kalerkantho


রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ

মিয়ানমারের বিচারে ইপিতে প্রস্তাব উঠছে

মেহেদী হাসান   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মিয়ানমারের বিচারে ইপিতে প্রস্তাব উঠছে

ফাইল ছবি

রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচারের দাবিতে সরব হচ্ছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট (ইপি)। ফ্রান্সের স্ট্রসবুর্গে আজ বৃহস্পতিবার ইপির প্লেনারি অধিবেশনে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শেষে একটি প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার কথা রয়েছে। সেই প্রস্তাবে বৈশ্বিকভাবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ ও বিচারিক কাঠামো সৃষ্টি এবং সেই প্রক্রিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও এর সদস্য দেশগুলোকে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান থাকছে।

জানা গেছে, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের বিচ্যুতিতে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কারণে ইউরোপের পার্লামেন্টে মিয়ানমার ইস্যুতে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আলোচনা শেষে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সাতটি পার্লামেন্টারি দল এরই মধ্যে খসড়া প্রস্তাব জমা দিয়েছে। সেগুলো সমন্বয় করে একটি প্রস্তাব গৃহীত হবে। তবে খসড়া সব প্রস্তাবেই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিচারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টে মিয়ানমার বিষয়ে প্রস্তাব গ্রহণের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গৃহীত প্রস্তাব ইইউ ও এর সদস্য ২৮টি দেশের জন্য পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করে। পার্লামেন্ট প্রস্তাব গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের জন্য ইউরোপীয় কমিশন ও ইইউ সদস্য দেশগুলোর সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানায়। এ ছাড়া ইউরোপীয় পার্লামেন্ট তাদের প্রস্তাবে জাতিসংঘ বা অন্যান্য ফোরামের প্রতিও আহ্বান জানাতে পারে।

জানা গেছে, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আজ মিয়ানমার নিয়ে যে প্রস্তাব উঠছে তাতে জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদন এবং সুপারিশগুলোকে আমলে নিয়ে সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে ইইউ ও এর সদস্য দেশগুলোকে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা গণহত্যার তদন্তকারী বার্তা সংস্থা রয়টার্সের দুই সাংবাদিকের সাজার নিন্দা জানিয়ে তাঁদের মুক্তি দেওয়ার আহ্বান রয়েছে।

ভার্টস/অ্যালি গ্রুপের খসড়া প্রস্তাবে রোহিঙ্গা নিপীড়নের প্রতিক্রিয়া না জানানোয় মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট ও স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির নিন্দা জানানো হয়েছে। এ ছাড়া মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘনের দায়ে সু চিকে ১৯৯০ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দেওয়া শাখারভ পুরস্কার বাতিলের বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ভার্টস/অ্যালি পার্লামেন্টারি গ্রুপ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে মিয়ানমারের বিরূদ্ধে সব ধরনের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাসহ অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) বা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

এ ছাড়া রাখাইন রাজ্যে আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক স্বাধীন নিরপেক্ষ কাঠামো (ইন্টারন্যাশনাল ইনডিপেনডেন্ট ইমপারশিয়াল মেকানিজম, সংক্ষেপে আইআইআইএম) গঠন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ ও সাধারণ পরিষদে উদ্যোগ নেওয়ার এবং ইইউ ও এর সদস্য দেশগুলোকে তাতে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান রয়েছে খসড়া প্রস্তাবে।

একাধিক পার্লামেন্ট গ্রুপ ইউরোপের বাজারে ‘এভরিথিং বাট আর্মস’-এর আওতায় মিয়ানমার যে বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে আসছে, তা স্থগিত করতে ইউরোপীয় কমিশনকে তদন্ত কাঠামো সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা ও মুসলমানবিরোধী ঘৃণ্য অপপ্রচার ঠেকানোর জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে খসড়া প্রস্তাবে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ান এবং সদস্য দেশগুলোর সরকারগুলোকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যসহ দেশজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঠেকানোর উদ্যোগ নিতে দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে খসড়া প্রস্তাবে আহ্বান জানানো হয়েছে।

এএলডিই গ্রুপের খসড়া প্রস্তাবে রাখাইন রাজ্যে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, মানবাধিকার ও মানবিক সংস্থাগুলোর অবাধ প্রবেশাধিকার দিতে মিয়ানমার সরকারকে আহ্বান জানানো হয়েছে। ইসিআর গ্রুপ তাদের খসড়া প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের বর্বরতার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে ইইউর সব সদস্য রাষ্ট্র ও অন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এসঅ্যান্ডডি গ্রুপ তাদের খসড়া প্রস্তাবে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ মেয়াদে চাহিদা পূরণে ইইউ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে বলেছে। ইএফডিডি গ্রুপ তাদের খসড়া প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের ওপর মানবাধিকারবিরোধী অপরাধ তদন্তে আইসিসির কৌঁসুলির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। জিইউই/এনজিএল গ্রুপের খসড়া প্রস্তাবে মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানসহ আনান কমিশনের সুপারিশগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়নের আহ্বান স্থান পেয়েছে। পিপিই গ্রুপ জাতিসংঘের নজরদারিসহ রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে জোর দিয়েছে।

টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার আহ্বান পিইউআইসির : এদিকে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (পিইউআইসি) রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে ওআইসি সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সরেজমিন দেখতে পিইউআইসির ১৯ সদস্যের প্রতিনিধিদল তিন দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে গতকাল ওই আহ্বান জানায়। তাদের এ সফরে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে ওআইসি সদস্য দেশগুলোর সমর্থন চেয়েছে।



মন্তব্য