kalerkantho


গাজীপুরে জুলুমের টাকায় পুলিশের সম্পদের পাহাড়

হায়দার আলী ও শরীফ আহমেদ শামীম, গাজীপুর থেকে    

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



গাজীপুরে জুলুমের টাকায় পুলিশের সম্পদের পাহাড়

এসআই হারুনের বাড়ি উঠছে জয়দেবপুর থানার দক্ষিণ ছায়াবীথি এলাকায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঘুরেফিরে পুলিশ কর্মকর্তারা গাজীপুরে বদলি হতে চান। সেখানে পদায়ন হতে পারলে পোয়াবারো। গত কয়েক বছরের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গাজীপুরে চাকরি করার কিছুদিনের মধ্যে গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ বিশাল বিত্তবৈভবের মালিক বনে যান পুলিশ কর্মকর্তারা। অন্য এলাকা থেকে বদলি হয়ে যে পুলিশ কর্মকর্তাই গাজীপুরে এসেছেন, কেউ-ই খালি হাতে ফেরেননি। আবার বছরের পর বছর কেটে গেলেও কেউ এ এলাকা ছেড়ে যেতে চান না। নিয়মমতো গাজীপুর থেকে বদলি করা হলে আবার তদবির করে দু-তিন মাসের মধ্যে ফিরে আসেন। এমনকি একজন পুলিশ কর্মকর্তা এসআই পোস্ট থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হওয়ার পরও গাজীপুরেই আছেন। সরেজমিনে ঘুরে কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুই দশকের ব্যবধানে দুই শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা গাজীপুর মহানগরসহ উপজেলায় বাড়ি, জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। গাজীপুরের শত শত শিল্প-কারখানার মালিক এবং সাধারণ মানুষকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি, ভয়ভীতি দেখিয়ে এসব অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা প্রতি মাসে আদায় করেছেন লাখ লাখ টাকা। মাদক, জঙ্গিসহ বিভিন্ন মামলায় ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে এসব অর্থ। এভাবে জুলুমের টাকায় অসাধু পুলিশ কর্মকর্তারা সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।

গাজীপুর পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ প্রবিধানের ১১২(ঙ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘পুলিশ অফিসারগণ নিজ জেলা ছাড়া অন্য কোনো স্থানে ইন্সপেক্টর জেনারেলের (আইজিপি) পূর্বানুমতি ছাড়া স্বনামে, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, আত্মীয়স্বজন, চাকর-বাকর বা আশ্রিত ব্যক্তির নামে বা বেনামে জমি বা অন্য কোনো স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় করতে পারবেন না।’ কিন্তু এই নিয়ম পদে পদে লঙ্ঘন করেছেন গাজীপুরের কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কালিয়াকৈর ডিগ্রি কলেজের উত্তর পাশে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘পদ্মা ব্রিকস’ ইটভাটার মালিক কালিয়াকৈর থানার সদ্য বদলি হওয়া পরিদর্শক মাসুদ আলম ও স্থানীয় ব্যবসায়ী আখতার হোসেন। গাজীপুরে বদলি হয়ে আসার পর কয়েক বছরের মধ্যেই ইটাভাটাটি নির্মাণ করেন মাসুদ। এ ছাড়া তাঁর রয়েছে ১০টি ড্রাম ট্রাক, চারটি ভেকু, যেগুলোর আনুমানিক মূল্য তিন কোটি টাকা। উত্তরায় রয়েছে দেড় কোটি টাকার ফ্ল্যাট। নিজের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে রয়েছে একটি সাততলা বাড়ি। আরেকটির নির্মাণকাজ চলছে। টাঙ্গাইল শহরের থানাপাড়ায় রয়েছে কোটি টাকার জমি। গ্রামের বাড়িতে কৃষিজমি কিনেছেন প্রায় ৫০ বিঘা। হাইটেক পার্কে প্রভাব খাটিয়ে ড্রাম ট্রাক ও ভেকু দিয়ে কোটি কোটি টাকার ইট ও বালু সরবরাহের ব্যবসা করছেন। এই কাজ করছেন স্থানীয় দুর্ধর্ষ সফিকুল ইসলাম বিদ্যুতের সহযোগিতায়। ঠিকাদার হিসেবে কালিয়াকৈর রেলস্টেশন নির্মাণ কাজও করছেন পরিদর্শক মাসুদ ও বিদ্যুৎ। অন্যের ঠিকাদারি লাইসেন্স দিয়ে কাজটি করছেন তাঁরা।

অভিযোগ রয়েছে, কালিয়াকৈর থানার অপারেশন অফিসার থাকার সময় মাসুদ আলমের প্রশ্রয়ে মুচি জসিমের উত্থান। ওই সময়কার ওসি ফারুক হোসেনও মুচি জসিমকে প্রশ্রয় দেওয়ায় বেপরোয়া হয়ে ওঠে সে। আর মুচি জসিমের সহায়তা নিয়ে কালিয়াকৈরের সাধারণ মানুষকে নাশকতা ও মাদক মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় আসামি বানানো এবং ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে মাসুদ আলম গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়।

উপজেলার শ্রীফলদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রায় সাত বিঘা জমির ওপর দুজন মিলে ইটভাটা করেছেন। শুনেছি, হাইটেক পার্কে তাঁর ড্রাম ট্রাক ও ভেকু চলছে।’

আর গাজীপুর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. বাচ্চুর রয়েছে জয়দেবপুরের  দক্ষিণ ছায়াবীথির বাঙ্গালগাছ সড়কের পাশে পাঁচ কাঠার তিনটি প্লট। প্লট তিনটির আনুমানিক মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। প্লট তিনটিতে টিনশেডের ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছেন তিনি। বিজনেস কমার্স কলেজের পূর্ব পাশে রয়েছে ১০ কাঠার প্লট। নগরীর খালকৈর বটতলায় তিন কাঠার প্লটসহ প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক বাচ্চু।

বাঙ্গালগাছ সড়কের পাশে পরিদর্শক বাচ্চুর প্লটের পাশে নির্মাণ করা হচ্ছে জয়দেবপুর থানার এসআই মো. হারুন উর রশিদের ছয়তলা একটি ভবন। তিন কাঠার ওপর এই ভবনের আনুমানিক মূল্য এক কোটি ৩০ লাখ টাকা। এসআই হারুন বর্তমানে কিশোরগঞ্জে বদলি হয়েছেন। নগরীর বোর্ডবাজারে বাদেকলমেশ্বর ও চক্রবর্তী এলাকায় রয়েছে এসআই হারুনের আরো দুটি বাড়ি। ময়মনসিংহ শহরেও রয়েছে কোটি টাকার একটি আলিশান বাড়ি।

বাঙ্গালগাছ সড়কের পাশে নির্মিত হচ্ছে ১১ তলার একটি ভবন। এই ভবন নির্মাণ করছেন পরিদর্শক বাচ্চু ও জয়দেবপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শাখাওয়াত হোসেনসহ বেশ কয়েকজন। দক্ষিণ ছায়াবীথির ফনিরটেকে রয়েছে এই দুই পুলিশ সদস্যের পাঁচ কাঠার প্লট। এ ছাড়া এসআই রফিকুল ইসলাম হোতাপাড়া পুলিশের ইনচার্জ থাকার সময় অনৈতিকভাবে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে কোটি টাকা কামিয়েছেন। গ্রামের বাড়ি ভালুকায় কিনেছেন তিনি ১৬ বিঘা জমি।

জয়দেবপুর থানার পরিদর্শক সাখাওয়াত হোসেনের বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে। চাকরির শুরু থেকে এ পর্যন্ত ঘুরেফিরে গাজীপুরেই তাঁর পোস্টিং। শ্রীপুরের বরমী-মাওনা পল্লী বিদ্যুৎ সড়কের শ্রীপুর মুলাইদ আমতলী এলাকায় জমি, বাড়ি ও মার্কেট করেছেন। নামে-বেনামে তাঁর রয়েছে অঢেল সম্পদ। চাকরিজীবনের প্রায় পুরো সময় গাজীপুরের জয়দেবপুর থানা ও ডিবিতে কাজ করেছেন। দেড় বছর আগে ডিবিতে কর্মরত অবস্থায় পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পেলেও গাজীপুর ছাড়েননি। পরিদর্শক হলে তাঁকে পদায়ন করা হয় পুলিশের পিবিআই ইউনিটে। কিন্তু ১০-১২ দিনের মধ্যে গাজীপুর জেলায় যোগ দিয়ে জয়দেবপুর থানার ওসির দায়িত্ব পান।

আর কনস্টেবল থেকে এএসআই এবং পরে এসআই পদে পদোন্নতি পান বিশ্বজিৎ। জয়দেবপুর থানার এএসআই ও এসআই থাকার সময় সখ্য গড়ে তোলেন মাদক কারবারিদের সঙ্গে। মাদক কারবার এবং মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অল্পদিনেই বিত্তবৈভব গড়ে তোলেন। শহরের পশ্চিম জয়দেবপুর এলাকায় তাঁর রয়েছে তিনতলা বাড়ি। বাড়িটি নির্মাণের আগে ওই জমির মালিক ছিলেন মাদকসম্রাজ্ঞী ময়না বেগম। মামলায় ফেলে কৌশলে ওই জমিটি কিনে নেন বিশ্বজিৎ। বিশ্বজিৎ বর্তমানে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানায় কর্মরত।

অন্যদিকে কোনাবাড়ী ফাঁড়ির এসআই মোবারক হোসেনের কোনাবাড়ীতে রয়েছে তিনটি বাড়ি। কোনাবাড়ী থানার সামনেই রয়েছে এসআই মোবারকের পাঁচতলা বাড়ি। এ ছাড়া কোনাবাড়ীর আমবাগ পূর্বপাড়ায় রয়েছে ১৮ শতাংশ জমি ও ময়মনসিংহ-ত্রিশাল রোডে কোটি টাকার আলিশান বাড়ি। এ ছাড়া কোনাবাড়ী ফাঁড়ির এএসআই আকরাম হোসেনের রয়েছে কোনাবাড়ীর মিতালি ক্লাবের সামনে সোয়া তিন কাঠা জমির ওপর একটি বাড়ি। এএসআই মহিউদ্দিন আহমেদের রয়েছে দেউলিয়াবাড়ী এলাকায় পাঁচ কাঠা জমির ওপর একটি বাড়ি।

পরিদর্শক রেজাউল ইসলামের রয়েছে সাতটি গাড়ি। নোয়া ও প্রাইভেট কার মিলিয়ে গাড়িগুলো ভাড়ায় চলে গাজীপুরে। এ ছাড়া কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পাশে লক্ষ্মীপুরায় রয়েছে তাঁর মূল্যবান জমি। এসআই জাফর মোল্লার শালনায় রয়েছে কোটি টাকার জমি ও দুটি এলিয়ন কার। এ ছাড়া বদলি হয়ে যাওয়া ডিবির পরিদর্শক রেজাউল করিম, পরিদর্শক মনির হোসেন, পরিদর্শক ডেরিক স্টিফেন কুইয়া, এসআই শরিফ, এসআই করিম, জয়দেবপুর থানার এসআই আজাহার, এসআই নাজমুল, এসআই হারুন অর রশিদ, এসআই সাইফুল, এসআই এনামুল, এসআই রিপন কুমার দাস, এসআই ফিরোজ উদ্দিন, এসআই ফরিদ, ওসি ফারুক হোসেন, এসআই খোরশেদ আলম, এসআই মুক্তি মাহমুদ, এসআই মনিরুল ইসলামসহ অনেক পুলিশ কর্মকর্তার অঢেল সম্পদ রয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে পরিদর্শক মো. বাচ্চু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেখুন, আমার নামে জমি কেনা হয়নি। যারা বলছে, ভুল তথ্য দিয়েছে।’ ছায়াবীথির তিনটি প্লটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেগুলো আমার জমি নয়, পরিবারের অন্য সদস্যদের।’

বিভিন্ন অভিযোগে কালিয়াকৈর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাসুদ আলমকে বদলি করা হয় অন্য জেলায়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে নম্বরটি মাসুদ আলমের নয় বলে জানানো হয়। কালিয়াকৈর থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাসুদ আলমকে চট্টগ্রাম রেঞ্জে বদলি করা হয়েছে। মুুচি জসিমের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’



মন্তব্য