরণ প্রত্যক্ষ করা নাজমুল হাসান পাপন ও তাঁর স্ত্রী রোকসানা হাসানের কষ্ট প্রত্যক্ষ করেছেন। আরো প্রত্যক্ষ করেছেন মোসাম্মৎ উম্মে কুলসুম রেণুকা, নুজহাত এ্যানী, রাশেদা আক্তার রুমা, নীলা চৌধুরী ঘটনার সময় ঘটনাস্থল থেকে যাঁরা গ্রেনেড হামলায় মারাত্মকভাবে জখম হয়ে দেশে-বিদেশে চিকিৎসার পরও এখনো দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন, যাঁদের চোখে ঘুম নেই, গ্রীষ্ম বা শীত সব সময়ই শরীরের বিভিন্ন অংশে স্প্লিন্টারের তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছেন, যাঁদের পরিবারের সুস্থ সদস্যরাও প্রাণহীনভাবে বেঁচে রয়েছেন তাঁদের।

আদালত গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছেন অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এমপির আদালতে দেওয়া সাক্ষ্য, ঘটনাস্থলে যে মারাত্মক ও ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল সেই মর্মে বক্তব্য দিয়েছেন। আদালত গভীরভাবে অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত, যিনি তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতার কানের চিকিৎসা করেন, তাঁর জবানবন্দি পর্যালোচনা করেছেন। ঘটনার সময় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ফলে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতার ডান কানে গুরুতর জখম হয়। তাই আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে এই নৃশংস ও ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে বলে এই আদালত মনে করেন।

সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, মূল ঘটনার আগে বিভিন্ন ঘটনাস্থলে এ মামলার আসামিরা অভিন্ন অভিপ্রায়ে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র সভা করে পরিকল্পিতভাবে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সামনে ঘটনার তারিখ ও সময় মারাত্মক সমরাস্ত্র আর্জেস গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ ২৪ জনকে হত্যা এবং শতাধিক নেতাকর্মীকে মারাত্মকভাবে জখম করে। এই মর্মে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণে সক্ষম হয়েছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে আসামিদের শাস্তি প্রদান যুক্তিসংগত বলে এই আদালত মনে করেন।



মন্তব্য