kalerkantho


শ্রীপুর মেয়রের দুর্নীতির বিচারের কথা জানে না মন্ত্রণালয়

লুটে শুরু, শেষ জালিয়াতিতে

চার মামলায় মেয়র আনিছুর রহমান সেজে তাঁর সহযোগী নূরে আলম মোল্লা আদালতে হাজিরা দিয়ে এখন জেলে

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, গাজীপুর   

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



লুটে শুরু, শেষ জালিয়াতিতে

আনিছুর রহমান

তহবিল লোপাটই ছিল গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার মেয়র আনিছুর রহমানের নেশা। মেয়রের বিরুদ্ধে হাটবাজার ইজারা দেওয়ার টাকা আত্মসাতের চারটি মামলার বিচার চললেও তাঁর লুটের নেশা থামেনি। মেয়র ও তাঁর সহযোগীরা পৌরসভার তহবিল লুটপাট করেই যাচ্ছিলেন সমান তালে। দুই দফায় দুর্নীতি দমন কমিশনের করা মামলাগুলোর বিচার চলমান হলেও এখনো তিনি মেয়র পদে আছেন বহাল তবিয়তে। তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে পৌরসভার কাছে অনুদান চেয়ে করা কথিত বেশ কয়েকটি আবেদনপত্র সূত্রে জানা গেছে, কাল্পনিক দরিদ্র নাগরিককে অর্থদান, অস্তিত্বহীন সংগঠনকে অনুদান ও ভুয়া প্রকল্পের মাধ্যমে তহবিল প্রায় ফাঁকা করে দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া পৌর এলাকায় নলকূপ স্থাপন, সড়ক সংস্কারসহ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, বিভিন্ন মালপত্র কেনার নামে টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

উল্লেখ্য, দুর্নীতি দমন কমিশন ২০১৪ ও ২০১৫ সালে দুই দফায় মেয়র আনিছুর রহমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে চারটি মামলা করে। অভিযোগপত্র দেওয়ার পর বিচারের জন্য ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে আসে সেই মামলাগুলো। আদালত চারটি মামলায় গত বছর মেয়রের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। কিন্তু মেয়র আদালতে হাজির হননি। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর তাঁকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

এর মধ্যে গত রবিবার চারটি মামলার মেয়র আনিছুর রহমান সেজে তাঁর সহযোগী নূরে আলম মোল্লা আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চান। একটি মামলায় জামিন দিলেও অন্য তিনটিতে জামিন নামঞ্জুর করে আদালত আসামিকে কারাগারে পাঠান। সোমবার একটি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের শুনানি থাকায় আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। তখন জানা যায়, মেয়র গত ৮ সেপ্টেম্বর সরকারি সফরে ইন্দোনেশিয়া গেছেন। আদালত গত মঙ্গলবার মেয়র ও তাঁর সহযোগী নূরে আলমের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন।

দুর্নীতির অভিযোগে করা মামলায় মেয়র আনিছুর রহমানের বিচার শুরু হলেও কেন তাঁকে বরখাস্ত করা হয়নি জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নগর উন্নয়ন) মাহবুব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শ্রীপুরের মেয়রের বিরুদ্ধে কোনো মামলায় চার্জশিট হয়েছে বলে কাগজপত্র আমাদের দপ্তরে আসেনি। কোনো মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গৃহীত হওয়ার খবর আমাদের কাছে এলে আমরা তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

শ্রীপুর পৌরসভার যাত্রা শুরু হয় ২০০০ সালে। ২০১৫ সালে তৃতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হন গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আনিছুর রহমান।

পৌরসভার তহবিল লোপাট : ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক শ্রীপুর শাখা এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) মাওনা শাখাসহ পাঁচটি ব্যাংকে ১০টি হিসাব রয়েছে শ্রীপুর পৌরসভার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর পৌরসভার চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী জাহিদ হাসান ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের শ্রীপুর শাখা থেকে (হিসাব নম্বর ৩১০৯) সাতটি চেকের মাধ্যমে এক লাখ ৭৪ হাজার ৩০০ টাকা উত্তোলন করেন। প্রতিটি চেকে টাকার পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ৯০০ টাকা। এর পরদিন ৫ নভেম্বর জাহিদ হাসান ওই ব্যাংকের ওই হিসাব নম্বর থেকেই পাঁচটি চেকের মাধ্যমে আরো এক লাখ ২৪ হাজার ৫০০ টাকা উত্তোলন করেন। প্রতিটি চেকেই টাকার পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ৯০০ টাকা। চুক্তিভিত্তিক আরেক কর্মচারী আলমগীর হোসেন ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের পৌরসভার হিসাব নম্বর থেকে এক লাখ ৭২ হাজার ২০০ টাকা উত্তোলন করেন। সাতটি চেকের প্রতিটিতে টাকার পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ৬০০ টাকা।

কিন্তু জাহিদ হাসান ও আলমগীর হোসেন দুজনই কালের কণ্ঠকে বলেছেন, তাঁরা চেকের মাধ্যমে এই টাকা উত্তোলন করেননি। বিষয়টি তাঁরা জানেনই না।

তহবিল লুটের প্রক্রিয়া : ২০১২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পৌর এলাকার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লোহাগাছ গ্রামের ফ্রেন্ডস ক্লাবের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য অনুদান চেয়ে আবেদন করেন ক্লাবের সভাপতি মো. নূরুল ইসলাম। আবেদনপত্রে মেয়র ২০ হাজার টাকা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়ে স্বাক্ষর করেন। এরপর সচিব ও হিসাবরক্ষক ওই আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করে ২০ হাজার টাকার চেক দেন। এক দিন পর একই এলাকার ওই ক্লাবের জন্যই অনুদান চেয়ে আবেদন করা হয়। এ আবেদনপত্রে সভাপতি হিসেবে স্বাক্ষর রয়েছে আবদুল খালেক নামের একজনের। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে ওই ক্লাবের সভাপতিও বদলে যান। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই কায়দায় ২০ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়। সরেজমিনে ওই এলাকায় গিয়ে ফ্রেন্ডস ক্লাবের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরসভার কয়েকজন কর্মচারী জানান, নিজেরাই ওই রকম হাজারো আবেদনপত্র তৈরি করেই মেয়রের ঘনিষ্ঠজনরা ব্যাংক থেকে টাকা সরিয়েছে। ওই সব আবেদনপত্রে আবেদনকারীর নাম থাকলেও বেশির ভাগেরই বাবার নাম কিংবা গ্রামের নামও নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পৌরসভার একজন কাউন্সিলর কালের কণ্ঠকে বলেন, মাসিক সাধারণ সভায় তোলার পর অনুমোদন ছাড়া বরাদ্দ দেওয়ার কোনো বিধান নেই।

পৌরসভার সাবেক এক কর্মকর্তা তাঁর দায়িত্ব পালনকালে ২০১৬ সালের মার্চ মাসের দুর্নীতির একটি চিত্র তুলে ধরে জানান, শুক্রবার, শনিবারসহ সরকারি ছুটির কারণে ওই বছরের মার্চ মাসে অফিস বন্ধ ছিল ১২ দিন। বাকি ১৮ দিনে পৌরসভায় চায়ের বিল দেখানো হয়েছে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। সাবেক ওই কর্মকর্তা আরো জানান, ওই মাসে (মার্চ, ২০১৬) কাল্পনিক দরিদ্র নাগরিককে অর্থদান, অস্তিত্বহীন সংগঠনকে অনুদানের নামেই সাড়ে আট লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

পৌরসভায় তিনজনের সিন্ডিকেট, চলছে লুটপাট : মেয়রের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত নূরে আলম মোল্লা, ফারুক ও সবুজ। তাঁদের মধ্যে সবুজ মাস্টাররোলের কর্মচারী। অভিযোগ রয়েছে, এ তিনজনের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে নানা কায়দায় লুটপাট চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাস্টাররোলের এক কর্মচারী জানান, মাটি ফেলা, সংস্কারসহ নানা সড়ক উন্নয়ন কাজের ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে কাজ না করেই টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এ ছাড়া ময়লা ও জঙ্গল পরিষ্কারের নামে প্রতিনিয়তই তোলা হয় লাখ লাখ টাকার বিল।

পৌরসভা সূত্র জানিয়েছে, ওই সব কাজের জন্য পৌরসভার নির্দিষ্ট বিভাগের জনবল রয়েছে। আবর্জনা অপসারণের জন্য চালকসহ রয়েছে ছোট-বড় পাঁচটি গাড়ি।

জানা গেছে, প্রথম শ্রেণির পৌরসভা শ্রীপুর পৌরসভার বছরে রাজস্ব আয় ১৩ থেকে ১৫ কোটি টাকা। কিন্তু পৌরসভার নিজস্ব কোনো ভবন নেই। ভাড়ায় নেওয়া ভবনে চলছে কার্যক্রম।

শ্রীপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গ্যাস-পানি কিছুই নেই। পৌর এলাকার অনেক সড়ক এখনো কাঁচা। আর যেটুকু পাকা, তারও বেহাল।’

তহবিল লুটসহ নানা সমস্যার কথা জানতে পৌরসভার সচিব বদরুজ্জামান বাদলকে ফোন করার পর অভিযোগ শুনেই তিনি সংযোগ কেটে দেন।

লুটপাট চলছে বলে স্বীকার করে প্যানেল মেয়র মো. আমজাদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পৌরসভার সচিবও লুটপাটে জড়িত। আমরা কামলার মতো আছি, প্রতিবাদ করেও লাভ হয় না।’



মন্তব্য