kalerkantho


নিরপেক্ষ সরকার চায় ঐক্যপ্রক্রিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



নিরপেক্ষ সরকার চায় ঐক্যপ্রক্রিয়া

মহানগর নাট্যমঞ্চে গতকাল জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার নাগরিক সমাবেশে হাতে হাত ধরে একাত্মতা জানান বি চৌধুরী, ড. কামাল, মির্জা ফখরুল, আ স ম রবসহ ২০ দলীয় জোটের নেতারা। সমাবেশে জামায়াতের কেউ ছিল না। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া। একই সঙ্গে আগামী ১ অক্টোবর থেকে সারা দেশে সভা-সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। এর নেতারা বলেছেন, শিগগিরই ওই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে কমিটি গঠন করা হবে। ‘কার্যকর গণতন্ত্র, আইনের শাসনের শাসন ও জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলুন’ শীর্ষক নাগরিক সমাবেশ থেকে ওই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চের কাজী বশিরউদ্দিন মিলনায়তনে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া ওই নাগরিক সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশের একেবারে শেষে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ শহীদুল্লাহ ঐক্যপ্রক্রিয়ার পক্ষে ওই ঘোষণা দেন। বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতারা ওই সময় মঞ্চে ছিলেন। ওই দলগুলোর মধ্যেই বৃহত্তর ঐক্য গড়ার কথা চলছে, গতকালের সমাবেশের মধ্য দিয়ে যার এক ধাপ অগ্রগতি হলো বলে মনে করছেন ওই নেতারা। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ঐক্য জরুরি—এমন কথাই উঠে এসেছে সমাবেশে নেতাদের বক্তব্যে। 

ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘আমরা এই নাগরিক সমাবেশ থেকে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি, সরকার  আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে তফসিল ঘোষণার পূর্বে বর্তমান সরকার ভেঙে দেবে।’

দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘এই গণদাবি আদায়ের লক্ষ্যে প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে মুক্তিসংগ্রামের চেতনায় বিশ্বাসী সকল রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, শ্রেণি-পেশা ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য-এর কমিটি গঠন করুন এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধভাবে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ গণজাগরণের কর্মসূচি অব্যাহত রাখুন।’ আগামী ১ অক্টোবর থেকে জাতীয় নেতারা দেশব্যাপী সভা-সমাবেশে যোগ দেবেন বলেও জানানো হয়।

খালেদা জিয়ার আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে : ঘোষণায় আরো বলা হয়, ‘ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে অগ্রাহ্য, ব্যাহত ও অকার্যকর করে অন্যায়ভাবে কারারুদ্ধ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার আইনগত ও ন্যায়সংগত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’

‘আমরা চাই স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির ঐক্য’ : সমাবেশের প্রধান অতিথি যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ‘আমরা চাই, যুক্তফ্রন্ট চায় স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির ঐক্য। যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করবে না, মানচিত্রে বিশ্বাস করবে না, তাদের কেমন করে বিশ্বাস করব? যারা আমাদের পতাকাকে শ্রদ্ধা করতে জানতে না অন্তর থেকে, তারা কখনো স্বীকার করবে না আমাদের এই বাংলাদেশকে তাদের সঙ্গে কেমন করে আমি কথা বলব। আমি বলতে চাই, আমরা দেশ চাই, স্বাধীনতা চাই, মুক্ত গণতন্ত্র চাই। এই সরকারের পতন চাই। আমি সকল রাজবন্দির মুক্তি চাই।’ তিনি বলেন, ‘একটি স্বেচ্ছাচারি গণতন্ত্রবিরোধী আরো একটি অনুরূপ সরকার আসবে ভবিষ্যতে তা বন্ধ করতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোনো সরকার না আসে সে জন্য রক্ষাকবচ তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলেছি। পিছু হটা যাবে না। আমরা চাই জাতীয় ঐক্য। আমরা চাই অপশাসন দূর হয়ে যাক, গণতন্ত্র ফিরে আসুক।’

১০ ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা করে এর জবাব চান বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘যে স্বাধীনতা আনতে লাখ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন, মা-বোনকে ইজ্জত দিতে হয়েছে, তার মূল্যবোধ আজ কেন পদদলিত? দিন-রাত প্রতিটি ঘণ্টা আতঙ্কে কেন থাকবে মা-বোনেরা, শঙ্কায় থাকবে গুম, রাহাজানি নিয়ে? কেন পুলিশ, র‌্যাব, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধীদের ছাড় দিবে? কেন ঘুষ-দুর্নীতিকে স্পিড মানি বলে সরকারীকরণ করা হলো? সব জাতির নৈতিকতা বোধকে পদদলিত করা হলো? এই অধিকার কে দিয়েছে আপনাদের? নিরাপদ সড়কের দাবিতে কচি-কিশোরদের রাস্তায় নামতে হবে কেন, কেন, কেন? কেন কোটা সংস্কারের পক্ষে আমাদের আদরের ধন মেধাবী ছাত্রদের আন্দোলন করতে হবে? মেধাবী ছাত্রদের কী অপরাধ? কেন তাদের গুণ্ডা দিয়ে, হাতুড়ি, চাপাতি দিয়ে আক্রমণ করা হবে? এর জন্যই কি স্বাধীনতা? কেন আপনাদের অপরাধের প্রতিবাদে কথা বলার জন্য সভা-সমাবেশ করার জন্য পুলিশের অনুমতি নিতে হবে? অথচ আপনারা যখন তখন, যত্রতত্র সভা-সমাবেশ করতে পারেন। কেন, কেন?’

বি চৌধুরী আরো বলেন, ‘কেন আমার ভোট আমি দিতে পারব না? সারা পৃথিবীতে ইভিএম পরিত্যক্ত, ইভিএম কেউ চায় না। কেন আপনাদের সুবিধার জন্য ইভিএম গ্রহণ করতে হবে? কেন সরকারি কমর্চারীদের দলীয়করণ করা হলো? আমাদের রাষ্ট্র তুমি কোথায়? আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গী আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র কোথায়? কেন গঙ্গার পানি পাব না, কেন বন্ধুরাষ্ট্র তিস্তার পানি দিবে না, কেন, কেন, কেন? এখন রুখে দাঁড়ানোর সময়, এখন অধিকার আদায়ের সময়। প্রতিবাদের কণ্ঠ ধারালো করতে হবে।’

‘ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি করতেই হবে’ : যুক্তফ্রন্ট চেয়ারম্যান বলেন, ‘একটি স্বেচ্ছাচারী, গণতন্ত্রবিরোধী সরকার গত ১০ বছরে যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, এমনি আবারও একটি অনুরূপ সরকারের ঝুঁকি আমরা নিতে পারি কি? সংসদে, মন্ত্রিসভায়, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি করতেই হবে। না হলে স্বেচ্ছাচারমুক্ত বাংলাদেশের নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করা যাবে না। শুধু স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে ভারসাম্যের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য বেগবান হতে পারে। আমরা বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি এবং বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করছি। আশা করি ফলপ্রসূ হবে।’

সরকারের উদ্দেশে বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ‘১০ বছর ধরে দেশ শাসন করছেন, দেশে গণতন্ত্র আইনের শাসন নেই কেন? গণতন্ত্র হত্যা করেছেন কেন? বলছেন, ভারত বন্ধুরাষ্ট্র। আমরাও মনে করি। কিন্তু তিস্তা-গঙ্গার পানি পাই না কেন—এটা ভারত সরকারকে বলতে হবে।’ সরকারের উদ্দেশে তিনি আরো বলেন, ‘আপনাদের বক্তব্য আপনাদেরই ফেরত দিতে হয়, রাবিশ। এখন সব অন্যায় অত্যাচার রুখে দাঁড়ানোর সময়। প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করার সময়। দাবি আদায়ের সময়। এর পরও জাতীয় ঐক্য না হলে ভবিষ্যৎ লেখা থাকবে।’

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় সরকারের গঠন করা মেডিক্যাল বোর্ডের সমালোচনা করে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ‘তিনি (খালেদা জিয়া) আমার ১৫ বছরের ছোট। তাঁর সুস্থতার জন্য আমি বিবৃতি দিয়েছি। তাঁর চিকিৎসা কে করবে, সরকার? না। রোগী যাঁকে মনোনীত করবেন তিনিই তাঁর চিকিৎসা করবেন। এই অধিকার প্রতিটি নাগরিকের। মনোনীত চিকিৎসক ছাড়া রোগীর রোগের ইতিহাস রিপোর্ট অন্য কেউ জানতে পারবেন না। গায়ে হাতও দিতে পারবেন না। এটা চিকিৎসকরাও জানেন। ডা. জাফরুল্লাহদের এ নিয়ে প্রশ্ন করা উচিত ছিল।’

‘মুক্তির বার্তা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান’ : সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘আমরা জনগণের ভোটাধিকারসহ মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার ও সাংবিধানিক অধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কার্যকর গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। জনগণ এতে ব্যাপক সাড়া দিয়েছে। মৌলিক বিষয়ে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এখন সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার সময় এসেছে। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের প্রচেষ্টা সফল হবে ইনশাআল্লাহ।’ তিনি বলেন, ‘আপনারা নিজ নিজ এলাকায় ফিরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলুন, মুক্তির বার্তা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করুন। অতীতেও জনগণের বিজয়কে কেউ ঠেকাতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না ইনশাআল্লাহ।’

‘নেত্রী খবর পাঠিয়েছেন, যেকোনো মূল্যে জাতীয় ঐক্য করতে হবে’ : বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “দেশে এখন যে দুঃশাসন চলছে এই দুঃশাসন আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের স্বপ্নকে ভেঙে খান খান করে দিয়েছে। আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলোকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। জেলখানা থেকে আমাদের কাছে আমাদের নেত্রী খবর পাঠিয়েছেন, ‘যেকোনো মূল্যে জাতীয় ঐক্য তৈরি করে এই দুঃশাসন থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। আমার কী হবে না হবে সেটা ভাবার দরকার নেই।’” ওই সময় নেতাকর্মীরা ‘খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই’ বলে স্লোগান দেয়।

ঐক্যবদ্ধভাবে দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন শুরু করার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘আজকে সবাই একটি কারণে উপস্থিত হয়েছেন, এই সরকারের পরিবর্তন দেখতে চান। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি দিতে হবে। যিনি সারাজীবন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে গেছেন, তাঁকে আজ অন্যায়ভাবে মিথ্যা মামলায় কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। খালেদা জিয়া বলে গিয়েছিলেন, দেশকে বাঁচাতে হলে, মানুষকে বাঁচাতে হলে, এই দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে জাতীয় ঐক্য ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরো বলেছিলেন, সব দল-মত-নির্বিশেষে, ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দল, সংগঠন, ব্যক্তি—সবাই এক হয়ে স্বৈরাচার, যারা মানুষের বুকে পাথর চাপা দিয়ে বসে আছে তাদেরকে সরাতে হবে। এ জন্য জনগণের ঐক্যই হচ্ছে একমাত্র বিকল্প, অন্য কোনো বিকল্প নেই।’

ফখরুল বলেন, ‘আজকে এই গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলনে হাজার হাজার প্রাণ গেছে। বিএনপির পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী গুম হয়ে গেছে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার মামলা নতুন করে দেওয়া হয়েছে। ইতিপূর্বে ৭৮ হাজার মামলা দেওয়া হয়েছিল। এই ১৮ দিনে মামলার সংখ্যা হচ্ছে তিন হাজার ৭৭৬, এজাহার করা হয়েছে ৭৮ হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। যেখানে অজ্ঞাতপরিচয় নামে মামলা দেওয়া হয়েছে তিন লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। ঘরে ঘরে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই, আন্দোলন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা। আগামী নির্বাচনে যাতে অংশ নিতে না পারে।’

‘সব দলের দাবিগুলো প্রায় একই’ : মির্জা ফখরুল আরো বলেন, ‘আজকে এ সরকারকে যদি আমরা সরিয়ে দিতে না পারি, জনগণের সরকার যদি প্রতিষ্ঠা করতে না পারি, জনগণের ঐক্যের সরকার যদি প্রতিষ্ঠা করতে না পারি তাহলে এ দেশের স্বাধীনতা আর থাকবে না। জনগণ তাদের অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হবে। সে জন্য আজকে যে দাবিদাওয়াগুলো এসেছে সব দলের দাবিগুলো প্রায় একই। যেখানে প্রধান শর্ত হচ্ছে তফসিলের আগে এ সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। সংসদ ভেঙে দিতে হবে। নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে ম্যাজিট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। ইভিএম পদ্ধতি কোনো মতেই এই নির্বাচনে প্রয়োগ করা যাবে না।’

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘এই সভার মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যে আমরা একধাপ এগিয়ে গেছি। আর যেটুকু বাকি আছে অতি দ্রুত সেই ঐক্যে অর্জন করে সামনের দিকে নিয়ে যেতে পারব।’

‘জাতীয় ঐক্যের শুরু’ : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বেগম জিয়াই প্রথম জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় আজ এই প্ল্যাটফর্ম থেকে জাতীয় ঐক্যের শুরু হলো। এর মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘এই স্বৈরাচারকে সরাতে জাতীয় ঐক্য ছাড়া সম্ভব নয়। এটা মাইলফলক, নতুন যাত্রা শুরু হলো।’ ওই সময় তিনি জাতীয় ঐক্যের পাঁচ দফাকে সমর্থন করে দলীয় দুই দফা যোগ করেন। তিনি বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যের নেতাদের বলব, আপনারা কাজ করুন, আমরা আপনাদের পাশে আছি।’

‘এই মুহূর্তে দরকার জাতীয় ঐক্যের সরকার’ : জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘ব্যাংকের টাকা নেই। দেশটা লুটের মালে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রকে নৈতিকভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে। এ জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি। এ থেকে উত্তরণে এখন জাতীয় ঐক্য দরকার, নির্দলীয় সরকার দরকার। সরকারকে বলছি কোনো রাজবন্দিকে কারাগারে রাখতে পারবেন না। সবাইকে মুক্তি দিতে হবে। এ মুহূর্তে দরকার জাতীয় ঐক্যের সরকার। অবশ্যই আপনাদের পদত্যাগ করতে হবে।’

‘ঐক্য তো হয়েই গেছে’ : নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আমরা বলছি ওই লুটেরা ভোট চোরদের বাদ দিয়ে বাকি যত মানুষ আছেন সকলে এক বাক্যে আওয়াজ তুলছি—আমরা স্বচ্ছ নির্বাচন চাই। সেই নির্বাচন দিতে হবে। এ জন্য আমাদের যুক্তফ্রন্ট কর্মসূচি দিয়েছি। আমরা এবং ড. কামাল হোসেন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া মিলে পাঁচ দফা দাবি ও ৯ দফা লক্ষ্য ঘোষণা করেছি, যার মধ্যে আপনাদের দাবি আছে। এখানে বিএনপির নেতারা আছেন। আমি দেখেছি শেষ পর্যন্ত তারা ১৫ দফা দাবির কথা বলেছেন যেটা আমাদের দাবির সঙ্গে প্রায় মিলে যায়। তাই এই ঐক্য তো হয়েই গেছে। লাখো কোটি জনতা এই ঐক্য চায়। কারো ক্ষমতা নাই এই ঐক্য, এই ঐক্যের শক্তি, এই বিজয়কে রুখতে পারে।’

‘ঐক্যপ্রক্রিয়া গণতন্ত্রকে সাহস জোগাবে’ : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেন, ‘ড. কামালের নেতৃত্বে যে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে, আমরা তার সাফল্য কামনা করি। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে ভোটাধিকারের জন্য কেন আজ আন্দোলন করতে হবে? এটা খুবই লজ্জাকর। এই ঐক্য প্রক্রিয়া গণতন্ত্রকে সাহস জোগাবে।’

‘ঐক্য হবে ঘরে ঘরে, জনে জনে’ : ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, ‘এই জাতীয় ঐক্য হবে দলে দলে নয়, নেতায় নেতায় নয়; ঘরে ঘরে, জনে জনে।’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বিদ্যমান অবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। ওই সময় তিনি যুক্তফ্রন্টের পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন।

গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘দেশে একটি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। জামায়াতসহ একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধীরা রাজনীতি করতে পারবে না।’

বিকেল ৩টায় নাগরিক সমাবেশ শুরু হওয়ার আগেই মিলনায়তন পূর্ণ হয়ে যায় নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে। মিলনায়তনে বাইরের লোকজন যাতে বক্তব্য শুনতে পারে সে জন্য পুরো প্রাঙ্গণে মাইক টানানো হয়। ‘এক দাবি এক লক্ষ্য, দেশের স্বার্থে জাতীয় ঐক্য’; ‘নবীন-প্রবীণ আয়রে ভাই, দেশ বাঁচাতে ঐক্য চাই’; ‘একাত্তরের চেতনা, জাতীয় ঐক্য আরেক বার’; ‘নব্বইয়ের আকাঙ্ক্ষা জাতীয় ঐক্য আরেকবার’ ইত্যাদি স্লোগানে এবং মুহুর্মুহ করতালিতে মিলনায়তন ছিল সরব।

সমাবেশের শুরুতে উদীচীর শিল্পী সুরাইয়া পারভিন ও মায়শা সুলতানা গণসংগীত পরিবেশ করেন। মহানগর নাট্যমঞ্চের আশপাশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল।

শুরুতে আধঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় মিলনায়তনের ভেতরে সমাবেশ পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটে।

সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, বিকল্পধারার মহাসচিব আবদুল মান্নান, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, শিক্ষাবিদ মোমেনা খাতুন প্রমুখ।

উপস্থিত ছিলেন বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, বিকল্পধারার মাহী বি চৌধুরী, ওমর ফারুক, ২০ দলীয় জোটের শরিক দল জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, আহসান হাবিব লিংকন, কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, খেলাফত মজলিশের মাওলানা মজিবুর রহমান, আহমেদ আবদুল কাদের, এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার খোন্দকার লুৎফর রহমান, আসাদুর রহমান খান, জমিয়তের উলামায়ে ইসলামের মাওলানা নুর হোসেইন কাশেমী, আবদুর রব ইউসুফী প্রমুখ।



মন্তব্য