kalerkantho


বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর চায় না ক্ষমতাসীনরা

বিএনপি না এলেও ৩০০ আসনে লড়াইয়ের প্রস্তুতি

আবদুল্লাহ আল মামুন ও তৈমুর ফারুক তুষার    

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর চায় না ক্ষমতাসীনরা

বিএনপিকে ছাড়াই আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। সেই সঙ্গে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার তৎপরতা। তারা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনের ডাক দিলে তা মোকাবেলার প্রস্তুতি চলছে ক্ষমতাসীন মহলে। বিএনপি ও তার মিত্ররা দাবি আদায়ের নামে আন্দোলনের ডাক দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে না এলে গতবারের মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফাঁদে পড়তে চায় না ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট। প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি নির্বাচনে না এলেও ৩০০ আসনেই যেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকে—এমন প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। তারা ১৪ দলের শরিক দলগুলো, জাতীয় পার্টি এবং আরো কয়েকটি ছোট রাজনৈতিক জোট যেন নির্বাচনে অংশ নেয় সে লক্ষ্যে কাজ করছে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে নির্বাচন করার প্রস্তুতির ঘোষণা দিয়েছেন। বিএনপি নির্বাচনে না এলে জাপা ৩০০ আসনে লড়বে বলেও এরশাদ জানান। আরেক সূত্রে জানা যায়, বিএনপি নির্বাচনে না এলে ১৪ দলের শরিক রাজনৈতিক দলগুলো এককভাবে লড়তে পারে। বিষয়টি আলাপ-আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের আসন সমঝোতা হবে। ‘ডামি’ প্রার্থী দিয়ে জয়ী করে আনা হবে শরিক দলগুলোর নেতাদের। অনুরূপভাবে বাম সংগঠন ও ইসলামী দলগুলোর ছোট ছোট জোটকেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আনার চেষ্টা রয়েছে।

ইতিমধ্যেই সারা দেশে সভা-সমাবেশসহ নানা প্রচারণার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী আমেজ তৈরিতে মাঠে নেমে পড়েছে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, তরীকত ফেডারেশনসহ জাতীয় পার্টি-জেপি। তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এড়ানো এবং বিএনপির চেয়ে নির্বাচনী প্রচারণার মাঠে এগিয়ে থাকতে এখন থেকে নির্বাচন পর্যন্ত মাঠে থাকবে। এর মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তির নামে বিএনপির যেকোনো তৎপরতা প্রতিরোধ এবং জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য আন্দোলন মোকাবেলার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সমাবেশকে ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের নতুন চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করছে ক্ষমতাসীনরা।

আগামীকাল সোমবার সকালে ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে ১৪ দলের বৈঠক ডাকা হয়েছে। এ বৈঠকে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ হবে। ঐক্যপ্রক্রিয়ার ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ দলের করণীয় কী হবে তা নিয়েও আলোচনা হবে। করণীয় নির্ধারণ করতে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনাও করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমেরিকা থেকে দেশে ফিরলে সার্বিক বিষয় তাঁকে অবহিত করা হবে।  

১৪ দলের প্রধান শরিক আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয় গত ৩০ ও ৩১ আগস্ট সিলেট সফরের মধ্য দিয়ে। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা এ সফরে অংশ নেন। এরপর চলতি মাসে রেলপথে ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারণা চালান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। গতকাল শনিবার তাঁরা সড়কপথে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারণায় গেছেন। এসব সভা-সমাবেশের মধ্য দিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করা ও দলীয় কোন্দল নিরসনের চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। মাঠের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে আগামী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের এ ধরনের নানা কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

গতকাল পাবনার সাঁথিয়ায় ১৪ দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মিটিংকে ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের নতুন চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করা হয়। জনসভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

১৪ দলের শরিক দলগুলোও সারা দেশে ব্যাপকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতে যাচ্ছে। গত তিন দিনে জাসদ উত্তরবঙ্গের রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়ার বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি নির্বাচনী জনসভার আয়োজন করে। এসব জনসভায় জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ দলটির কেন্দ্রীয় বেশ কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। জনসভাগুলো থেকে সংসদ নির্বাচনে জাসদের স্থানীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় জনসভা শেষে দেশের অন্যান্য বিভাগেও এ নির্বাচনী প্রচারণার কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে জাসদ।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে জানান, বিএনপি নির্বাচনে না এলেও এবারে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হবে না। গতবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফাঁদে পড়ে সরকারের অনেক বদনাম হয়েছে। জাতীয় পার্টি, ১৪ দলের একাধিক শরিক ও বাম দলগুলোর অংশগ্রহণে নির্বাচন মোটামুটি উৎসবের আমেজেই অনুষ্ঠিত হবে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, ১৪ দলের মুখপাত্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরা সব এক হয়েছে। আমরা মাঠে ময়দানে আছি। ওরা (বিএনপি) আছে ড্রয়িং রুমে। সেখানে বসে পলিটিক্স করছে। আর কিছু লোক এসি হলরুমে বসে হুংকার দিচ্ছে। তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ হবে। আওয়ামী লীগ জনগণকে নিয়েই তাদের মোকাবেলা করবে। নির্বাচনেও জয়ী হবে।’

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনী কাজ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই সাতক্ষীরায় আমাদের কর্মসূচি পালন হয়েছে। এরপর আমাদের দলের সাধারণ সম্পাদক নাটোর, বগুড়া, গাইবান্ধায় যাবেন।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে নানা মেরুকরণ হচ্ছে। উত্তর দক্ষিণ মিলে গেছে। কামাল হোসেনের ঐক্য প্রক্রিয়ায় এক-এগারোর মঈনুল হোসেন ও বিএনপি মিলে গেছে। আমরা চাই এরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুক। আমরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন চাই না।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা রাজপথে আছি, থাকব। আজ (শনিবার) ফেনীতে জনসভা করলাম। এতে লক্ষাধিক জনতা উপস্থিত ছিল। এ উপস্থিতি প্রমাণ করে জনগণ আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে। এই জনগণই বিএনপিকে মোকাবেলা করবে।’

জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অক্টোবরের মধ্যেই সারা দেশে প্রথম পর্যায়ে আমাদের নির্বাচনী প্রচারণার জনসভাগুলো শেষ হবে। আমরা বিভিন্ন এলাকায় জনসভা করে আমাদের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। আমরা মনে করি এবারে বিএনপি নির্বাচনে আসবে। তবে না এলেও এবারে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হবে না।’

ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা ইতিমধ্যেই সাতক্ষীরায় সমাবেশ করে এসেছেন। দলটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন কিছুদিন আগে পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় ঢাকার বাইরে খুব বেশি কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারছেন না। এর পরও শিগগিরই বরিশাল ও যশোরে ওয়ার্কার্স পার্টির সমাবেশে অংশ নেবেন মেনন।

সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার এ মিটিং। জামায়াতের বিরোধিতার কথা বলে জড়ো হলেও এর মূল নিয়ামক শক্তি জামায়াত। তাই চূড়ান্তভাবে ফসল যাবে জামায়াত তথা দক্ষিণপন্থীদের ঘরে। আমরা জনগণকে নিয়ে এ ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডকে মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত আছি।’

তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী ও মহাসচিব রেজাউল হক চাঁদপুরী ইতিমধ্যেই সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে এ সপ্তাহে ঢাকায় কয়েকটি বৈঠক করবে দলটি।



মন্তব্য