kalerkantho


বিশেষ সাক্ষাৎকার ♦ এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে বিকল্প শক্তির উত্থান হতে পারে

এনাম আবেদীন

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে বিকল্প শক্তির উত্থান হতে পারে

বিকল্পধারার সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর আশঙ্কা, আগামী দিনে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হলে দেশে বিকল্প শক্তির উত্থান হতে পারে। সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে দেশ ভয়ংকর বিপদে পড়বে। এই অবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র পথ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তাঁর মতে, এটি না করতে পারলে বাংলাদেশ থেকে বহু যুগের জন্য গণতন্ত্র নির্বাসনে চলে যাবে।

গত সোমবার বারিধারার বাসায় কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী এ আশঙ্কার কথা জানান। এ সময় তিনি বৃহত্তর ঐক্যের প্রেক্ষাপট কেন তৈরি হয়েছে তার বর্ণনার পাশাপাশি বিএনপির সঙ্গে সাম্প্রতিককালে অনুষ্ঠিত বৈঠক ও অতীত সম্পর্কের বিষয়ে কথা বলেন। আলাপচারিতায় বিএনপির সঙ্গে উদারপন্থী দলগুলোর আসন ও ক্ষমতার ভাগাভাগি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে উঠে আসে।         

কালের কণ্ঠ : নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আদায়ের জন্য আপনারা বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। দাবি আদায়ের ব্যাপারে কতটা আশাবাদী?

বি চৌধুরী : দাবি আদায় করতেই হবে। এটি না করা গেলে দেশের জন্য ভয়ংকর বিপদ সামনে। আমরা আল্লাহ এবং এ দেশের জনগণের ওপর নির্ভর করে মাঠে নামতে চাই। আপাতত হতাশ হতে চাই না।

কালের কণ্ঠ : শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে দেশের পরিস্থিতি কী হতে পারে? 

বি চৌধুরী : অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। গণতন্ত্র বহু যুগের জন্য নির্বাসিত হয়ে যাবে। আবার বিকল্প কোনো শক্তিরও উত্থান হতে পারে। জনগণের ব্যাপক উত্থান, এমনকি একপর্যায়ে গণ-অভ্যুত্থানও হতে পারে।

কালের কণ্ঠ : এমন সব আশঙ্কা থেকেই কি দলগুলো বৃহত্তর ঐক্যপ্রক্রিয়ায় আগ্রহী হয়ে উঠেছে?

বি চৌধুরী : আমার মনে হয়, বর্তমান সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা সবাইকে এক জায়গায় নিয়ে আসতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে সরকারের বাইরে থাকা দলগুলো যখন দেখল যে সরকার তো কারো কোনো কথাই শুনছে না। যখন যা খুশি তা-ই করছে। বিরোধী দলগুলোকে দমনের পাশাপাশি সন্ত্রাস, দুর্নীতিসহ এমন কোনো অপকর্ম নেই যা করছে না। শেষ পর্যন্ত গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরার জন্য ডিজিটাল আইনও করেছে। এতে সমাজে এক ধরনের বার্তা ছড়িয়েছে যে সরকার চরম অগণতান্ত্রিক পন্থায় চলে যাচ্ছে। তাই সবার বোধোদয় হচ্ছে যে এভাবে চলতে দেওয়া যায় না।      

কালের কণ্ঠ : বিএনপিসহ আপনারা এক মঞ্চে উঠলেন। এর পরের ধাপ কী?

বি চৌধুরী : ঐক্য প্রতিষ্ঠা হলে সংগত কারণেই একসঙ্গে প্রথমে আন্দোলন, তারপরে নির্বাচন অর্থাৎ নির্বাচনী জোট হতে পারে এবং নির্বাচন শেষ হলে সরকার গঠন; এই স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছি। এভাবে একটির পর একটি ধাপ আসবে। কিন্তু এই ধাপ কোনটা কোন জায়গায় গিয়ে থামবে এটি বলতে পারছি না। আবার এটিও ঠিক যে দেশের পরিস্থিতি যেখানে দাঁড়িয়েছে, তাতে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করার উপায়ও নেই। সরকার গণতন্ত্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছে। তাই জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রের জন্য যদি কিছু করতে পারি সেই চেষ্টা করছি।    

কালের কণ্ঠ : ঐক্যপ্রক্রিয়ার কর্মসূচিতে বিএনপিসহ আপনারা এক মঞ্চে উঠলেন। কবে নাগাদ চূড়ান্ত রূপ নিতে পারে?

বি চৌধুরী : মঞ্চে ওঠা এক জিনিস আর চূড়ান্ত ঐক্য আরেক জিনিস। এটিকে ঐক্যের এক ধাপ অগ্রগতি বলা যায়। চূড়ান্ত ঐক্যে রূপ নিতে সময় লাগবে। কিছু ইস্যুতে চুক্তি বা সমঝোতারও প্রয়োজন হবে। 

কালের কণ্ঠ : চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো কী?

বি চৌধুরী : গণফোরাম ও যুক্তফ্রন্টের যৌথ ঘোষণায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, মুক্তিযুদ্ধ এবং এ দেশের মানচিত্রের বিরোধী বলে পরিচিত ব্যক্তি ও দলের সঙ্গে ঐক্য করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, ভারসাম্যের রাজনীতির প্রশ্নে বিএনপিকে সম্মত হতে হবে। এ ছাড়া আরো কিছু পয়েন্ট আছে। এগুলো নিষ্পত্তি হলেই কেবল চূড়ান্ত ঐক্য হবে। তার আগে ঐক্য হয়ে গেছে এটি বলা ঠিক হবে না। হওয়ার পথে বলা যাবে।

কালের কণ্ঠ : ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে বলুন...

বি চৌধুরী : সুস্পষ্টভাবে তিনটি বিষয়ে ভারসাম্যের কথা বলতে চাই। প্রথমত, সংসদে আসনভিত্তিক ভারসাম্য। আসন এমনভাবে বণ্টন করতে হবে যাতে কোনো একটি দলের জনপ্রিয়তা থাকলেও ১৫০টির বেশি আসনে মনোনয়ন পাওয়া উচিত হবে না। অন্য দলগুলোর এমন অবস্থান থাকবে যাতে বাকি সবাই মিলে ১৫০ আসনে মনোনয়ন পাবে। ফলে যেটি হবে যে বড় মেজরিটির জোরে কেউ আর স্বেচ্ছাচারী সরকার হতে পারবে না। যেমন—গত দুটি সরকার এই মেজরিটির জোরে স্বেচ্ছাচারী হয়েছে। বর্তমান সরকারের সংসদে আসন ১৫০-এর কম থাকলে বাকি দলগুলোর সরকারের ওপর প্রভাব থাকত। এটি নেই বলেই সরকার যা খুশি তাই করতে পারছে। তাই আমরা চাচ্ছি লাগাম টেনে ধরতে। তাদের লাগাম আমাদের হাতে আর আমাদের লাগাম তাদের হাতে থাকবে।

দ্বিতীয়ত, আমরা মন্ত্রিসভায়ও ভারসাম্য চাই। সরকার গঠনের পর আমাদের ধর্ম মন্ত্রণালয় বা আরো অগুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয় দিলেন; এতে হবে না। বড় দলের (বিএনপি) বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্ত্রণালয় আমাদের দিতে হবে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়েও কথা হতে পারে। যেমন—মালয়েশিয়ায় ছোট দলকে প্রধানমন্ত্রী দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তৃতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে। রাষ্ট্রপতিকে খেলার পুতুল বানালে হবে না। বর্তমান আইন অনুযায়ী কোনো আইন বা প্রস্তাব যেটাই হোক না কেন; রাষ্ট্রপতি দুইবার ফেরত পাঠালে সেটি আপনা-আপনি অনুমোদন, পাস বা সম্মতি দেওয়া হয়েছে বলে বিধান রয়েছে। আমরা চাই রাষ্ট্রপতি কোনো বিল ফেরত পাঠালে তৃতীয়বার নতুন করে সেটি বিবেচনার জন্য সংসদে যাবে। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করার বিধানেরও আমরা পরিবর্তন চাই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব করে ক্ষমার ফাইল রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়ে দেন, এটি হবে না। এ ক্ষেত্রে এ ধরনের ফাইল বা দরখাস্ত রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের মাধ্যমে যাওয়ার বিধান চালু করতে হবে। সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্ত সন্ত্রাসীকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি এত সহজে করা যাবে না। ফাঁসির আসামির দণ্ড মওকুফের একটি ঘটনা আমি রাষ্ট্রপতি থাকাকালে এসেছিল। আমি বলেছি, সর্বোচ্চ আদালতের দণ্ড একমাত্র যে পরিবারের লোককে হত্যা করা হয়েছে তারাই মাফ করতে পারে। সুতরাং তাদের কাছে যাও। কিন্তু ওই পরিবারের সবাই বলেছেন, ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই। পরে ফাইল আমি ফেরত পাঠিয়েছি।  

কালের কণ্ঠ : এসব ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে?

বি চৌধুরী : হ্যাঁ, এসংক্রান্ত প্রস্তাব বা পেপারস তাদের দেওয়া হয়েছে। 

কালের কণ্ঠ : বিএনপি কিছু বলেছে?

বি চৌধুরী : না, তারা সম্ভবত স্ট্যাডি করছে। এগুলো অযৌক্তিক সে কথাও বলেনি। ইতিবাচকই মনে হয়েছে।

কালের কণ্ঠ : শেষ পর্যন্ত বিএনপি এগুলো মেনে নেবে বলে মনে হয়?

বি চৌধুরী : আমি উল্টো করে বলতে চাই। যদি এগুলো বিএনপি মেনে নেয় তাহলে ঐক্য সম্ভব।

কালের কণ্ঠ : আপনাদের বিকল্পধারার পক্ষ থেকে ১৫০ আসন ছেড়ে দেওয়ার দাবি তোলা হচ্ছে। বিষয়টি কী বিএনপির সঙ্গে নিষ্পত্তি হয়েছে? এটি সম্ভব?

বি চৌধুরী : হ্যাঁ, এটি সম্ভব। আমি তো মনে করি, একটি বড় দলের জাতীয় প্রয়োজনে স্যাক্রিফাইস করার দরকার আছে। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। কিন্তু দেশ শাসনের বিষয় সামনে এলেই যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় সেটি লজ্জাজনক। একদলীয় শাসন, বহুদল, জোট এবং মহাজোটের সরকারও দেখলাম। অভিজ্ঞতা হলো; এক দলের প্রাধান্যই সব সময় বেশি। এক দল নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পেলে জমিদারি শাসন চালু করে। নিরঙ্কুশ ক্ষমতার কারণেই একটি মন্ত্রণালয়ও আজ দেখাতে পারবে না যেটি দুর্নীতিমুক্ত। চরিত্র হনন হচ্ছে সর্বত্র। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজনের  কথা শুনেছি, বলছেন ‘ঘুষ খান, কিন্তু রয়ে সয়ে খান’। জাতির চরিত্র এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চরিত্র কলঙ্কিত করা হয়েছে। সিনিয়র আরেকজন মন্ত্রী ঘুষকে বলছেন স্পিডমানি। অর্থাৎ ঘুষকে তাঁরা জায়েজ করতে চাইছেন। গুম করে পুলিশ বাহিনীকে কলঙ্কিত করা হচ্ছে। র‌্যাবের নাম দিয়ে এগুলো প্রচার করা হয়। কিন্তু তারা তো এ দেশের সন্তান। অথচ এরাই সারা বিশ্বের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে, সুনাম তৈরি করছে। আবার এদের নাম দিয়েই গুম খুন প্রচার পাচ্ছে। আসলে এই সরকার পুরো জাতীয় চরিত্রকে কলঙ্কিত করেছে। আমরা এসবের অবসান চাই বলেই ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। আমার মনে হয় এবার বিএনপিও নতুন কিছু করতে চায়। তাই তারাও দেশের প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ করবে বলে আশা করি। ফলে আসনের বিষয়টিতেও নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করি।

কালের কণ্ঠ : সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাই—যুক্তফ্রন্ট কী এখনো ১৫০ আসনের দাবিতেই অটল আছে?

বি. চৌধুরী : হ্যাঁ আমরা এখনো দেড় শ আসনেই আছি। আশা করছি আমরা সৎ ও ভালো প্রার্থী দিতে পারব।

কালের কণ্ঠ : কিন্তু ১৫০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার মতো নেতা আপনাদের জোটে নেই বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আছে...

বি. চৌধুরী : জোট গঠিত হলে কত প্রার্থী আসবে দিশা পাবেন না। সৎ প্রার্থীর অভাব আছে। সরকারি দলে দেখেন, তিন হাজারের বেশি প্রার্থী আছে। এর মধ্যে কি ৫০০ ভালো ও দুর্নীতিমুক্ত প্রার্থী নেই? আছে। কিন্তু তাঁরা কী মনোনয়ন পাবেন? পাবেন না। পাবেন সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজ এবং যাঁরা দলের জন্য তথাকথিত কাজ করছেন বলে দাবিদাররা। অর্থাৎ বড় দলগুলোতে ভালো প্রার্থীদের জায়গা হয় না। বৃহত্তর ঐক্যের ছায়ায় সবাই দাঁড়াতে পারলে সমাজের অনেক ভালো ও সৎ মানুষ প্রার্থী হতে আগ্রহী হবে।

কালের কণ্ঠ : দেড় শ আসন পেলে তো ধানের শীষে নির্বাচন করতে হবে...

বি. চৌধুরী : ধানের শীষে আমাদের আপত্তি নেই। কারণ নৌকা ও ধানের শীষের ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। ধানের শীষের জন্য আমারও যথেষ্ট ত্যাগ রয়েছে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তিনি মওলানা ভাসানীর কাছ থেকে এটি চেয়ে নিয়েছিলেন। ভাসানীও এটি জিয়াউর রহমানকে দিয়ে দিয়েছিলেন। এভাবে বিএনপির ধানের শীষের জন্ম হলো।

কালের কণ্ঠ : আপনারা এখন এক শ আসনের দাবিতে আছেন এমনও শোনা যায়...

বি. চৌধুরী : আমি শুনিনি। আমার কথা হলো ভারসাম্য না থাকলে লাভ হবে না। যেদিনই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সেদিনই সব কিছু একটি দলের হাতে চলে যাবে। দেখেন না ১৪ দলে শরিকদের কী প্রাধান্য আছে? দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কী অবস্থান আছে তাদের? কোনো কথা বলেন তাঁরা?

কালের কণ্ঠ : বৃহত্তর ঐক্যের কাঠামো কিভাবে তৈরি হবে?

বি. চৌধুরী : শর্তের বিষয়ে ঐকমত্য হওয়া গেলে কাঠামো কোনো সমস্যা হবে না। 

কালের কণ্ঠ : বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের তিন নেতা সম্প্রতি আপনার কাছে গেছেন। কী বিষয়ে আলাপ হয়েছে?

বি. চৌধুরী : অনেক বিষয়ে আলাপ হয়েছে। তবে তাঁদের সঙ্গে আলাপে যেটি মনে হয়েছে; রাষ্ট্রপতি থাকাকালে আমার ওপর কিছু অন্যায় করা হয়েছিল, সেটি ঠিক হয়নি, এটি তাঁরা বলতে এসেছেন। মওদুদ সাহেব আলাপে জানালেন যে তিনি এ বিষয়টি তাঁর প্রকাশিত একটি গ্রন্থেও লিখেছেন। আমি তখন তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিলাম যে, ভুল-বোঝাবুঝির অবসানের জন্য আমি একটি শর্তের কথাই বলেছিলাম। বিএনপি চেয়ারপারসন বলুক যে; ‘আই ওয়াজ ইল অ্যাডভাইসড’। অর্থাৎ আমাকে সঠিক পরামর্শ দেওয়া হয়নি; এটুক বললেই আমি খুশি হতাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে সেটি তিনি করেননি। এ ছাড়া ক্ষমতার ভারসাম্যের ইস্যুটিও আমি তাঁদের কাছে তুলে ধরেছি। এটি অবশ্য তাঁরা বুঝেছেন। মনোভাব ইতিবাচক দেখেছি।

কালের কণ্ঠ : কিন্তু এখন তো বিএনপির তিন নীতিনির্ধারক নেতার সঙ্গে আলাপের মধ্য দিয়ে নিশ্চয়ই ভুল-বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে?

বি. চৌধুরী : একভাবে বললে বলতে পারেন। কিন্তু কথা থেকে যায়, ভুলটা যদি আপনি করে থাকেন, আপনার ছোট ভাই যদি বলে ও ভুল করেছে, এটি এক কথা। আর আপনি নিজে ভুল স্বীকার করা আরেক কথা।

কালের কণ্ঠ : রাষ্ট্রপতি থাকার সময় জিয়াউর রহমানের কবরে না যাওয়াসহ আরো কিছু বিষয়ে আপনার কিছু ভুল ছিল বলে বিএনপি মনে করে?

বি. চৌধুরী : না, আমার কোনো ভুল ছিল না।

কালের কণ্ঠ : তাহলে ওই অপ্রীতিকর ঘটনাগুলো কেন ঘটেছিল?

বি. চৌধুরী : এ ব্যাপারে বিএনপিকে জিজ্ঞেস করুন। আমি কিছু বলতে চাই না। আমি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছি; দেশের প্রেসিডেন্ট সবার কাছে সমান। যাই হোক; এখন তো বিএনপি ভুল বুঝতে পেরেছে। দলটির সিনিয়র নেতারা যখন এ ব্যাপারটি স্বীকার করেন, তখন ধরে নেব তাঁরা আন্তরিক।

কালের কণ্ঠ : কারাগারে যাওয়ার আগে বিএনপি চেয়ারপারসন কিংবা লন্ডন থেকে তারেক রহমানের সঙ্গে বৃহত্তর ঐক্যের ব্যাপারে কোনো কথা হয়েছে?

বি. চৌধুরী : না, আলাপ হয়নি।

কালের কণ্ঠ : তারেক রহমানকে নিয়ে আপনাদের অনেক ভয়; এ রকম একটি গুঞ্জন বাইরে রয়েছে। এর কারণ কী?

বি. চৌধুরী : কারণ আগের অভিজ্ঞতা খারাপ! সেগুলো মনে পড়ে, তাই ভয়।

কালের কণ্ঠ : কিন্তু বিএনপির পাশাপাশি বাইরেও এখন অনেকে বলছে, বয়স এবং গত এক যুগের অভিজ্ঞতার কারণে তাঁর অনেক পরিবর্তন হয়েছে...

বি চৌধুরী : হলে ভালো। জিয়াউর রহমানের ছেলে আগের চেয়ে অনেক পরিবর্তিত বা ভালো হয়েছে, এতে সবচেয়ে বেশি খুশি হব আমি। তারেকের মাঝে জিয়াউর রহমানের ছবি দেখতে চাই।

কালের কণ্ঠ : দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আপনি বিএনপি থেকে অনেক কিছু পেয়েছেন, এটি তো অনস্বীকার্য...।

বি চৌধুরী : নিশ্চয়ই...! জিয়াউর রহমানের সময়ে আমার পাওয়ার শেষ নেই। তিনি আমাকে অনেক বিশ্বাস করতেন। সে জন্যই তিনি আমাকে প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব করেছিলেন। মোটকথা রাজনৈতিক জীবনে আমার সকল প্রাপ্তি জিয়াউর রহমানের কারণে। তাঁর প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ। এ ছাড়া খালেদা জিয়া রাজি না হলে আমি রাষ্ট্রপতি হতে পারতাম না। এটিও বিএনপি থেকে প্রাপ্তি। অস্বীকার করব না।

কালের কণ্ঠ : আপনি প্রায়ই বলেন জিয়াউর রহমানের বিএনপি ও আজকের বিএনপি—তফাত কী?

বি চৌধুরী : এটি এখনকার বিএনপি নেতারা বলবেন। তবে এটি ঠিক যে শত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও বিএনপি টিকে আছে। কেউ ভাঙতে পারেনি। এটি এখনকার বিএনপি নেতাদের অবশ্যই বড় সফলতা। এ ছাড়া এখনো এ দেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। এটিও কম সফলতার কথা নয়। 

কালের কণ্ঠ : ড. কামাল হোসেন বৃহত্তর ঐক্যের নেতৃত্ব দেবেন—বাজারে এ রকম একটি গুঞ্জন রয়েছে। আপনি কিছু জানেন?

বি চৌধুরী : আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। তিনিও কিছু বলেননি। তবে খবরের কাগজে এ ধরনের গুঞ্জনের খবর মাঝেমধ্যে দেখি। কোনো দিন দেখি আমি নেতা, আবার কোনো দিন দেখি ড. কামাল হোসেন নেতা। তবে সত্যি কথা হলো, এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা হয়নি। একুটু বলতে পারি, আমি প্রার্থী নই। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।

কালের কণ্ঠ : আপনি বলেছেন নির্বাচনও করবেন না...।

বি চৌধুরী : হ্যাঁ, এটি স্পষ্ট করে বলেছি যে নির্বাচনও করব না। মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী কিছুই হতে চাই না।

কালের কণ্ঠ : নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না প্রথম দু-বছর সরকার পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছেন...।

বি চৌধুরী : হ্যাঁ, মান্না এ ধরনের কথা মাঝেমধ্যে বলেন। আমাকেও বলেন; স্যার আমরা মাহাথিরের মতো দু-বছর চালাব। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে চালাবেন? মান্না বলেন, আমরা নিজেরাই মন্ত্রিসভা গঠন করব। আমি বললাম, কিভাবে ওদের (বিএনপিকে) বাদ দিয়ে! তাহলে তো ভারসাম্যের সরকার হলো না। আমরা ভারসাম্য চাই। যা হোক; এটি একটি ফর্মুলা। আমরা শান্তিপূর্ণ ও অহিংসার রাজনীতির কথা বলব।

কালের কণ্ঠ : ভিশন ২০৩০ রূপকল্পে খালেদা জিয়াও অহিংসা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করার কথা বলেছেন...।

বি চৌধুরী : সেটা তো সরকার গঠনের পরে। তার আগে বা মাঝখানে যদি বাস পোড়াই, আগুন লাগাই—এর ব্যাখ্যা কী হবে? সুতরাং ওনাকে (খালেদা জিয়া) এর মধ্যে টানবেন না। উনি বৃহত্তর ঐক্যের কথা বলে গেছেন এটাই বড় কথা।

কালের কণ্ঠ : আওয়ামী লীগকে হটিয়ে তার চেয়ে সুশাসন দেওয়ার কী পদ্ধতি আছে আপনাদের কাছে? বিশেষ করে রাষ্ট্রব্যবস্থার বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে?

বি চৌধুরী : সন্ত্রাস বন্ধ করব। হত্যা, গুম এগুলো চলতি কাঠামোর মধ্যেও কমিটমেন্ট থাকলে বন্ধ করা সম্ভব। দুর্নীতিও বন্ধ করা সম্ভব। মন্ত্রিসভা দুর্নীতিমুক্ত হলে সব কিছু এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।

কালের কণ্ঠ : মন্ত্রিসভায় নেওয়ার মতো সৎ লোকের তালিকা আপনারা করেছেন?

বি চৌধুরী : বাংলাদেশে প্রচুর সৎ লোক আছে। এ দেশের অনেকে আছেন যাঁরা আল্লাহ তথা মৃত্যুকে ভয় করেন। সমাজের প্রতি কমিটমেন্ট আছে, এমন লোককে আমরা বেছে নিতে চাই।

কালের কণ্ঠ : অনেকে বলেন, বৃহত্তর ঐক্যের ব্যাপারে যুক্তফ্রন্ট বা আপনার তুলনায় ড. কামাল হোসেন বেশি সিরিয়াস...।

বি চৌধুরী : এটি দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। অনেকের উইশফুল থিংকিং। আবার অনেকে বলেন আমিই বেশি সিরিয়াস। তবে এটি ঠিক, যে ঐক্যের ওপর পুরো জাতির পরিবর্তনের অনেক কিছু নির্ভর করছে সেই বিষয়ের সিদ্ধান্ত আমি একটু ভেবেচিন্তে নিতে চাই।

কালের কণ্ঠ : আপনাকে পেছন থেকে টেনে ধরার নেপথ্যে মাহী বি চৌধুরীর ভূমিকা থাকতে পারে বলে অনেকে সন্দেহ করেন। কেউ কেউ এমনও বলেন, সরকারের সঙ্গে তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে...।

বি চৌধুরী : এটি ভুল কথা। টেনে ধরার কিছু নেই। এ ছাড়া মাহীও রাজনীতি করেন। তবে এটি ঠিক, অনেকে তাঁর বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণায় লিপ্ত। এটি পুরোপুরি মিথ্যা প্রচারণা। মাহী সরকারের সঙ্গে কোনো পার্টনারশিপ ব্যবসায় জড়িত নন। তাঁর বিরুদ্ধে ভুয়া কথা বলা হচ্ছে। টেলিকম (আইজিডাব্লিউ) ব্যবসাসংশ্লিষ্ট মাহীর একটি লাইসেন্স রয়েছে; যেটি আওয়ামী লীগের ২৩ জন লোককে দেওয়া হয়েছিল। যেখান থেকে পাঁচটি লাইসেন্স বিএনপির সমর্থক পাঁচজন লোক কিনে নিয়েছে। এটি সরকার থেকে তারা পায়নি। লাইসেন্স পেয়েও কারিগরি কারণে যাঁরা ব্যবসা করতে পারছিলেন না এমন একটি কাগজ মাহী এবং অন্যরা কিনে নিয়েছেন। এটি কি আওয়ামী লীগের ব্যবসা হলো?

সাক্ষাৎকারের এ পর্যায়ে মাহী বি চৌধুরী চলে আসেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, জীবনে কোনো দিন কোনো সরকারের আমলে কারো সঙ্গে ব্যবসা করিনি। 

কালের কণ্ঠ : ঐক্য হলে মাহী বি চৌধুরী তো নির্বাচন করবেন?

বি চৌধুরী : হ্যাঁ, বাবা-দাদার মুন্সীগঞ্জ আসন থেকে সে নির্বাচন করবে।

কালের কণ্ঠ : আপনাদের সঙ্গে ঐক্য হলে অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি ২০ দলীয় জোট ছেড়ে দেবে বলে শোনা যায়...

বি চৌধুরী : আমি জানি না।

কালের কণ্ঠ : জামায়াত কি বিএনপির সঙ্গে ২০ দলে থাকলে বৃহত্তর ঐক্য হবে না? নাকি বৃহত্তর ঐক্যে জামায়াতকে আপনারা নেবেন না, কোনটি?

বি চৌধুরী : প্রত্যক্ষ বা স্বাধীনতাযুদ্ধে বিরোধিতা করেছে এমন দলকে ঐক্যে নেওয়া হবে না—এটাই বলেছি। জামায়াতের নাম নেওয়া হয়নি, কারণ জামায়াত একা নয়; আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য দলেও দু-একজন স্বাধীনতাবিরোধী থাকতে পারে।  

কালের কণ্ঠ : স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে অনেকে বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের দিকেও আঙুল তুলছেন...

বি চৌধুরী : এমন অভিযোগ সঠিক নয়। বিএনপি সরকারের সাবেক একজন পররাষ্ট্রসচিব এমন অভিযোগ তুলেছিলেন, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

কালের কণ্ঠ : বর্তমান সরকার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই... 

বি চৌধুরী : বর্তমান সরকার একেবারে দায়িত্বহীন। মনে হচ্ছে তারা সব কিছু লাঠিসোঁটা দিয়ে ঠিক করতে চাইছে। তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষসতাসীন নেতাকর্মীরাও মনে হচ্ছে একেকজন মহারাজা। তারা পুলিশকে দিয়ে যাকে খুশি গ্রেপ্তার করায়। মানুষের জীবন আজ দুর্বিষহ।

কালের কণ্ঠ : ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন করেও এ সরকার টিকে থাকল কিভাবে?

বি চৌধুরী : মূলত বিদেশিদের ম্যানেজ করে এরা টিকে আছে। তা ছাড়া সরকারীকরণ বা দলীয়করণও বেশি মাত্রায় করে তারা ফল পেয়েছে বলে মনে হয়। একেকটা পুলিশ যেন একেকটা আওয়ামী লীগ সরকার, একেকটা ম্যাজিস্ট্রেট, টিএনও, ওসি বা এসপি ও ডিসি যেন আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি বানিয়ে ফেলতে পেরেছে।

কালের কণ্ঠ : এ অবস্থায় ভালো নির্বাচন কী করে সম্ভব?

বি চৌধুরী : উল্টোভাবে থেকে সম্ভব। মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন এক্সট্রিম লেভেলে চলে গেলে ভোটাররা তখন ভোট দিয়ে এর প্রতিশোধ নিতে চায়। তখন আর দোটানায় থাকে না। মানুষ এখন ঘরে ঘুমাতে পারে না। মায়েরা আতঙ্কে আছে বাচ্চারা ঘরে ফিরবে কি না। স্ত্রীরা আতঙ্কে আছে স্বামী কাজ শেষে ঘরে ফিরতে পারবেন কি না। একটি স্বাধীন দেশে, এখন এ দেশের মানুষকে প্রতি মুহূর্তে ভয়ের যন্ত্রণা, মৃত্যুর যন্ত্রণা সইতে হচ্ছে। যারা আমাদের প্রিয় সন্তানদের গুম করে নিয়ে যায় তারা এ দেশের সব মানুষকে কলঙ্কিত করছে। পুলিশ ও র‌্যাবকে কলঙ্কিত করছে। এটি গ্রহণযোগ্য নয়। এভাবে দেশ চলতে পারে না। তাই আমরা একত্র হয়েছি। এই অপশাসন, এই অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। 

কালের কণ্ঠ : নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আপনারা একজোট হওয়ার মুহূর্তে ড. কামাল হোসেন বিবিসিতে বলেছেন, বর্তমান সরকারের অধীনেই ভালো নির্বাচন হওয়া সম্ভব। এর তাৎপর্য কী?

বি চৌধুরী : কামাল হোসেন সাহেব আমাকে ফোন করে জানিয়েছেন এ ধরনের কথা তিনি বলেননি। বিবিসিতে প্রচারিত তাঁর বক্তব্য সর্বৈব মিথ্যা। এ ব্যাপারে তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

কালের কণ্ঠ : আপনার বয়স এখন প্রায় ৮৮ বছর। কেমন বাংলাদেশ দেখে যেতে চাইছেন?

বি চৌধুরী : শেষ জীবনে এই পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার আগে স্বেচ্ছাচারমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চাই। রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচার বন্ধ করতে হবে। রাজনীতিতে শিষ্টাচার আনতে হবে। এই মুহূর্তে স্বেচ্ছাচার বনাম শিষ্টাচারের লড়াই চলছে।

কালের কণ্ঠ : আপনাকে ধন্যবাদ।

বি চৌধুরী : আপনাকেও ধন্যবাদ।



মন্তব্য