kalerkantho


আজ সংসদে উঠছে প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইন

দুর্ঘটনার সর্বোচ্চ শাস্তি বাড়ানোর জোর তাগিদ আইনজ্ঞদের

পার্থ সারথি দাস   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



দুর্ঘটনার সর্বোচ্চ শাস্তি বাড়ানোর জোর তাগিদ আইনজ্ঞদের

রাজধানীতে দুই কলেজ শিক্ষার্থীকে একটি বাস চাপা দিয়ে হত্যার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া গত ৬ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে তোলা হয়। ওই বৈঠকে খসড়াটি অনুমোদন দেওয়ার পর আইন পাসের জন্য আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উঠছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্রে গতকাল বুধবার বিকেলে এ তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের পর খসড়া আইনটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য চলে যাবে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে। তখন সংসদীয় কমিটির সভাপতি বিশেষজ্ঞদের ডাকবেন, পরামর্শ নেবেন।

এদিকে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালনায় কারো প্রাণহানি ঘটলে চালকের সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছর কারাদণ্ড রাখার জোর তাগিদ দিয়েছেন। প্রস্তাবিত আইনে এ অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর রাখা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর প্রাণহানি ঘটে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বহু আগে থেকে বলে আসছিলেন, এই নতুন আইন সংসদে পাস হলে সড়ক পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা কমানো যাবে।

জানা গেছে, মোটরযান অধ্যাদেশের মাধ্যমে সড়ক পরিবহন খাতটি পরিচালিত হয়। মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ নামের এই অধ্যাদেশ করা হয়েছিল ৭৮ বছর আগে তৈরি ভারতীয় আইনের অনুসরণে। পুরনো এ আইনে বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি ও জরিমানা কম। অধ্যাদেশটি যুগোপযোগী করার জন্য সাত বছর আগে নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয়। দফায় দফায় পরীক্ষা করার পর গত বছরের ২৭ মার্চ মন্ত্রিসভায় নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়। নাম দেওয়া হয় সড়ক পরিবহন আইন।

সড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ও মৃত্যু ঘটালে অপরাধীর শাস্তি তিন বছর রাখার প্রস্তাব ছিল খসড়ায়। মন্ত্রিসভায় খসড়া অনুমোদনের সময় সেটা সংশোধন করে পাঁচ বছর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

গত ৪ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে মন্ত্রণালয়ে জরুরি সভায় বসেন। সভায় তিনি বলেছিলেন, বর্তমান সংসদ অধিবেশনেই সড়ক পরিবহন আইন অনুমোদন করা হবে। এ আইনের বিভিন্ন বিষয় সংযোজন ও বিয়োজনে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার সুযোগ আছে।

কোনো ব্যক্তি রাস্তায় বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে কারো মৃত্যু ঘটালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শাস্তি হয় দণ্ডবিধির ৩০৪(খ) ধারা অনুযায়ী। ওই ধারায় বলা আছে, যদি কোনো ব্যক্তি রাস্তায় বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায়, তবে তার তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা দুই-ই হবে। একসময় এ সাজার মেয়াদ ছিল সাত বছর। পরে তা সংশোধন করে তিন বছর করা হয়। ২০১৪ সালে হাইকোর্টের এক রায়ে ওই সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে সাজা তিন বছর থেকে বাড়িয়ে সাত বছর করা হয়।

সড়ক খাতের বিশেষজ্ঞরা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোয় কারো প্রাণহানি হলে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছর রাখা এবং তা জামিন অযোগ্য রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন।

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নামের সংগঠনের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ধরনের অপরাধীরা জামিন পেয়ে পালিয়ে যায়। এটা জামিন অযোগ্য থাকা সমীচীন।’

হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি ও বিশিষ্ট আইনজীবী মনজিল মোরসেদ সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেপরোয়া গাড়ি চালনা করে সড়কে কোনো মানুষকে হত্যার শাস্তি পাঁচ বছর রাখার প্রস্তাব প্রত্যাশিত নয়। আদালত এ জন্য একটি রায়ে সাত বছরের সাজা দিয়েছেন। এটা বহাল আছে। কাজেই এ অপরাধের শাস্তি সাত বছরের কম হওয়া সমীচীন নয়। আদালত আরেকটি মামলার রায়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, নতুন কোনো আইনে যেন বেশি শাস্তির বিধান রাখা হয়।’ ব্যারিস্টার সারা হোসেনের মতে, ‘বেপরোয়া গাড়ি চালানোয় মানুষের মৃত্যুর শাস্তি ১০ বছর হতে পারে।’

আইনজ্ঞরা বলছেন, দণ্ডবিধিতে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালককে যে শাস্তির বিধান দেওয়া আছে, সেটি সময় উপযোগী নয়। ১৫০ বছর আগের বিধান এটি। দণ্ডবিধির ৩০৪(খ) ধারায় চালকের অবহেলায় দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে তাকে তিন বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। হাইকোর্টের আদেশের বলে সাত বছর পর্যন্ত এ সাজা দিতে পারেন আদালত। আবার চালক ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে হত্যা করলে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান প্রযোজ্য।

আইনজ্ঞরা বলছেন, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির মামলায় ৩০৪(খ) ধারার প্রয়োগ বেশি হচ্ছে। ৩০২ ধারায় মামলা হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা প্রমাণ করা সম্ভব হয় না। বিচারে দোষ সঠিকভাবে প্রমাণিত না করতে পারায় খালাস পায় বা অনুল্লেখযোগ্য শাস্তি হয় অপরাধীর।



মন্তব্য