kalerkantho

‘ভয়ংকর দরদি’

ওমর ফারুক   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



‘ভয়ংকর দরদি’

এই ব্যাংক কর্মকর্তা লুৎফর রহমান দরদি সেজে পাশে দাঁড়িয়ে এখন অদম্য মেধাবী রেজিয়া ও তাঁর স্বামী ডা. নিয়াজের জীবনের হুমকি হয়ে উঠেছেন

প্রায় রাতেই কুপিতে তেল থাকত না রেজিয়াদের। মা-বাবা তাকে পড়া বাদ দিয়ে সন্ধ্যায়ই ঘুমিয়ে পড়তে বলেন। অগত্যা রেজিয়া বেলা ডোবার আগেই সব পড়া শেষ করে ফেলে এবং রাতে ভাঙা ঘরে শুয়ে অন্ধকারে সেই মুখস্থ পড়াগুলো বিড়বিড় করে আওড়ায়। এ অবস্থা দেখে নিরক্ষর ও কুসংস্কারে বিশ্বাসী মা-বাবা ভাবেন, মেয়েকে ‘জিনে’ ধরেছে। ২০০৮ সালের কথা এটি। বিরূপ ওই পরিবেশের মধ্যেই রেজিয়া আক্তার বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন জিপিএ ৫ সহ এসএসসি পাস করলে হৈচৈ পড়ে যায়। রেজিয়া সাংবাদিকদের জানায়, তার ইচ্ছা ডাক্তার হওয়ার।

টাঙ্গাইলের কালিহাতীর হিন্নাই গ্রামের অদম্য মেধাবী মেয়েটি পরে এম ফার্মা পাস করেও নিরাপত্তার অভাবে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। পারিবারিকভাবে তাঁর বিয়ে হয়েছে একজন চিকিৎসকের সঙ্গে। তবে প্রায় চার বছর ধরে এই দম্পতির জীবন বিষিয়ে তুলেছেন এক ব্যক্তি, যিনি একদিন রেজিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সহায়তার হাত নিয়ে। রেজিয়ার একটাই ‘অপরাধ’, তিনি লুৎফর রহমানের বিয়ের প্রস্তাবে সায় দেননি।

জানা যায়, দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে রেজিয়ার অসামান্য সাফল্য ও করুণ দরিদ্রতার খবর ছাপা হলে পাশে দাঁড়ান কালিহাতীর বিন্নাউরি গ্রামের লুৎফর রহমান। রেজিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, একপর্যায়ে তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন লুৎফর। পরিবার অসম্মতি জানায় এবং রেজিয়াকে ২০১৪ সালের নভেম্বরে বিয়ে দেয় কুমিল্লার বাসিন্দা ডা. নিয়াজ মোর্শেদুল হকের সঙ্গে। তখন ডা. নিয়াজ হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থানার করিমপুরে ‘সূর্যের হাসি ক্লিনিকে’ কর্মরত।

রেজিয়ার অভিযোগ, তাঁর বিয়ের পরের মাস থেকেই ডা. নিয়াজের মোবাইল ফোনে কল করে লুৎফর হুমকি-ধমকি ও গালাগাল করতে থাকেন। ফলে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর ডা. নিয়াজ হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থানায় একটি জিডি করেন।

জানা যায়, পরের বছর ১৩ এপ্রিল মৌলভীবাজারের শেরপুর এলাকায় লুৎফরের নেতৃত্বে কয়েকজন দুর্বৃত্ত ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় ডা. নিয়াজের ওপর। সেদিন ডা. নিয়াজের ভুঁড়ি পর্যন্ত বেরিয়ে যায়। এ ঘটনায় লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে রেজিয়া মৌলভীবাজার মডেল থানায় মামলা করেন। জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে লুৎফরের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত একাধিক জিডি করেছেন রেজিয়া এবং তাঁর স্বামী ও ভাই। গত বছর ২ আগস্ট মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপারের কাছেও নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেন রেজিয়া। তাতে তিনি লেখেন, ‘লুৎফর পূর্বশত্রুতার জের ধরে আমার স্বামীকে ১৩-৪-১৫ তারিখে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করে। আমি মৌলভীবাজার মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা করি। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন। মামলার পর থেকেই আসামি ও তার পক্ষের লোকজন মামলা উঠিয়ে নিতে ও সাক্ষ্য না দিতে আমাকে ও আমার সাক্ষীদের মোবাইল ফোনে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে।’

মৌলভীবাজার মডেল থানায় লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে রেজিয়া আক্তার মামলা দায়ের করেছিলেন ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল। ওই সময় মামলাটি তদন্ত করেছিলেন মৌলভীবাজার মডেল থানার সাব-ইন্সপেক্টর আবদুস সালাম। তিনি বর্তমানে ময়মনসিংহের ভালুকা থানার ভরাডোবা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে কথা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যতটুকু মনে পড়ে লুৎফর রহমান আদালতে আত্মসমর্পণের পর তাঁকে জেলে পাঠানো হয়েছিল। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।’

রেজিয়ার স্বামী কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় করারও অপচেষ্টা হয়েছে। উত্তরার গ্রিন লাইফ নামের একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রের প্যাডে তাঁকে ১২ বছরের মাদকসেবী ও মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা হয়। এরপর ডেমরা থানার একটি পুরনো মাদক মামলার আসামি হিসেবে দেখিয়ে ইয়াবা ব্যবসায়ী আখ্যা দিয়ে অখ্যাত পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এ সবের পেছনে লুৎফর রহমানের হাত রয়েছে বলে নিয়াজ মোর্শেদ মনে করছেন।

ডেমরা থানার পুলিশ পরিদর্শক স্নেহাশীষ রায় গত ২৬ জুন এক প্রতিবেদনে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান, ‘নিয়াজ মোর্শেদুল হকের নাম রয়েছে ডেমরা থানার ২০১৫ সালের একটি মাদক মামলায়।  তবে অনুসন্ধান করে জানা যায়, নিয়াজ ডেমরা থানা এলাকায় কখনো বসবাস করেন নাই।  তিনি ২০১৫ সালের ৬ জুলাই থেকে এ বছরের ২৫ জুন পর্যন্ত মালদ্বীপের মালেতে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।’

টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে লুৎফর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, সোনালী ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন তিনি। লুৎফর বলেন, ‘আমার সঙ্গে রেজিয়ার পরিচয় আছে। দরিদ্র পরিবার বলে সাহায্য-সহযোগিতা করেছি। টাকা পয়সা দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ায় আমার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। আমার বিরুদ্ধে রেজিয়া একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে। সে বলেছে আমি নাকি তার স্বামীকে হত্যার চেষ্টা করেছি। মামলাটির সাক্ষ্য পর্যায়ে রয়েছে।’

রেজিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, হয়রানির কারণে বিয়ের মাস চারেক পর ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে টাঙ্গাইলের হিন্নাপাড়ার কাউন্সিলর আবুল কাশেমের বাড়িতে সালিস বসে। আপস মীমাংসার পরও লুৎফর রহমান হুমকি অব্যাহত রাখে ও হামলা চালায়। ফলে রেজিয়া ও তাঁর স্বামী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ডাক্তার নিয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি মালদ্বীপে চাকরিরত। এখন ছুটিতে দেশে থাকলেও চলাফেরা করতে ভয় লাগে।’ তিনি বলেন, ‘সেবার ধারালো অস্ত্রের আঘাতটা আর একটু ওপরে হলে আমি বাঁচতাম না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রেজিয়া আমার স্ত্রী। আমি তার পাশে আছি, থাকব।’



মন্তব্য