kalerkantho


অগ্রযাত্রার ১০ বছর

কমছে দারিদ্র্য, বাড়ছে প্রবৃদ্ধি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



কমছে দারিদ্র্য, বাড়ছে প্রবৃদ্ধি

তলাবিহীন ঝুড়ি কিংবা টেস্ট কেস থেকে বাংলাদেশ এখন দারিদ্র্য বিমোচনে বিশ্বে রোল মডেল। ৮৫ শতাংশ দারিদ্র্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা দেশটি দ্রুত এই হার কমানোর ক্ষেত্রে নজিরবিহীন সাফল্য অর্জন করেছে। ৭০ ডলার মাথাপিছু আয় নিয়ে যাত্রা করা বাংলাদেশ তিনটি শর্তই পূরণ করে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে ২০২৪ সালেই। মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৫২ ডলার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দারিদ্র্য হ্রাস, উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিসহ টেকসই উন্নয়নে বাংলাদেশের বড় সফলতা এসেছে গত ১০ বছরে। সরকারের ধারাবাহিকতার সঙ্গে উন্নয়ন নীতি-কৌশল বাস্তবায়নের ধারাবাহিতকায় এটি অর্জন সম্ভব হয়েছে। অবকাঠামো খাতে দৃশ্যমান উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকেও এগিয়ে গেছে অনেকটা। ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত বর্তমান সরকারের আমলে এসব ক্ষেত্রে যেসব উন্নয়ন হয়েছে, তার তথ্য সংগ্রহ করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। নির্বাচনের আগেই তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে ‘বাংলাদেশ মার্চেস অন’ শিরোনামে পুস্তিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ বিভাগ।

স্বাধীনতার ২৯ বছর পর ২০০০ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮.৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনে পাঁচজনই দরিদ্র। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সর্বশেষ যে জরিপ করেছে তাতে এই হার কমে দাঁড়িয়েছে ২৪.৩ শতাংশ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে দেশে দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশ প্রক্ষেপণ করেছে। অর্থাৎ বর্তমানে প্রতি ১০ জনে দুজন দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। আর চলতি অর্থবছর শেষে তা আরো কমে ১৯.৮ শতাংশে দাঁড়াবে বলে প্রাক্কলন করেছে জিইডি।

জিইডি বলেছে, এক দশক আগে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে ২০২১ সালের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা করে। যে কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে। সরকার ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছে। এতে প্রায় এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর যেখানে ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করে, সেখানে গত ১০ বছরে সরকারের উদ্যোগে এক লাখ ৮২ হাজার ৭৫৬ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আর ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সাত বছরে দেশে ৬৩ লাখ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে, বিদেশে গেছে ৫১ লাখ।

সরকার আশা করছে, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে দরিদ্র্যের সংখ্যা কমে দাঁড়াবে ১০ জনে একজন। উন্নত দেশগুলোতেও ১০ শতাংশ দারিদ্র্য থাকে। এই পরিমাণ দারিদ্র্য কখনো দূর করা যায় না। কারণ নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ সামাজিক বিভিন্ন কারণে দারিদ্র্যসীমার ঊর্ধ্বে থাকা কিছু মানুষ হঠাৎ করেই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। তবে ২০৩০ সালের পর দেশে অতি দারিদ্র্য বলতে যা বোঝায়, তেমন মানুষ থাকবে না বলে আশা করছে সরকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সারা দেশে চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কাজের সুযোগ বৃদ্ধি, প্রচলিত কৃষি খাত বাণিজ্যমুখী কৃষিতে রূপান্তর, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া আশ্রয়ণ, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পসহ বিশেষ এলাকার উন্নয়নের জন্য সরকার বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, যা দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখছে। দারিদ্র্য হার কমার পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয়ও বেড়েছে। ২০০৬ সালে যা ছিল ৫৪৩ ডলার, ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৬১০ ডলারে। বর্তমানে তা এক হাজার ৭৫২ ডলার।

বৈশ্বিক গবেষণা সংস্থা প্রাইসওয়াটার কুপারসের (পিডাব্লিউসি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৩তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হবে। ওই সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হবে ০.৬ শতাংশ। গড় মাথাপিছু প্রকৃত আয় বাড়বে ৪.১ শতাংশ ও দেশীয় মুদ্রায় গড় জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার হবে ৪.৮ শতাংশ। ওই সময় এই তিনটি সূচকে শুধু ভারত ও ভিয়েতনাম বাংলাদেশের চেয়ে ভালো করতে পারবে।

জিইডি সদস্য ড. শামসুল আলম বলেন, দারিদ্র্যের মধ্যেই বাংলাদেশের জন্ম। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে ২০২১ সাল মেয়াদি উন্নয়নের রূপকল্প হাতে নিয়ে বাস্তবায়ন করছে। এতে আয় বৈষম্য কমাতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে সড়ক অবকাঠামো ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। কৃষির আধুনিকায়ন হয়েছে। উৎপাদনব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিদ্যুতায়ন বেড়েছে। এসব কারণে দারিদ্র্য কমেছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে সর্বাত্মকভাবে কাজ করছে। এতে আগামী দিনে দারিদ্র্য আরো কমবে, বাড়বে মাথাপিছু আয়। আর এসবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।



মন্তব্য