kalerkantho


হঠাৎ লেগুনা বন্ধে দুর্ভোগে যাত্রীরা

বাসচালকরা বুঝতে পারছে না স্টপেজ কোথায়

ওমর ফারুক   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



হঠাৎ লেগুনা বন্ধে দুর্ভোগে যাত্রীরা

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রহমত উল্লাহ মতিঝিলে মাছ বিক্রি করেন। বাসাবো এলাকায় তাঁর বাসা। বাসাবো থেকে মতিঝিল এবং মতিঝিল থেকে বাসাবো যাতায়াত করেন লেগুনায়। কিন্তু গতকাল দুপুরে দৈনিক বাংলার মোড়ে এসে পড়েন বিপদে। বাসাবোয় যাওয়ার জন্য সেখানে একটিও লেগুনা নেই। ফলে রিকশাচালকের কাছে জানতে চান, লেগুনার কী হলো! রিকশাচালকের সহজ জবাব, সকাল থেকে লেগুনা চলছে না। কেন চলছে না তা তিনি জানেন না।  

রহমত উল্লাহর কাছে জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই রম তো কোনো দিন অয় না। লেগুনা দিয়াই বাসাবো থাইকা আসা-যাওয়া করি। আইজ সকালে রিকশা দিয়া আইলাম। অহন বাসায় ফিরতে আইয়া দেহি লেগুনা নাই। রিকশা দিয়া গেলে তো অনেক ভাড়া লাগব!’

ক্ষোভ প্রকাশ করে রহমত উল্লাহ আরো বলেন, ‘আমগো তো গাড়ি নাই। রিকশা-সিএনজি দিয়া চলার ক্ষমতাও নাই। লেগুনা দিয়া কম ভাড়ায় যাতায়াত করতাম। সেইডা বন্ধ কইরা দিলে আমগো চইলবো কেমনে!’

ওই সময় রহমত উল্লাহর মতো আরো অন্তত ২০-৩০ জন লোককে লেগুনা খুঁজতে দেখা গেল দৈনিক বাংলার মোড়ে। হঠাৎ লেগুনা বন্ধে তাদের কণ্ঠেও প্রবল ক্ষোভ।

গতকাল বুধবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর মতিঝিল, গুলিস্তান, দৈনিক বাংলা, মগবাজার, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, গাবতলী, কল্যাণপুর, মিরপুর-১ নম্বর ঘুরে দেখা গেছে সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই আগে ঘোষণা না দিয়ে হঠাৎ লেগুনা বন্ধ করে দেওয়ায় যাত্রীসাধারণ সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছে। সবার কণ্ঠেই শোনা গেছে ক্ষোভের কথা।

গতকাল বিকেলে কল্যাণপুরে দেখা গেছে শত শত যাত্রী লেগুনার জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু লেগুনা নেই। দুপুর ১টার দিকে গুলিস্তানের কাপ্তানবাজার এলাকায় দেখা গেছে, সেখানে একটিও লেগুনা নেই। অন্য দিন সেখানে অন্তত অর্ধশত লেগুনা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত। সেখানেও দেখা গেছে, যাত্রীরা লেগুনার উদ্দেশে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, মগবাজার, বাড্ডা এলাকায় দেখা গেছে, অন্য দিনের তুলনায় বাসের সংখ্যাও কম। বাসচালক ও হেলপাররা জানায়, পুলিশের অভিযানের ভয়ে অনেকে পুরনো গাড়ি নামায়নি। বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে পুলিশকে গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা করতে দেখা গেছে। তবে ডিএমপি কমিশনার ঘোষণা দেওয়ার পরও গতকাল কয়েকটি এলাকায় হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালাতে দেখা গেছে।

গতকাল দুপুরে মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকায় রোভার স্কাউটদের যানবাহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। রোভার স্কাউটদের কয়েকজন কালের কণ্ঠকে জানায়, সড়কে ধীরে ধীরে শৃঙ্খলা ফিরে আসছে। মতিঝিলে বিশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে ফুটপাতের দোকানকে দায়ী করে তারা।

একজন রোভার স্কাউট এ প্রতিবেদককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি ফুটপাতের ছবি তুলে নিয়ে যান। দেখেন, মতিঝিলের মতো ব্যস্ত একটি জায়গার ফুটপাতে কিভাবে কাপড়চোপড়ের দোকান খুলে বসেছে। সাধারণ মানুষ ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে না পেরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নামছে। এভাবে ফুটপাত দখলে থাকলে কিভাবে সড়কে শৃঙ্খলা আসবে?’

রোভার স্কাউটদের সঙ্গে কথা বলার সময় দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে বেস্ট ট্রান্সপোর্ট কোং লি. নামের ১৫ নম্বর একটি বাস (ঢাকা মেট্রো ব-১১-৯৬৬৫) এসে দাঁড়ায় সোনালী ব্যাংকের পাশে। সেখানেই যাত্রীরা ওঠানামা শুরু করে। এ দৃশ্য দেখে দুজন রোভার স্কাউট দৌড়ে যায় বাসের কাছে। চালককে জানায়, নির্দিষ্ট স্টপেজে গিয়ে বাস থামাতে হবে। দেখিয়ে দেয় মতিঝিলে পাঠ্যপুস্তক ভবনের উল্টো পাশের রাস্তায় সেখানকার বাস স্টপেজ।

রোভার স্কাউটদের এই পদক্ষেপে হেলপার বাসের দরজা বন্ধ করলে চালক নির্দিষ্ট স্টপেজের দিকে বাস নিয়ে চলে যায়। এ সময় মধ্যবয়স্ক এক যাত্রী স্কাউটদের সঙ্গে তর্কে জড়ান। তাঁর ভাষ্য, মতিঝিলে সোনালী ব্যাংকের পাশ থেকে তিনি ফার্মগেটে যাওয়ার বাসে চড়েন। হঠাৎ এমন নিয়ম করলে তো হবে না! এ সময় রোভার স্কাউটরা তাঁকে বুঝিয়ে শান্ত করে। এক রোভার স্কাউট তাঁকে বলে, ‘আংকেল, রাগ করবেন না। এটা স্টপেজ না। একটু সামনে যান। সেখানে বাস দাঁড়াবে। একটু কষ্ট করুন।’

জানতে চাইলে রাজধানীর দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাত্র রোভার স্কাউট আবদুল আজীজ কালের কণ্ঠকে জানান, গতকাল তাঁরা ৩০ জন রোভার স্কাউট মতিঝিলে দায়িত্ব পালন করেছেন। আগামী এক মাস তাঁরা দায়িত্ব পালন করবেন। আজীজ আরো জানান, মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। বাসচালকরাও একটু একটু করে বুঝতে শুরু করেছে, আগে যেভাবে চলা গেছে এখন আর সেভাবে চলা সম্ভব নয়।

তবে বাসচালক ও হেলপারদের বক্তব্য অন্য রকম। ১৫ নম্বর বাসের এক চালক রাশেদ কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁরা যাত্রাবাড়ী থেকে মিরপুর-১০ পর্যন্ত বাস চালান। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা সোনালী ব্যাংকের পাশে রাস্তায় বাস থামানোর কারণে সেটিই স্টপেজ হিসেবে গণ্য হয়ে গেছে। নতুন করে স্টপেজ করায় যাত্রীদের পাশাপাশি তাঁদেরও সমস্যা হচ্ছে। তাঁরা ঠিকমতো বুঝতেই পারছেন না আসলে স্টপেজ কোনটা। ফলে আগে যেখানে যেখানে বাস থামাতেন, সেখানে সেখানেই থামানোর চেষ্টা করেন।



মন্তব্য