kalerkantho


দেশ রাঙানো জয়ে সেমির পথে বাংলাদেশ

সনৎ বাবলা   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



দেশ রাঙানো জয়ে সেমির পথে বাংলাদেশ

শেষ বেলায় তপু বর্মণের গোল। উচ্ছ্বাসে ভাসছে বাংলাদেশ। ছবি : মীর ফরিদ

কর্নার কিকের চেয়েও ভয়ংকর লম্বা থ্রো-ইন! বিশ্বনাথের ভয়ংকর এক থ্রো-ইনে মরা ম্যাচ জেগে উঠল। উল্লাসে ফেটে পড়ল স্টেডিয়াম। এই উল্লাসের সূত্রধর তপু বর্মণ। পাকিস্তানের দূরের পোস্টে বলটি ঠেলে দিয়ে এই ডিফেন্ডার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে আনন্দের বান ডেকেছেন। ফ্লাড লাইটের আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল প্রতিটি দর্শকের চোখ-মুখ। এই আনন্দ যেন অপার্থিব। আশাহত মনে হঠাৎ এক অবিশ্বাস্য প্রাপ্তির উল্লাস। তাদের চেহারায় খুশির ঢেউ। বিরষ বদনে স্টেডিয়াম ছেড়ে যাওয়ার সময় দর্শক-সমর্থকদের এমন এক গোল উপহার দিয়েছেন তপু বর্মণ। নন্দনতত্ত্বে হয়তো এই গোলের মান অত ওপরে থাকবে না, কিন্তু দর্শকচিত্তে বেঁচে থাকবে অনেক দিন। কারণ এই ডিফেন্ডারের গোলেই পাকিস্তানকে হারিয়ে বাংলাদেশ পৌঁছে গেছে সেমিফাইনালের দোরগোড়ায়। সুবাদে প্রথম ম্যাচে এক গোল তপু বর্মণই লাল-সবুজের গোলের বরপুত্র।

বি গ্রুপে বাংলাদেশ দুটো ম্যাচ জিতে ৬ পয়েন্ট নিয়ে আছে শীর্ষে। গ্রুপের শেষ দিনের দুটো ম্যাচ এখনো বাকি, তাই আরো দুটো দলেরও হতে পারে ৬ পয়েন্ট করে। সে জন্যই টানা দুই ম্যাচ জিতেও স্বাগতিকদের সেমিফাইনাল নিশ্চিত নয়। বলা ভালো, পাকিস্তানকে হারিয়ে সেমিফাইনালের পথে তারা দৃঢ পদক্ষেপ ফেলেছে। এর নায়ক তপু হলে বিশ্বনাথ অবশ্যই পার্শ্ব নায়ক। এই ডিফেন্ডারের লম্বা থ্রো-ইন বিশাল এক সম্বল। তার ব্যবহারটাও তিনি দারুণ শিখে ফেলেছেন। দ্বিতীয়ার্ধে প্রথমে সেরকম এক থ্রো-ইনের আগে এই তরুণ ডিফেন্ডার দুই হাত দিয়ে দর্শকদের জেগে ওঠার ইঙ্গিত দেন। হুল্লোড় তুলেছে দর্শকরা, তাতে এলোমেলো হয়ে যায় পাকিস্তান রক্ষণ। কর্নারের বিনিময়ে কোনো রকমে ঠেকিয়েছে সেই থ্রো-ইন। পরের থ্রো-ইনে হয়েছে আবিশ্বাস্য প্রাপ্তি। ৮৫ মিনিটে তার বিষ মেশানো থ্রো-ইনটা পাকিস্তান ডিফেন্ডারের মাথা ঘুরে দূরের পোস্ট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় দৌড়ে এসে তপু হেড করে বল জড়িয়ে দেন পাকিস্তানের জালে। এর কয়েক মিনিট আগেও গোল মিসের আক্ষেপে তিনি মাথায় দিয়ে বসে পড়েছিলেন। মামুনুলের নেওয়া ফ্রি কিকে এই ডিফেন্ডারের ফ্লিক পোস্ট ঘেঁষে চলে যায় বাইরে। আফসোস করলেও সেটা বড় কঠিন ছিল। এর মিনিট তিনেক বাদেই স্টেডিয়াম উন্মাতাল করা তাঁর ওই হেড! বল জালে আর তপু দর্শকদের উল্লাস মাথায় নিয়ে জার্সি খুলে মাঠময় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শেষ মুহূর্তের এমন গোল জয়ের ছবি এঁকে দিয়েছে স্বাগতিকদের মনে। বাকি ৫ মিনিট এবং ইনজুরি টাইমে সেই গোল ধরে রাখতে হবে। সেই সময় ফুরাতেই ‘গোলের বরপুত্র’ সতীর্থদের কাঁধে চেপে উৎসবে মেতেছেন, ‘আমার জীবনের স্মরণীয় এক গোল। এই ম্যাচটা আমাদের জন্য জীবন-মরণের সমান ছিল, জিতে এখন সেমিফাইনালের পথে আছি আমরা। ৯ বছর পর সেমিফাইনালে ওঠার স্বপ্ন সফল হবে। এটা অবিশ্বাস্য ম্যাচ...।’ টানা দুই ম্যাচে দুই গোল করে এই ডিফেন্ডার হয়ে গেছেন বাংলাদেশের এক নম্বর স্কোরার! দলের তিন গোলের দুটিই তাঁর!

তবে কাল খেলাটা অত ভালো হয়নি বাংলাদেশের। সবাই যেন স্নায়ুচাপের কাছে নিজেদের সঁপে দিয়েছিলেন, তাই গুলিয়ে গেছে নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটাও। পাকিস্তানের শারীরিক সক্ষমতা একটা ব্যাপার। তা ছাড়া শুরুর দিকে বাতাসে খেলতে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছে এক দফা। পরে পায়ে পায়ে খেলার চেষ্টা করেও তপু-জামালরা সে রকম সফল নয়। আসলে বাংলাদেশের সমস্যা ছিল মাঝমাঠে। ওখানে নেই সৃষ্টিশীল ফুটবলার, যে কি না খেলা তৈরি করতে পারেন। ইমন বাবু একাদশে থাকলে হয়তো আক্রমণে ধার থাকত, বৈচিত্র্য থাকত। মাশুক-মামুনুল-জামালরা ফরোয়ার্ড প্লের চেয়ে সতর্ক ফুটবল খেলেছেন বেশি। গোল করার চেয়ে বরং রক্ষণের দিকেই ঝোঁক ছিল বেশি। কোচের থিওরিই এটা, গোল খেলে বেশি চাপ। গোল শোধ করে ম্যাচ জেতা বড় কঠিন হয়ে যাবে এই দলের পক্ষে। তাই ভরসা কাউন্টার অ্যাটাকই। মজাটা হলো পাকিস্তানও খেলেছে একই কৌশলে। কাউন্টারে দৌড়ঝাঁপ করে একটি গোল বের করে স্বাগতিকদের শেষ করে দেওয়ার। একই কৌশলে খেলেছে দুই দল, কিন্ত পার্থক্যটা গড়ে দিয়েছে বিশ্বনাথের লম্বা থ্রো-ইন। থ্রো যে কখনো কখনো কর্নারের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে!

এমন এক অস্ত্রই যেন দরকার হয়ে পড়েছিল লাল-সবুজের। লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম। প্রায় ২০ হাজার দর্শক সমস্বরে চিৎকার করছে, অনুপ্রাণিত করছে দলকে। এ রকম এক আবহ যেন জয় ছাড়া মানায় না। শহীদুলের দু-দুটো দুর্দান্ত সেভের পর বিশ্বনাথ-তপুর দেশ রাঙানো গোল। এই গোলে পাকিস্তানের বিপক্ষে বঙ্গবন্ধুতে অজেয় থাকার রেকর্ড অক্ষুণ্ন থাকল বাংলাদেশের।

বাংলাদেশ দল : শহীদুল, ওয়ালি, তপু, টুটুল, জামাল, মামুনুল, সাদ, বিশ্বনাথ, বিপলু, সুফিল, মাশুক (সাখাওয়াত হোসেন)।



মন্তব্য