kalerkantho


সরকারবিরোধীরা সংগঠিত হচ্ছে

আশার আলো দেখছে বিএনপি

এনাম আবেদীন   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সরকারবিরোধীরা সংগঠিত হচ্ছে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ধীরে ধীরে সংগঠিত হচ্ছে বিএনপিসহ সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো। যদিও এসব দলের মধ্যে সবাই এখনই নির্বাচনী জোট গড়ে তুলতে যাচ্ছে না। তবে ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ’ নির্বাচন আদায়ের প্রশ্নে দলগুলোর পক্ষ থেকে ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে সাদৃশ্য ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে।

কর্মসূচির এ সাদৃশ্যকে ঐকমত্য হিসেবে গণ্য করে বিএনপি মনে করছে, এই ‘ঐকমত্যই’ একসময়ে রাজপথে সরব আন্দোলনে রূপ নেবে। ফলে রাজপথের সবচেয়ে বড় এই দলটির মধ্যে এক ধরনের আশাবাদ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও দলটির তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতাদের নামে নতুন করে আবার ব্যাপক হারে মামলা দেওয়া শুরু হয়েছে। 

বিএনপি আরো মনে করে, নির্বাচন প্রশ্নে বর্তমান সরকারের ‘নেতিবাচক উদ্দেশ্য’ও তারা বহির্বিশ্বে ঠিকমতো প্রচার করতে পেরেছে। সে কারণে বিএনপির প্রতিনিধিদলকে ডেকে দেশের নির্বাচনপূর্ব পরিস্থিতি জেনেছে জাতিসংঘও। গত বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্ক সময় সকালে (বাংলাদেশ সময় রাতে) জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সংস্থার সহকারী মহাসচিব মিরোস্লাভ জেনকার সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এসব তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত সরকার চাপের মুখে পড়বে বলে মনে করে বিএনপি ও এর মিত্ররা।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রশ্নে সরকারের নেতিবাচক অবস্থানের কারণেই রাজনৈতিক দলগুলো একসুরে কথা বলছে। এখন সবার কমন দাবি হলো সুষ্ঠু নির্বাচন। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক মহলও এ দেশের নির্বাচনপূর্ব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।’ তাঁর মতে, এটি বিএনপির আশাবাদের কারণ হতে পারে। তবে তাদের দাঁড়াতে হবে নিজের শক্তির ওপর ভর করে।

বিএনপিসহ যুক্তফ্রন্টের অন্তর্ভুক্ত তিনটি দল (বিকল্পধারা, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য), জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া (গণফোরামসহ দু-একটি দল) এবং আটটি দলের সমন্বয়ে গঠিত বাম গণতান্ত্রিক জোটের ঘোষিত কর্মসূচি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মোটা দাগে তাদের সবার মূল দাবিগুলো প্রায় একই এবং তা বিএনপির দাবির কাছাকাছি।

সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপি যেসব দাবি তুলছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সরকারের পদত্যাগ তথা সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন, আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন ও ইভিএম বাতিল। প্রায় এই একই রকম পাঁচটি দাবি ও ৯ দফা লক্ষ্য নিয়ে আজ শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যৌথ ঘোষণা দেবে যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া। কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিএনপির ১৫ দফা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা যায়।

এদিকে সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নে সাম্প্রতিককালে সিপিবি-বাসদ ও গণসংহতি আন্দোলনসহ বামপন্থী আটটি দলের সমন্বয়ে গঠিত বাম গণতান্ত্রিক জোটের কর্মসূচিও প্রায় একই রকম। নির্বাচনে কালো টাকা ও পেশিশক্তি বন্ধ করাসহ আরো কিছু দাবি বামপন্থী দলগুলোর কর্মসূচিতে থাকলেও নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপি ও ‘উদারপন্থী’ (যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া) দলগুলোর উত্থাপিত দাবির সঙ্গে কোনো অমিল নেই। তবে বিএনপির ১৫ দফায় দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও অন্য দলগুলোর কর্মসূচিতে তা নেই। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার বিষয়ে ‘উদারপন্থী’ দলগুলোর কর্মসূচির সঙ্গে মিল রয়েছে বিএনপির ১৫ দফার।

রাজনৈতিক সংকট উত্তোরণে গত বৃহস্পতিবার গণসংহতি আন্দোলন যে নতুন জাতীয় সনদ ও অঙ্গীকার ঘোষণা করেছে তাতেও এসব দাবির কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে রেখে ঐকমত্যের সরকার হবে না। এ ছাড়া আগামী তিনটি নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি চালু, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধাপরাধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে মোকাবেলার কথাও বলা হয়েছে গণসংহতির প্রস্তাবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন এবং সংসদ ভেঙে নির্বাচন দেওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে আগামী ৫ অক্টোবর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি মুহাম্মদ রেজাউল করীম। গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, সংকট উত্তোরণ করা না গেলে বিশ্বের অনেক সংঘাতপূর্ণ দেশের মতো বাংলাদেশেও গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। 

যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সবাই এক জায়গায় আসার চেষ্টা করছি, দেখা যাক কী হয়!’ তিনি আরো বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন আদায়ের প্রশ্নে বিভিন্ন দলের ঘোষিত কর্মসূচিতে অনেক মিল রয়েছে। কিন্তু এটি বৃহত্তর ঐক্যের জায়গায় নিয়ে যাবে কি না তা পরিস্থিতি বলে দেবে।

এ প্রসঙ্গে যুক্তফ্রন্টের মুখপাত্র নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যুক্তফ্রন্ট ও ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যে ঐক্য হওয়ায় আমরা আশাবাদী হয়ে উঠেছি। আশা করছি এই ঐক্যই বৃহত্তর ঐক্যের সিঁড়ি তৈরি করবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী জোট গঠনের বিষয়টি পরের আলোচনা। কিন্তু সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আদায়ের আন্দোলনে সবাইকে দরকার। আর বিষয়টি সবাই উপলব্ধি করেছেন বলেও মনে হয়।’

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকির মতে, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এ মুহূর্তে দেশের বেশির ভাগ দল ও মানুষের দাবি বলেই জনমত সংগঠিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এ দাবির কথা ২০১৪ সাল থেকে আমরা বলে আসছি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী জোট একটি ইস্যু, কিন্তু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য দাবিদাওয়া ভিন্ন ইস্যু। আমরা এখন সকলে পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আন্দোলন করছি। ফলে সব দলের ভাষা তো এক হবেই।’ 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসলে সরকারের বিরুদ্ধে নয়, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আদায়ের ইস্যুতে সবাই যে যার অবস্থান থেকে মাঠে নেমেছে। এতে মনে হচ্ছে সবাই সংগঠিত হচ্ছে।’ তাঁর মতে, বিএনপির সঙ্গে ঐকমত্য বড় কথা নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, এখন যেভাবে নির্বাচন হচ্ছে সেটি কেউ মানতে রাজি নয়। নির্বাচন প্রশ্নে তাই কতগুলো কমন ইস্যু সামনে এসেছে।



মন্তব্য