kalerkantho


রূপগঞ্জে তিন যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার

♦ ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ স্বজনদের
♦ তিনজনের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও মাদকের মামলা আছে : পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রূপগঞ্জে তিন যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার

নূর হোসেন বাবুর গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে ছিল ৩০০ ফুট সড়কে। সেখানে রক্তের স্রোত দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে স্ত্রী-কন্যা। ছবি : লুৎফর রহমান

রাজধানীর উপকণ্ঠ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় তিন যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার সকালে উপজেলার পূর্বাচল উপশহরের একটি সেতুর নিচে লাশ তিনটি পাওয়া যায়। তাঁরা তিনজনই রাজধানী ঢাকার বাসিন্দা।

নিহতদের স্বজনরা দাবি করছে, গত বুধবার শিমুল আজাদের গ্রামের বাড়ি থেকে ফেরার পথে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ফেরিঘাটের সামনে থেকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্য পরিচয়ে তাঁদের বাস থেকে আটক করা হয়। পুলিশই এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করছে তারা।

অন্যদিকে পুলিশ বলছে, নিহত তিন যুবকের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও মাদকের মামলা রয়েছে। মাদক কারবার বা সন্ত্রাসীদের মধ্যে বিরোধের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। নিহত তিন যুবক হলেন মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বিক্রমপুর গ্রামের মৃত আব্দুল ওহাবের ছেলে নূর হোসেন বাবু (২৯), তাঁর ভায়রা ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গুরেলা এলাকার আব্দুল মান্নানের ছেলে শিমুল আজাদ (২৭) এবং তাঁদের বন্ধু ও ব্যাবসায়িক অংশীদার রাজধানীর মহাখালী দক্ষিণপাড়ার মৃত শহিদুল্লাহর ছেলে সোহাগ ভূঁইয়া (৩৩)।

পুলিশ জানিয়েছে, তিনজনই রাজধানীর মুগদার মাণ্ডা এলাকায় থাকতেন। ওই এলাকায় তাঁরা গার্মেন্টের ঝুট ব্যবসা করতেন। এ ছাড়া সোহাগ মহাখালী এলাকায় ডিশ কেবল নেটওয়ার্কের ব্যবসা করতেন। সোহাগের বিরুদ্ধে বনানী থানায় চারটি মাদক ও একটি হত্যা মামলা আছে। একই থানায় শিমুল আজাদের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও মাদক আইনে চারটি মামলা আছে। বাবুর বিরুদ্ধে টঙ্গিবাড়ী থানায় মাদক মামলা আছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে তিনজনকে হত্যা করে পূর্বাচলের খালের কাছে ফেলে রাখা হয়। মাথা ও শরীরে গুলি করে তাঁদের হত্যা করা হয়েছে।

রূপগঞ্জ থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, গতকাল সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রূপগঞ্জের পূর্বাচল উপশহরের কাঞ্চন-কুড়িল বিশ্বরোড সড়কের আলমপুর এলাকার ৯ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর সেতুর নিচে পাশাপাশি গুলিবিদ্ধ তিন যুবকের লাশ পড়ে থাকতে দেখে এলাকাবাসী পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশগুলো উদ্ধার করে। এ সময় লাশের দেহ তল্লাশি করে একজনের পকেট থেকে একটি ভিজিটিং কার্ড উদ্ধার করা হয়। এর সূত্র ধরে তাঁর পরিবারের সঙ্গে কথা বললে তারা রূপগঞ্জ থানায় এসে লাশ শনাক্ত করে। অন্যদের স্বজনরাও আসে। নিহতদের প্রত্যেকেরই মাথা, বুকসহ শরীরের একাধিক স্থানে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে।

ওসি আরো বলেন, বাবুর পকেটে ৬৫টি ইয়াবা পাওয়া গেছে। বনানী থানায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনজনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে। লাশ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু হচ্ছে। তিনি জানান, নারায়ণগঞ্জ সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে গতকালই স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, তিনজনই একসময় মহাখালীর সাততলা বস্তি ও এর আশপাশের এলাকায় থাকতেন। সোহাগ মহাখালীর দক্ষিণপাড়া এলাকায় ডিশ ব্যবসা করলেও থাকতেন শিমুলের বাসার কাছে মুগদার মাণ্ডার হাজির বাড়িতে। আর শিমুল থাকতেন মাণ্ডার ৭ নম্বর সড়কের ১১ নম্বর বাড়িতে। একই এলাকায় থাকতেন বাবু। শিমুল বিয়ে করেন বাবুর শ্যালিকাকে। তিনজন একসঙ্গে চলাফেরা করতেন বলে জানা গেছে। ঝুট ব্যবসা, ডিশ ব্যবসা বা মাদক কারবার নিয়ে বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা।

নিহত ব্যবসায়ী শিমুলের স্ত্রী আয়েশা আক্তার নীপা বলেন, ‘আমার স্বামী শিমুল ভগ্নিপতি নুর হোসেন বাবু ও তাঁদের ব্যবসার পার্টনার সোহাগ মিলে বুধবার সকালে তাঁর (শিমুলের) গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের গুরেলায় বেড়াতে যায়। এর পর থেকে তাঁরা নিখোঁজ ছিলেন। তাঁদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বৃহস্পতিবার ভোরে এক গাড়ির (বাস) সুপারভাইজারের মাধ্যমে জানতে পারি ফেরিঘাটের সামনে থেকে ডিবি পুলিশের জ্যাকেট পরা লোকজন তাঁদের আটক করে নিয়ে গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘পুলিশ আটক করে তাঁদের অজ্ঞাত কারণে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। আর কে মারবে? তাঁরা কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।’ 

স্বজনরা দাবি করে, ফেরিঘাটে বাস থেকে তিনজনকে আটকের ঘটনা শুনে তারা ডিবি অফিসে খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করছিল। ঢাকার বাইরেও খোঁজ নিচ্ছিল। তবে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না সে ব্যাপারে তথ্য দিতে পারেনি তারা।

সরেজমিনে পূর্বাচলে গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা বলে, রাতে সুনসান থাকার কারণে অপরাধীরা সেখানে লাশ ফেলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ভোরে লোকজন বিষয়টি টের পায়। কাঞ্চন থেকে কুড়িল বিশ্বরোড পর্যন্ত প্রায় ১৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ৩০০ ফুট রাস্তাটি সন্ধ্যার পর থেকেই সুনসান হয়ে যায়। রাতের আঁধারে অপরাধীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। অপরাধীরা নিরাপদ স্থান হিসেবে এ এলাকাটিকে ব্যবহার করে। প্রায়ই হত্যার পর লাশ ফেলে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। নেই পুলিশের টহল ব্যবস্থা।

এদিকে ঝিনাইদহ থানার ওসি ইমদাদুল হক বলেন, শিমুল গ্রামে শিমুল আহাদ নামে পরিচিত। ছোটবেলা থেকেই তিনি মহাখালীর সাততলা বস্তি এলাকায় থাকেন। এলাকায় কেউ তাঁর সম্পর্কে বেশি কিছু জানে না। তবে বনানী থানায় তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা ও মাদকের চারটি মামলা আছে বলে জানা গেছে।

রূপগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম বলেন, শিমুল ও সোহাগের বিরুদ্ধে মামলা আছে বলে শোনা যাচ্ছে। তবে বনানী থানার ওসি এ বি এম ফরমান আলী বলেন, নিহতদের বাসা মাণ্ডা এলাকায় কি না এবং মামলার বিষয়ে এখনো খোঁজ নেওয়া হয়নি।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন ঝিনাইদহ, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি)



মন্তব্য