kalerkantho


১৬ ঘণ্টায় তিন জেলায় সড়কে ঝরল ১০ প্রাণ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



১৬ ঘণ্টায় তিন জেলায় সড়কে ঝরল ১০ প্রাণ

কেন্দুয়ার সড়কে ঝরল আরো ৪ প্রাণ। গতকাল অটোরিকশা-বাস মুখোমুখি সংঘর্ষের ঠিক পরের দৃশ্য। ছবি : কালের কণ্ঠ

গাইবান্ধা, নেত্রকোনা ও গোপালগঞ্জে প্রায় ১৬ ঘণ্টায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১০ জনের। আহত হয়েছে অন্তত ২৩ জন। এর মধ্যে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে শুক্রবার রাত সোয়া ১২টার দিকে বাস ও ট্রাক্টরের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হয়েছে শিশুসহ পাঁচজন। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে ১০ জন। গতকাল বিকেল ৩টার দিকে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় বাস ও অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত হয়েছে চারজন, আহত হয়েছে তিনজন। একই দিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে বাস উল্টে গেলে তার নিচে চাপা পড়ে এক পথচারী নিহত হন। আহত হয়েছে বাসের ১০ যাত্রী।

গাইবান্ধায় শিশুসহ পাঁচজন নিহত : গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর রাইসমিল এলাকায় ঢাকাগামী একটি বাসের সঙ্গে ট্রাক্টরের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের পর বাসটি সড়কের পাশের বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খায়। তার ছিঁড়ে বাসটি বিদ্যুতায়িত হয়ে ঘটনাস্থলেই চারজনের মৃত্যু হয়। স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার পর আরেকজন মারা যায়। নিহতদের মধ্যে চারজনই এক পরিবারের সদস্য।

নিহত পাঁচজন হলো গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চাচিয়া মীরগঞ্জ গ্রামের এমদাদুল হক (২৫), তাঁর স্ত্রী কাকলী বেগম (২২), মেয়ে হেনা খাতুন (৫), বোন আফরোজা বেগম (৩০) এবং পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার সুমন মিয়া (৩০)। এমদাদুল, তাঁর স্ত্রী ও বোন ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। সুমন বাসের কর্মচারী বলে ধারণা করছে পুলিশ।

পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার আব্দুল হাই নামের এক বাসযাত্রী জানান, রাত সাড়ে ১১টার দিকে গাইবান্ধা থেকে বাসটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে দেয়। তখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। তাঁর দাবি, শুরু থেকেই চালক দ্রুতগতিতে বাস চালাচ্ছিল। এরপর বাসটি গাইবান্ধা-পলাশবাড়ী সড়কের রাইসমিল এলাকায় পৌঁছলে অন্যদিকে থেকে আসা ট্রাক্টরের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

গতকাল দুপুরে পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিহত চারজনের মরদেহ শনাক্ত করেন এমদাদুল হকের বড় ভাই ইয়াছিন আলী।

নিহত আফরোজার স্বামী শাহীন মিয়া বলেন, অভাব-অনটনের কারণে স্ত্রী তাঁর ভাই ও ভাবির সঙ্গে ঢাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। তাঁদের আয়ে সংসার চলত। একসঙ্গে চারজন মানুষের মৃত্যুতে তিনি ও তাঁর স্বজনরা দিশাহারা।

পলাশবাড়ী থানা পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনাকবলিত বাস ও ট্রাক্টর জব্দ করা হয়েছে। তবে দুটি যানের চালক ও হেলপার পালিয়ে গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যে বাসটি দুর্ঘটনায় পড়েছে সেটা ঢাকার রাস্তায় সিটি সার্ভিস হিসেবে চলাচল করত।

বাস ও অটোরিকশার সংঘর্ষে চারজন নিহত

কেন্দুয়ার কাঁঠালতলী এলাকায় বাস ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত অটোরিকশার চালকসহ চার আরোহী হলো কেন্দুয়া ডিগ্রি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র উপজেলার কাউরাট গ্রামের রকিবুল ইসলামের ছেলে শরীফ (২০), কুতুবপুর গ্রামের মো. হাদিস মিয়ার ছেলে মো. নাজির উদ্দিন (২৭), বলাইশিমুল গ্রামের মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে অটোরিকশাচালক মো. জামাল মিয়া (৩৫) এবং মোহনগঞ্জ উপজেলার চেচরাখালী ইউনিয়নের সোয়াই গ্রামের মো. আব্দুল হান্নানের ছেলে মুরাদ হোসেন (১৮)।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, দুটি যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে অটোরিকশাটি বাসের নিচ পড়ে ভেতরের দিকে ঢুকে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়। চালকসহ চার আরোহী ঘটনাস্থলেই মারা যায়। আহত হন বাসের তিন যাত্রী। তাঁরা হলেন গোলাম রব্বানী (২২), জসিম (৪০) ও শাকিব (২০)। তাঁদের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় লোকজন জানায়, মায়ের দোয়া পরিবহনের বাসটি কেন্দুয়ার দিকে যাচ্ছিল। অন্যদিকে অটোরিকশাটি যাত্রী নিয়ে ময়মনসিংহের দিকে যাচ্ছিল। সংঘর্ষের পর পর চালক বাসটি রেখে পালিয়ে যায়।

কেন্দুয়া থানার ওসি মো. ইমারত হোসেন গাজী বলেন, বাসটি আটক করা হয়েছে।

গোপালগঞ্জে বাস উল্টে পথচারী নিহত

কাশিয়ানী উপজেলার ভাটিয়াপাড়া মোড়ে সড়কের ওপর বাস উল্টে তার নিচে চাপা পড়ে নিহত পথচারীর নাম আবু সাইদ তালুকদার (৫৫)। তিনি ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার কামার গ্রামের মৃত আনার হক তালুকদারের ছেলে।

কাশিয়ানী থানার ওসি মো. আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, কাশিয়ানী উপজেলার ব্যাসপুর থেকে ছেড়ে আসা গোপালগঞ্জগামী যাত্রীবাহী একটি লোকাল বাস ঘটনাস্থলে মোড় ঘোরার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। পথচারী নিহত হওয়া ছাড়াও এতে বাসের ১০ যাত্রী আহত হয়।

গাইবান্ধায় সড়ক-মহাসড়কে ‘কাঁকড়ার রাজত্ব’

গাইবান্ধায় ট্রাক্টরকে কাঁকড়া বলে স্থানীয় লোকজন। এর কারণ, ট্রাক্টরের সামনের দিকটায় থাকে জমি চাষ দেওয়ার যন্ত্র এবং পেছনে জুড়ে দেওয়া থাকে পণ্য পরিবহনের বড় ক্যারেজ বা বডি।

শুক্রবার রাতে পলাশবাড়ীতে যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে সেখানে গতকাল গিয়ে কথা হয় স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে। রেজিয়া বেগম বলছিলেন, ‘এই কাঁকড়ার (ট্রাক্টর) যন্ত্রণায় এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ। রাস্তা দিয়ে যখন কাঁকড়া চলে, মনে হয় দানব আইলো।’

স্থানীয় যুবক আশরাফুল বললেন, বেশ কয়েক বছর আগে এই এলাকায় কাঁকড়ার প্রচলন শুরু হয় মূলত ইটভাটাকে কেন্দ্র করে। জেলার বিভিন্ন ইটভাটার মাটি, বালু ও ইট পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হয় এই কাঁকড়া। তাঁর অভিযোগ, পরিবহন হিসেবে এই ট্রাক্টরের কোনো বৈধতা নেই। ফিটনেস, রুট পারমিট, রেজিস্ট্রেশন কিছুই নেই। আরেক যুবক রাসেল বলেন, এই ট্রাক্টর যারা চালায় তাদের কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। এমনকি কিশোর-তরুণদেরও ব্যবহার করা হয় ট্রাক্টর চালানোর জন্য।

স্থানীয় সংবাদকর্মী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, গাইবান্ধা-নাকাইহাট সড়কে ট্রাক্টরের চাকায় পিষ্ট হয়ে তিনি তিনজনকে প্রাণ হারাতে দেখেছেন। তাঁরও একই প্রশ্ন, প্রশাসন কেন চুপচাপ?

গাইবান্ধা জেলা মোটর মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুজিবুল আমিন নান্নু বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির ফিটনেস আছে কি না এ সম্পর্কে তাঁরা তেমন কিছু জানেন না। এবার ঈদে বাড়ি থেকে ঢাকা ফেরত যেতে যাত্রীদের বহন করার জন্য বাসটি আনা হয়।

জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক গৌতম কুমার বিশু বলেন, গাইবান্ধার এমন কোনো সড়ক, মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক নেই যেখানে ট্রাক্টর চলে না। তাঁর অভিযোগ, একাধিকবার প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও এগুলোর অবাধ চলাচল বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক গৌতম চন্দ্র পাল বলেন, সড়কে অবৈধ যান কাঁকড়ার (ট্রাক্টর) চলাচল বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাজ চলছে।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন গাইবান্ধা, হাওরাঞ্চল, গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি ও আঞ্চলিক প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ)



মন্তব্য