kalerkantho


পাচার হওয়া অর্থ ফিরবে, ৩৩ দেশের সঙ্গে চুক্তি

♦ চুক্তির সুযোগে কয়েকটি দেশে টাস্কফোর্স পাঠাতে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের
♦ আরো ১৭ দেশের সঙ্গে আলোচনা

ফারজানা লাবনী   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



পাচার হওয়া অর্থ ফিরবে, ৩৩ দেশের সঙ্গে চুক্তি

বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারকারীদের শনাক্ত করে তাদের পাচার করা বিপুল পরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে আনতে এবার আটঘাট বেঁধে নেমেছে সরকার। পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা ছাড়াও সেই অর্থ থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে আইনি সুবিধা নিতে গত দেড় বছরে ৩৩টি দেশের সঙ্গে চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের মধ্যে আরো ১৭টি দেশের সঙ্গে চুক্তি করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। সম্প্রতি অর্থপাচার সম্পর্কিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

অর্থপাচারকারীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার লক্ষ্যে চুক্তির আওতায় টাস্কফোর্স গঠন করে কানাডা, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মিয়ানমার, পাকিস্তান ও সিঙ্গাপুরে পাঠাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এনবিআরকে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো এসংক্রান্ত চিঠিতে টাস্কফোর্সে এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং অর্থপাচার রোধ নিয়ে দায়িত্বরত বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা রয়েছে।

চুক্তির আওতায় আইনি সুবিধা নিয়ে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর আড়াই লাখ ডলার জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। আরেক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করে মামলা করা হয়েছে দেশের আদালতে। আয়কর রিটার্নে ওই সম্পদের তথ্য গোপন করা, কর ফাঁকি দেওয়া এবং অর্থপাচারের অভিযোগে মামলাটি করা হয়েছে চট্টগ্রামের একটি আদালতে।

এনবিআরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে করা ওই সব চুক্তিতে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করে অর্থপাচার সম্পর্কিত তদন্তের জন্য ওই সব দেশে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী টাস্কফোর্সের সদস্যরা বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সহযোগিতায় অর্থপাচার সম্পর্কিত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারবেন। অর্থপাচারকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দেশে আইনি ফার্ম নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ আছে চুক্তিতে। পাচার করা অর্থে বিদেশে কেনা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংকে গচ্ছিত পাচারের অর্থ এবং এ ধরনের অর্থে পরিচালিত ব্যবসার লাইসেন্স জব্দ করতে আইনি কার্যক্রম পরিচালনারও সুযোগ আছে। অর্থপাচার সম্পর্কিত তদন্ত পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়ারও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে ওই সব চুক্তির ফলে। বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি ল ফার্মের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। ফার্মগুলো হলো কাপলান, কেনেগক্স ও কেডিন।

এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ৩৩টি দেশের সঙ্গে চুক্তিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে সই করেছেন এনবিআর চেয়ারম্যান। দেশগুলো হলো কানাডা, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন, ডেনমার্ক, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, জাপান, বেলজিয়াম, ইন্দোনেশিয়া, মরিশাস, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, মিয়ানমার, পাকিস্তান, নরওয়ে, পোল্যান্ড, ফিলিপাইন, রোমানিয়া, সুইডেন, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বেলারুশ, ভিয়েতনাম ও বাহরাইন। চলতি বছরের মধ্যে আরো ১৭টি দেশের সঙ্গে চুক্তি করা নিয়ে আলোচনা চলছে। এসবের মধ্যে একটি দেশের সঙ্গে চুক্তি সই হবে অচিরেই।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অর্থপাচার বন্ধ করতে বিদ্যমান আইনের সঙ্গে আরো উদ্যোগ যুক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমরা নতুনভাবে বোঝাপড়া করেছি, যা নতুন চুক্তি হিসেবে আমলে আনা হয়েছে। এতে অর্থপাচারকারীদের সহজে চিহ্নিত করা যাবে। পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশে সরাসরি আইনি সুবিধা নিতে পারবে। সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার আমাদের সহযোগিতা করবে। আরো অনেক দেশের সঙ্গে নতুন এ বোঝাপড়া হবে বলে আলোচনা চলছে।’ 

চুক্তি অনুযায়ী অর্থপাচার প্রতিরোধ সম্পর্কিত কার্যক্রম পরিচালনায় এনবিআর প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক এবং স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা নিতে পারবে। এনবিআরের পক্ষে এ বিষয়ে কাজ করবেন সংস্থার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা (সিআইসি), ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল এবং ট্যাকসেস অ্যান্ড লিগ্যাল এনফোর্সমেন্ট শাখার কর্মকর্তারা।

বাস্তবায়নে নজর দিতে পরামর্শ : ওই সব চুক্তির সুফল পাওয়ার লক্ষ্যে তা দ্রুত ও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করার প্রতি নজর দিতে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ দেশে অর্থপাচার রোধে মানি লন্ডারিং অ্যাক্টসহ বিভিন্ন আইন আছে। কিন্তু অর্থপাচার কি বন্ধ হচ্ছে? আইন বা চুক্তি করে কী হবে! মূল কথা হলো বাস্তবায়ন কে করবে? বাস্তবায়নে নজর দিতে হবে। কঠোর হতে হবে। এখানেই আমাদের দুর্বলতা রয়েছে। তাই আইনের সুফল আমরা ঘরে তুলতে পারি না।’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন চুক্তিতে সুফল আনতে বাস্তবায়নে নজর দিতে হবে। ভারত সরকার পানামা পেপারসে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে এ বিষয়ে এখনো দৃশ্যমান কিছু দেখছি না।’

ল ফার্মের দায়িত্ব : পাচার করা অর্থ দেশে ফেরত আনা, পাচার করা অর্থ থেকে রাজস্ব আদায়, পাচার করা অর্থে কেনা সম্পদ জব্দ করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে সরকার চুক্তি অনুযায়ী ৩৩টি দেশে একাধিক ল ফার্মের সহায়তা নিতে পারবে। ল ফার্ম নির্বাচন করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের পরামর্শ নেওয়া হবে। ওই সব ফার্ম সরকারের পক্ষে সংশ্লিষ্ট দেশে মামলা পরিচালনা, অর্থপাচারকারীদের আটক, পাচার করা অর্থ উদ্ধারসহ এ সম্পর্কিত কার্যক্রম চালাতে পারবে। 

সম্পদ জব্দ করা যাবে : চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ৩৩টি দেশে বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থে কেনা ফ্ল্যাট, জমি, খামার, দোকান বা এ জাতীয় সম্পদ জব্দ করতে কার্যক্রম পরিচালনা করার আইনি সুযোগ মিলবে। পাচার করা অর্থ চুক্তিবদ্ধ কোনো দেশের ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গচ্ছিত রাখা হলে তাও জব্দ করার জন্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যাবে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বিদেশে অর্থপাচারকারীর পরিচালিত ব্যবসা বন্ধ করার আইনি পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সহায়তা মিলবে।

টাস্কফোর্সের কাজ : টাস্কফোর্সের কর্মকর্তারা তদন্তকালে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার করে কারা কী পরিমাণ জমি, ফ্ল্যাট বা প্লট কিনেছেন তা চিহ্নিত করবেন। এরপর ওই সব সম্পদ কিনতে ব্যয় করা অর্থ কোন উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বা কোন খাত থেকে আয় করা হয়েছে তা খতিয়ে দেখবেন। বিদেশে ব্যবসা পরিচালনার অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে সঠিক হিসাবে রাজস্ব পরিশোধের আইনি প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখবেন তাঁরা। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার সহযোগিতা করবে।

অর্থপাচারের নানা তথ্য ও আইনের ধারাবাহিকতায় চুক্তি : দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা, সমীক্ষা বা তদন্তে বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন সময়ে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। এতে বলা হয়, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে পাচার করা অর্থের পরিমাণ পাঁচ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। এর আগের বছর এর পরিমাণ ছিল চার হাজার ৬২৭ কোটি টাকা এবং ২০১৪ সালে ছিল চার হাজার ২৫১ কোটি টাকা।

এসব তথ্যের কারণে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগ নিয়েছে। যে ৩৩টি দেশের সঙ্গে নতুন চুক্তি হয়েছে গত দেড় বছরে সেগুলোর সঙ্গে আগেই দ্বৈত কর চুক্তি করে এনবিআর। ওই চুক্তির আওতায় এনবিআর সংশ্লিষ্ট দেশের রাজস্ব বিভাগ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, তবে ওই দেশের অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পারে না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর নামে থাকা অর্থ সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফেরত আনে সরকার। কোনো বাংলাদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বেআইনিভাবে পাঠানো কোনো অর্থ বা সম্পদ বিদেশ থেকে ফেরত আনার বিষয়ে ২০১২ সালের আগে কোনো আইন ছিল না। ফলে ওই সব ক্ষেত্রে অর্থ ফেরত আনতে হলে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেল দায়িত্ব পালন করতেন। এভাবেই অ্যাটর্নি জেনারেল মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্সের আওতায় সিঙ্গাপুর থেকে কোকোর অর্থ ফেরত আনেন। সে সময় কোকোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতের রায় উপস্থাপন করে এবং বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার হওয়ার তথ্য সিঙ্গাপুর সরকারের কাছে প্রমাণ করেই অ্যাটর্নি জেনারেলকে তা ফেরত আনতে হয়। কিন্তু ২০১২ সালে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাক্ট হওয়ার পর বিদেশ থেকে টাকা ফেরত আনার কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই আইন হওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক বা দুদকের মতো প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগেই সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে কাজ করার সুযোগ ছিল না। ফলে এনবিআর ৩৩টি দেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে।

এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ভারতের যেসব ব্যক্তির নাম পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে এসেছে তাদের বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে ভারত সরকার। এরই মধ্যে অনেকের অর্থপাচারের তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। ওই সব ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত সরকার। অন্যদিকে ভারতের যেসব নাগরিক সুইস ব্যাংকে অর্থ গচ্ছিত রেখেছেন তার একটি তালিকাও সে দেশের সরকার জোগাড় করেছে।

এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা যেমন প্রয়োজন তেমনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতাও প্রয়োজন। কারণ ভারত সরকারের উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে মাসের পর মাস অবস্থান করে সরকারি-বেসরকারি উভয় উৎস থেকে তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করে পাচারকারীদের ধরছে। এ ক্ষেত্রে সুইস ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তার কাছ থেকেও তারা তথ্য জোগাড় করছে।



মন্তব্য