kalerkantho


২১ আগস্ট ষড়যন্ত্রের বিস্তৃত জাল

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ছাড়াতেই কারাগারে গ্রেনেড ছোড়া হয়

এস এম আজাদ   

২১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ছাড়াতেই কারাগারে গ্রেনেড ছোড়া হয়

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে নারকীয় গ্রেনেড হামলার পরদিন পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে একটি গ্রেনেড উদ্ধারের ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। রহস্য আরো ঘনীভূত হয়, কারাগারে তল্লাশির সময় সোহেল মণ্ডল নামের এক কারারক্ষীর কক্ষ থেকে দুই লাখ টাকা উদ্ধারের পর তিনি লাপাত্তা হয়ে গেলেন। সন্দেহ দেখা দেয়, কর্মীদের যোগসাজশে কারাগারের অভ্যন্তরেও ২১ আগস্ট হামলার ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত হয়েছিল। সভাপতি শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে কারাবন্দিদেরও কেউ কেউ। এমনকি কারাগারেও একযোগে হামলার পরিকল্পনা ছিল বলে সন্দেহ করা হয়।

দীর্ঘদিন পর গত ৭ আগস্ট পৃথক এ মামলায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) বলা হয়েছে, সমাবেশে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে কারাগারে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি ও হামলাকারীদের সহযোগীদের ছাড়িয়ে নিতে অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরির জন্য কারাগারে গ্রেনেড ছুড়ে মারা হয়। তবে কারারক্ষী সোহেল মণ্ডলসহ কারাগারের কারোরই ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা পায়নি সিআইডি। বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) জঙ্গিরা বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের মতোই একই ধরনের গ্রেনেড এখানে ছুড়ে মারে। তবে পিন খোলা ছিল না বলে গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হয়নি। মূলত বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে শেখ হাসিনার ওপর হামলা ও কারাগারে গ্রেনেড ছুড়ে মারা একই সূত্রে গাঁথা।

এই মামলায় হুজির ১৬ জীবিত জঙ্গিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। নিহত হওয়ার কারণে সম্পৃক্ত তিনজনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে চার্জশিটে। আসামিদের জবানবন্দিতে চারজনের নাম উঠে এলেও তাদের হদিস পায়নি সিআইডি। ১৬ অভিযুক্তের মধ্যে ছয়জনই পলাতক। তদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কারাগারে গ্রেনেড উদ্ধারের পর কারারক্ষী সোহেলের কক্ষে যে টাকা পাওয়া যায় তা ছিল অবৈধ। এ কারণে তিনি গা ঢাকা দেন।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় দায়ের করা মূল দুটি মামলার তদন্ত শেষ করে ৫২ জনের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ৩ জুলাই চার্জশিট দিয়েছিল সিআইডি। ওই মামলা এখন বিচারাধীন। আর কারাগারে গ্রেনেড উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের করা মামলটির তদন্ত শেষ করে গত ৭ আগস্ট ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি।

জানতে চাইলে সিআইডির অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অ্যাডিশনাল ডিআইজি) ও এ মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা আব্দুল কাহার আকন্দ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কারাগারে গ্রেনেড উদ্ধারের ঘটনায় ব্যাপক রহস্য তৈরি হয়েছিল। মামলাটি আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে সম্প্রতি চার্জশিট দিয়েছি। হুজির জঙ্গিরাই ওই গ্রেনেড কারাগারে ছুড়ে ফেলেছিল—এমন তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে প্রত্যক্ষ কোনো সাক্ষী পাওয়া যায়নি।’ কাহার আকন্দ বলেন, ‘কারারক্ষী সোহেলের বিষয়টি ভিন্ন। তবু আমরা খতিয়ে দেখেছি। এ ঘটনার সঙ্গে কারাগারের কারোরই সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। এ কারণে সোহেলকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টাও করা হয়নি।’

সিআইডি সূত্র জানায়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকেলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলার পরদিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ২৬ ও ৯০ নম্বর সেলের মাঝামাঝি ড্রেনের পাশে মিন্টু নামের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী একটি গ্রেনেড দেখতে পান। তিনি বিষয়টি কারারক্ষীদের জানান। এরপর সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞদল আর্জেস ৮৪ মডেলের গ্রেনেডটি উদ্ধার করে। সেটি লালবাগ থানায় জমা দেওয়া হয়। সে সময় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। ঘটনার পর কারাগারে কারারক্ষী সোহেলের কক্ষে দুই লাখ টাকা পাওয়া যায়। ২১ আগস্টের মূল মামলার সঙ্গেই ঘটনাটি তদন্ত করছিল সিআইডি। তবে কারারক্ষী সোহেলের আত্মগোপনে চলে যাওয়া এবং বঙ্গবন্ধু এভিনিউ থেকে কারাগারের দূরত্ব বিবেচনায় ২০১০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আলাদা মামলা করে পুলিশ।

চকবাজার থানায় দায়ের করা এ মামলার তদন্তভার ওই বছরের ৯ অক্টোবর পায় সিআইডি। এজাহারে স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন পিন্টুকে সন্দেহভাজন আসামি করা হয়। সেনাবাহিনীর পরীক্ষায় বের হয়ে আসে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ছোড়া একই গ্রেনেড ফেলা হয় কারাগারে। মামলায় ৫০ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নেন তদন্তকারীরা। গ্রেনেড ফেলতে কেউ না দেখলেও আলামত দেখে সিআইডি চার্জশিটে মন্তব্য করেছে, উর্দু রোড থেকে দেয়ালের ওপর দিয়ে বা পাশের কোনো ভবনে উঠে গ্রেনেডটি কারাগারের ভেতরে ফেলা হয়। পিন না খোলার কারণে সেটি বিস্ফোরিত হয়নি।

সূত্র জানায়, ঘটনার পর কারা অধিদপ্তর নিজেরাই তদন্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গ্রেনেডটি বাইরে থেকে ছোড়া হয়েছিল। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বরখাস্ত করা হয় তৎকালীন ডেপুটি জেলার এনামুল কবির, সর্বপ্রধান কারারক্ষী আবদুল ওয়াহেদসহ আরো কয়েকজনকে। কারারক্ষী সোহেল মণ্ডল পালিয়ে যাওয়ার কারণে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তবে গ্রেনেডের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পরিদর্শক সুব্রত কুমার সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামিরা ওই সময় কারাগারে ছিল। তাদের ছাড়িয়ে নিতে এবং অরাজকতা তৈরির জন্যই কারাগারের মধ্যে তারা গ্রেনেড ফেলে। কারণ তারা বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ব্যর্থ হয়েছিল।’

অভিযুক্তদের মধ্যে পলাতক যারা : হুজির শীর্ষ নেতা মাওলানা তাজ উদ্দিনকে ২১ আগস্ট মামলার মতোই এ মামলার চার্জশিটে পলাতক দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া হুজি সদস্য মাওলানা লিটন ওরফে দেলোয়ার ওরফে জুবায়ের, মোহাম্মদ ইকবাল, খলিলুর রহমান, মহিবুল মোত্তাকিন ও আনিসুল মোরছালিন চার্জশিটে পলাতক আসামি। পরিদর্শক সুব্রত কুমার সাহা বলেন, ‘পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির জন্য আবেদন করা হয়েছে।’

গ্রেপ্তার যারা : অভিযুক্তদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে আবু বকর সিদ্দিক, সেলিম হাওলাদার ওরফে সেলিম হায়দার, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মইনুদ্দীন শেখ ওরফে মুফতি মইন ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ, শাহাদাত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, উজ্জল ওরফে রতন, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, মাজেদ ভাট ওরফে ইউসুফ ভাট, রফিকুল ইসলাম ওরফে রফিক ওরফে সবুজ, ওরফে খালিদ, ওরফে শহিদুল্লাহ ওরফে শামীম, আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আব্দুর রাজ্জাক। 

যাদের নাম বাদ : তদন্ত কর্মকর্তা সুব্রত কুমার সাহা জানান, গ্রেনেড সরবরাহ ও বিস্ফোরণের সঙ্গে ২৩ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। তারা কারাগার এলাকায় গ্রেনেডটি ফেলে। এর মধ্যে মুফতি হান্নানের অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আহসান উল্লাহ কাজল ভারতে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। মাসুদ নামে আরেক হুজি জঙ্গিরও মৃত্যু হয়েছে। মামলার অপর আসামিদের জবানবন্দিতে ওমর ফারুক, শুভ, ফেরদৌস ও রাসেল এ চারটি নাম উঠে আসে। তবে তাদের ঠিকানা পাওয়া যায়নি। অনেক সময় জঙ্গিরা ছদ্মনাম ব্যবহার করে। শনাক্ত না হওয়ায় তাদের নামও বাদ দেওয়া হয়েছে।



মন্তব্য