kalerkantho


বিশেষায়িত হাসপাতালে খালেদার চিকিৎসা দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বিশেষায়িত হাসপাতালে খালেদার চিকিৎসা দাবি

গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সচিবালয়ে বিএনপি নেতারা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য নতুন করে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। সেই বোর্ড সদস্যদের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল রবিবার বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল সচিবালয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের এ কথা জানান। বিকেলের দিকে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপি স্থায়ী কমিটির সাত সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দপ্তরে দেখা করে খালেদা জিয়াকে বিশেষায়িত একটি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান।

এদিকে বিশেষায়িত হাসপাতালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার নির্দেশনা চেয়ে গতকাল হাইকোর্টে একটি রিট আবেদনও দাখিল করা হয়েছে। তাঁর আইনজীবীরা এ রিট করেন। আজ সোমবার এ আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে। এদিকে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করে কারাভ্যন্তরে খালেদা জিয়ার বিচার না করতে তাঁর হস্তক্ষেপ চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। আইনজীবী সমিতির নেতারা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে যাওয়ার পরই আইনমন্ত্রী তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। এদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং কারাগারের ভেতরে আদালত বসানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল ঢাকাসহ সারা দেশে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিএনপি নেতাদের সাক্ষাৎ

সচিবালয়ে বিএনপি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইজি প্রিজনস ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিনকে ডেকে পাঠান। তাঁর কাছ থেকে খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বর্তমান অবস্থা জানেন দুই পক্ষই। বিকেল ৩টার দিকে বিএনপি নেতারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কক্ষে ঢুকে পৌনে ৪টার দিকে বের হন। সেখানে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা তাঁকে (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) অনুরোধ করেছি যেন খালেদা জিয়াকে বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়, যা তিনি পছন্দ করেন। আমরা ইউনাইটেড হাসপাতালের কথা বলেছি।’ তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে আজই (রবিবার) সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলবেন বলে তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন।

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি স্থায়ী কমিটির সাতজন সদস্য এসেছিলেন। তাঁরা একটি লিখিত অবেদন জমা দিয়ে গেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, তাঁদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অসুস্থতার মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। তাঁকে চিকিৎসার জন্য অন্য কোনো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেছেন। তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রসচিব ও আইজি প্রিজনসকে দায়িত্ব দিয়েছি, তাঁরা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নিয়ে একটি বোর্ড গঠন করে তাঁর স্বাস্থ্যের বিষয়টি দেখবেন। আগেও এমন বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তাঁকে যাঁরা চিকিৎসা করেন এবং সরকারি ডাক্তারদের সুপারিশ অনুযায়ী আমরা সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেব।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা জানেন তিনি (খালেদা জিয়া) আর্থ্রাইটিস রোগে ভুগছেন। তাঁকে সেবা করার জন্য একজন মহিলাকে দেওয়া হয়েছে। প্রতিনিয়ত তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। কারা বিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ সুযোগ তাঁকে দেওয়া হয়েছে। তার পরও বিএনপি নেতারা খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবনতির কথা জানিয়ে তাঁকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলছেন। এবার তাঁরা অ্যাপোলো হাসপাতালের কথাও বলেছেন। মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব।’

এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, ‘জেলকোড অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হবে। ডাক্তার যদি মনে করেন, বিশেষ প্রয়োজনে সরকারি হাসপাতালের বাইরেও নেওয়া যায়।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় আমাদের কোনো ত্রুটি নেই। তাঁর বিভিন্ন ধরনের টেস্ট হচ্ছে। তার পরও বিএনপি নেতারা তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ার যে কথা বলছেন, তা যদি হয়ে থাকে তবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ছিলেন। সে সময় তাঁকে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়েছিল। সেটি কারাবিধির ব্যত্যয় হয়েছিল কি না? জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ওই সময় আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী অনেককে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেতাদের সঙ্গে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কথা হয়নি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা বিএনপির প্রতিনিধিদলে মির্জা ফখরুলের সঙ্গে ছিলেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান ও ড. আব্দুল মঈন খান। বৈঠক শুরুর কিছু সময় পরই আইজি প্রিজন্স ভেতরে ঢোকেন।

খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা চেয়ে রিট

বিশেষায়িত কোনো হাসপাতালে, বিশেষ করে ইউনাইটেড হাসপাতালে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার ব্যবস্থার জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিতে গতকাল তাঁর পক্ষে রিট আবেদন করেছেন আইনজীবীরা। আবেদনে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ। বহুদিন ধরেই তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর কথা বলে আসছেন। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ যথাযথ চিকিৎসা করাচ্ছে না। এ কারণে দিন দিন তিনি আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এ অবস্থায় কারা কর্তৃপক্ষ যাতে খালেদা জিয়ার পছন্দমতো বিশেষায়িত হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা করার ব্যবস্থা করে, সে জন্য নির্দেশ প্রয়োজন।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় নাজিমুদ্দীন রোডের পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের ৭ নম্বর কক্ষকে আদালত হিসেবে ঘোষণা করে গত ৪ সেপ্টেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার চেয়ে সরকারকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর পর এ রিট আবেদন করা হলো। বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি সোহেল আহমেদের বেঞ্চে আজ সোমবার এই রিট আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে।

প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ কামনা

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচারের জন্য কারাগারের ভেতর একটি কক্ষে বিশেষ আদালত বসানোর প্রেক্ষাপটে গতকাল দুপুরে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতারা। সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন ও সম্পাদক ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের নেতৃত্বে একদল আইনজীবী দুপুরের দিকে প্রধান বিচারপতির খাসকামরায় প্রবেশ করেন। দলটিতে আরো ছিলেন সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন ও এ জে মোহাম্মদ আলী, মীর নাসিরউদ্দিন, নিতাই রায় চৌধুরী, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, আমিনুল ইসলাম, সমিতির বর্তমান সহসভাপতি গোলাম মোস্তফা, ড. গোলাম রহমান ভূঁইয়া প্রমুখ। তাঁরা সমিতির পক্ষ থেকে একটি লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এতে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ না করেই কারাগারের ভেতর আদালত স্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। বলা হয়, আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে বিচার বিভাগ পৃথককরণসংক্রান্ত মাসদার হোসেন মামলার রায় উপেক্ষা করা হয়েছে। বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগ নগ্নভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। তাই কারাগারের ভেতর থেকে আদালত সরাতে বিচার বিভাগের অভিভাবক হিসেবে প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ কাম্য। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য পদক্ষেপ নিতেও প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ চান এই আইনজীবীরা।

পরে জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বিচারপতি ধৈর্য সহকারে তাঁদের বক্তব্য শুনেছেন। তিনি বলেছেন, বিষয়টি দেখবেন। এ অবস্থায় আমরা আশা করি প্রধান বিচারপতি বিষয়টি বিবেচনা করবেন। জয়নুল আবেদীন বলেন, নিয়মানুযায়ী এ রকম আদালত স্থানান্তর করতে হলে বা কোনো পদক্ষেপ নিতে হলে কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা আগে বিষয়টি আইনজীবীদের অবহিত করতে সংশ্লিষ্ট আদালতকে একটি জুডিশিয়াল আদেশ দিতে হয়। কিন্তু খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে তা করেননি আদালত। 

প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আইনমন্ত্রীর সাক্ষাৎ

বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির খাসকামরায় দুপুর সোয়া ২টা থেকে বিকেল সোয়া ৩টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা ছিলেন আইনমন্ত্রী। পরে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ঈদের পর এটা ছিল সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকার। ‘কারাগারের ভেতর আদালত স্থাপন নিয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির কাছে নালিশ করেছেন’—এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আপনার কোনো আলোচনা হয়েছে কি না প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তাই কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’ 

আইন মন্ত্রণালয় বেআইনিভাবে কারাগারের ভেতর আদালত স্থাপন করে গেজেট জারি করেছে বলে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা যে কথা বলেছেন, সেই প্রসঙ্গে প্রশ্নের উত্তরে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এটা যদি বলে থাকে তবে বলব, উনারা আইন জানেন না।

মানববন্ধন

খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং কারাগারের ভেতরে আদালত বসানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ব্যানারে এই কর্মসূচিতে অংশ নেন খন্দকার মাহবুব হোসেন, জয়নুল আবেদীন, মীর নাজির উদ্দিন, নিতাই রায় চৌধুরী, মাহবুব উদ্দিন খোকন, সানাউল্লাহ মিয়া, বদরুদ্দোজা বাদল, মহসীন মিয়া, খোরশেদ মিয়া আলম, কামরুল ইসলাম সজল, শরীফ ইউ আহমেদ প্রমুখ।



মন্তব্য