kalerkantho


বিশেষ সাক্ষাৎকারে ওবায়দুল কাদের

অস্থিরতার আগুন ছড়ালে দাঁতভাঙা জবাব

‘ওদের ভূমিকাতেই ওয়ান-ইলেভেনের পদধ্বনি শুনছি’

পার্থ সারথি দাস   

২০ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



অস্থিরতার আগুন ছড়ালে দাঁতভাঙা জবাব

সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কালের কণ্ঠ কথা বলেছে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে। গতকাল রবিবার বিকেলে মন্ত্রণালয়ে তাঁর দপ্তরে বসে দেওয়া এই একান্ত সাক্ষাৎকারে কাদের বলেছেন, ভুল থেকেই তাঁর দল শিক্ষা নেবে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলের প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে বিভিন্ন খাতে অস্থিরতার আগুন ছড়ানোর গোপন ষড়যন্ত্র চলছে। আর সেটা মোকাবেলা করতে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে।

আপনি বারবারই বলছেন—ওয়ান-ইলেভেনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। বিষয়টি কি—জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের পদধ্বনি বলছি বিএনপি ও তার সাম্প্রদায়িক সহযোগীদের ভূমিকা দেখে। বিদেশে আসা-যাওয়া; আমাদের জানা আছে, ব্যাংকক, লন্ডন, দুবাইয়ে বৈঠক হয়েছে। গোপনে বৈঠকগুলো হয়েছে। গোপনে যে বৈঠক হয় সেখানে তো ষড়যন্ত্র আছে। ওয়ান-ইলেভেনে মিডিয়ার একটি অংশ সক্রিয় ছিল। এখনো সক্রিয় তারা। বিএনপি মাঠে না থাকলেও মিডিয়ার একটি অংশ এটি করছে। তবে বেশির ভাগ মিডিয়া দায়িত্বশীল। তারা দেশ নিয়ে ভাবে। পজিটিভ জায়গায় তারা চিন্তা করছে।’

ওবায়দুল কাদের আরো বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে লক্ষ করেছি, দু-একটি মিডিয়া ভিন্ন ভূমিকায় ছিল। বিএনপি-জামায়াতের এজেন্ডার সঙ্গে তাদের অপপ্রচারের মিল রয়েছে। বেশির ভাগ মিডিয়া গুজব এড়িয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ অফিসে সুপরিকল্পিতভাবে হামলা করা হয়েছিল। স্কুল ড্রেস পরে এটা করা হয়েছে। ভিন্ন ভূমিকা পালনকারী মিডিয়া তাদের ছাত্র-ছাত্রী বলে অভিহিত করেছে। অথচ এরা ভুয়া আইডি কার্ড নিয়ে আক্রমণ করেছে। স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মীর একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। বলা হলো সে ছাত্র। এটা অপপ্রচার।’

মন্ত্রী বলেন, ‘এজেন্ডা আছে বিভিন্ন খাতে অস্থিরতা তৈরি করার। কোটা ইস্যু সহিংসতার দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। গোপন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অস্থিরতার আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সহিংসতার চেষ্টা করা হলে তার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে।’

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলন করতে গিয়ে তারা (বিএনপি) ব্যর্থ হয়েছে বারবার। তারা কোটার ওপর, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ওপর ভর করে। তারা দুটি কাজ ভালো করে—একটি হলো বিদেশিদের কাছে নালিশের রাজনীতি ও গুজব-সন্ত্রাস। তারা গুজব ছড়াচ্ছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের সময় গুজব-সন্ত্রাস ছড়িয়েছে। যৌক্তিক সামাজিক আন্দোলনকে নোংরা রাজনীতির খেলায় নিয়ে যেতে চেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আহ্বান জানানোর পর শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরে গেছে। তার পরও গুজব ছড়ানো হয়েছে।’

দেশের রাজনীতিতে কূটনীতিকদের নাক গলানোর বিষয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘যারা আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র তারা পরামর্শ দিতে পারে। নির্বাচন সুষ্ঠু হোক সেটা তো সবাই চায়। পরামর্শ তারা দিতে পারে। তবে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাদের কথা শুনব কেন? আমরাই আমাদের গণতন্ত্র দেখব। নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী। নির্বাচনকালীন সরকার মেজর পলিসি অ্যাডাপ্ট করতে পারবে না। রুটিন ওয়ার্ক করবে।’

নির্বাচনকালীন সরকারে কে থাকবে জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তা আমাদের নেত্রী জানেন। সংসদে যাদের প্রতিনিধিত্ব আছে তাদের মধ্য থেকেই এই সরকার হবে। এই নির্বাচনকালীন সরকার ছোট আকারে হতে পারে। তখন তাতে কে কে থাকবেন, কিভাবে থাকবেন—তা প্রধানমন্ত্রী জানেন। নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপির কাউকে রাখার বিষয়ে আমি বলব, তাদের আহ্বান জানানোর ইচ্ছা আমাদের নেই। তাদের সংসদেই তো প্রতিনিধিত্ব নেই।’

জাতীয় নির্বাচনের আগে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘খুলনা, গাজীপুর তারপর রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন হলো। এসব সিটিতে আগের নির্বাচনে হেরেছিলাম। পাঁচটিতেই বিএনপি জিতেছিল। মজার ব্যাপার হলো, কোনো নির্বাচনে পরাজিত হলেই তারা অভিযোগ তোলে। তখনো আমরা ক্ষমতায় ছিলাম, এখনো আছি। এর আগে তারা যে জিতেছিল তখন তো অনিয়মের প্রশ্ন ওঠেনি। আমরা পাঁচটির মধ্যে চারটি উদ্ধার করেছি। সিলেটে পারিনি—ওখানে সাংগঠনিক দুর্বলতা ছিল। এ কারণেই পরাজয় হয়।’ তিনি বলেন, ‘সিটি নির্বাচনে বার্তা পাওয়ার পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আমাদের প্রস্ততি চলছে। আমরা ভুল থেকে শিক্ষা নেব। ভুলকে সংশোধন করার সৎসাহস শেখ হাসিনার আছে। ভুল সংশোধন করতে জানি আমরা।’

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ১৪ দল ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমরা আমাদের অ্যালায়েন্স নিয়ে এখনো ঐক্যবদ্ধ। ১৪ দল, জাতীয় পার্টি—আমরা ঐক্যবদ্ধ। শেষ পর্যন্ত মেরুকরণ, সমীকরণ কোথায় গিয়ে ঠেকবে সেটা সময় বলে দেবে। আমার কাছে যেটা মনে হয়, উইনেবল, একসেপ্টেবল প্রার্থী দিতে হবে। আমরা দলীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ফোরামে বলেছি—এমন কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করবেন না যাতে জয়ী হতে না পারা যায়। বিএনপি জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করলে সেখানে প্রতিযোগিতার বিষয় আছে। আমরা পর পর কয়েকবার ক্ষমতায় আছি। আমাদের উন্নয়ন, অর্জন এত বেশি যে আমাদের নেত্রীর প্রতি জনগণের আস্থা অভ্রভেদী তুঙ্গে।’

একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে কোন বিষয় বড় বিবেচ্য হবে—জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমার কাছে বড় বিষয় হচ্ছে—যাকে আমরা প্রার্থিতা দেব তাকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। জনমত জরিপে তার নামটা জনপ্রিয়তার বিচারে আসতে হবে—তবেই বিবেচনা করা হবে। সবার আমলনামা নেত্রীর কাছে জমা হচ্ছে। ছয় মাস পর পর বিশেষজ্ঞদল, দলের নেতারাও সেখানে আছেন তা পরীক্ষা করছেন। সিআরআই কাজ করছে। কাজ করছেন প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়; ববি—ওঁরাও কাজ করছেন। চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে। কাকে নমিনেশন দিলে জয় হবে সেটা দেখা হচ্ছে।’ জোটের ক্ষেত্রেও একই কৌশল অবলম্বন করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হেরে যাওয়ার জন্য নমিনেশন দেব না।’

বিএনপি কি একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে—এমন প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা কিভাবে বলব কে অংশ নেবে আর নেবে না। বিএনপি অংশ না নিলে প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রতিদ্বন্দ্বী পার্টির সংখ্যা কম হবে না। বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি না সেটা তাদের বিষয়। কাউকে অনুনয়-বিনয়, অনুরোধ করার ইচ্ছা আমাদের নেই।’

সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের কারণ ঐক্যচেষ্টা কি না—এই প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘নাজমুল হুদা তো এসেছিলেন আমার কাছে। আপনারা তো অনুসন্ধান করেন। আপনারা অনুসন্ধান করে বের করেন কেন এই যোগাযোগ হচ্ছে। নির্বাচনের আগে সংলাপের সুযোগ নেই, সময় নেই।’

আপনি তো সিপিবির অফিসে নিজেই গেলেন। বিভিন্ন দলের নেতা আপনার দপ্তরেও এসেছিলেন। নির্বাচন সামনে রেখেই এসব যোগাযোগ হচ্ছে কি না—জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আলাদা নির্বাচন করবে, তাদের জোটে থেকে। ফোনে কথা হয়েছে বিভিন্নজনের সঙ্গে। কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে কথা হয়েছে। খালেকুজ্জামানের সঙ্গে কথা হয়েছে টেলিফোনে। যুক্তফ্রন্টের মেজর মান্নান এসেছিলেন আমার কাছে। টেলিফোনেও কথা হয়েছে। বিভিন্নজনের সঙ্গে এই যে আলোচনা হয়েছে, তাতে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে ভাবনা বিনিময় হয়েছে। এই যোগাযোগগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।’



মন্তব্য