kalerkantho


আবার রক্তাক্ত পাহাড়

খাগড়াছড়িতে মুহুর্মুহু গুলি, নিহত ৬

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি   

১৯ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



খাগড়াছড়িতে মুহুর্মুহু গুলি, নিহত ৬

আবার রক্তাক্ত হলো পার্বত্য এলাকা। খাগড়াছড়ি শহরের অদূরে স্বনির্ভর বাজারে গতকাল শনিবার সকালে দুর্বৃত্তদের মুহুর্মুহু গুলিতে ছয়জনের প্রাণহানি ঘটেছে। গুলিতে আহত হয়েছে আরো তিনজন। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর বিরোধের জের ধরে এ হামলা হয়। স্বনির্ভর বাজারে ইউপিডিএফের উদ্যোগে গ্রামবাসীকে নিয়ে একটি কর্মসূচি পালন করার আগে এ হামলা চালায় অস্ত্রধারীরা। ইউপিডিএফ ওই ঘটনার জন্য ‘সংস্কারপন্থী’ জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছে। তবে হামলার সঙ্গে কোনো রকম সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা)।

ওই হামলার পর খাগড়াছড়ি-পানছড়ি সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। স্বনির্ভর বাজারের কোনো দোকানপাট গতকাল খোলেনি। এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

হামলার প্রতিবাদে আগামীকাল সোমবার খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা সড়ক অবরোধের ডাক দিয়েছে ইউপিডিএফ সমর্থক তিনটি পাহাড়ি সংগঠন।

পুলিশ বলছে, হামলাকারীদের ধরতে অভিযান চলছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে। ওই ঘটনা তদন্ত করতে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করেছে জেলা প্রশাসন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খাগড়াছড়ি শহর থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে স্বনির্ভর বাজারে এক দল সশস্ত্র সন্ত্রাসী গতকাল সকাল সাড়ে ৮টা থেকে পৌনে ৯টার মধ্যে অতর্কিতে হামলা চালায়। প্রথমেই তারা বাজারের মোড়ে কয়েকজনকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে। এরপর ইউপিডিএফ কার্যালয়ের সামনে ও আশপাশে গুলি চালানো হয়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। স্বনির্ভর বাজারে অবস্থিত পুলিশ বক্সেও গুলি লেগেছে। পুলিশ দুর্বৃত্তদের ধরতে অভিযান চালানোর আগেই তারা পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে ছয়জনের লাশ ও আহত তিনজনকে উদ্ধার করে খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যান আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

নিহত ছয়জন হলেন ইউপিডিএফ সমর্থক পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের জেলা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তপন চাকমা, সহসাধারণ সম্পাদক এলটন চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের জেলা সহসভাপতি পলাশ চাকমা, শিক্ষার্থী রুপম চাকমা, প্রকৌশলী ধীরাজ চাকমা ও মহালছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য সহকারী জিতায়ন চাকমা। শেষের তিনজন রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে জানিয়েছে পরিবারের সদস্যরা।

নিহত তপন চাকমার বাড়ি মহালছড়ি উপজেলার চেংড়াছড়ি, পলাশ চাকমার বাড়ি একই উপজেলার মনারটেক, আর ধীরাজ চাকমা পানছড়ি উপজেলার উগলছড়ি এলাকার বাসিন্দা। 

গুলিতে আহতরা হলেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ সদর উপজেলার সভাপতি সোহেল চাকমা (২২), সমর বিকাশ চাকমা (৪৮) ও সুকিরন চাকমা (৩৫)। স্থানীয়ভাবে তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজনের অবস্থা সংকটাপন্ন।

নিহত ধীরাজ চাকমার মামা বিশ্ব কল্যাণ চাকমা জানান, ঢাকায় একটি বায়িং হাউসে চাকরি করতেন ধীরাজ চাকমা। ঈদের ছুটিতে তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। পানছড়ির উগলছড়িতে যাওয়ার জন্য স্বনির্ভর বাজারে গাড়ির অপেক্ষায় থাকাকালে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন তিনি।

স্বনির্ভর এলাকার বাসিন্দা সুগত চাকমার ছেলে রূপম চাকমা উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। তার মা সেবিকা ত্রিপুরা জানান, তাঁর সন্তান কোনো সংগঠনের সঙ্গে জড়িত নয়। একই গ্রামের জিতায়ন চাকমা মহালছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য সহকারী ছিলেন। তাঁর স্ত্রী জানান, সকালে নাশতা করতে বাজারে গিয়েছিলেন জিতায়ন চাকমা।

খাগড়াছড়ি সদর থানার ওসি শাহাদাত হোসেন টিটু জানান, বিবদমান দুটি পাহাড়ি সংগঠনের গোলাগুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তরা জঙ্গল থেকে এসে হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ায় তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশ সুপার আলী আহমদ খান জানান, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনার পর প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। খাগড়াছড়ি হাসপাতালে ছুটে যান স্থানীয় এমপি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, জেলা প্রশাসক মো. শহিদুল ইসলাম ও পুলিশ সুপার আলী আহমদ খান।

ইউপিডিএফের জেলা সংগঠক মাইকেল চাকমা ঘটনার জন্য সংস্কারপন্থী জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছেন। ইউপিডিএফের জেলা ইউনিটের ভারপ্রাপ্ত সংগঠক উজ্জল স্মৃতি চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি অংগ্য মারমা, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) সভাপতি বিনয়ন চাকমা ও শ্রমজীবী ফ্রন্টের (ওয়ার্কার্স ফ্রন্ট) সভাপতি সচিব চাকমা এক যুক্ত বিবৃতিতে স্বনির্ভর বাজারে সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। বিবৃতিতে ঘটনার জন্য প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ আনা হয়।

অন্যদিকে জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) তথ্য প্রচার বিভাগের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ওই হামলা ও হত্যার ঘটনা ইউপিডিএফের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের।

আধাবেলা সড়ক অবরোধ কাল : হামলার প্রতিবাদে আগামীকাল খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা সড়ক অবরোধের ডাক দিয়েছে ইউপিডিএফ সমর্থক পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম ও হিল উইমেনস ফেডারেশন। আগামী ২২ আগস্ট ঈদুল আজহা ও সরকারি ছুটির কথা বিবেচনা করে সংক্ষিপ্ত অবরোধের কর্মসূচি দেওয়া হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অ্যাম্বুল্যান্সসহ রোগী বহনকারী যানবাহন, ফায়ার সার্ভিস, জরুরি বিদ্যুৎ-পানি ও ওষুধ সরবরাহকারী গাড়ি অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে।

তদন্ত কমিটি : হামলার ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু ইউসুফকে আহ্বায়ক এবং সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরিজকে সদস্যসচিব করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটির সদস্যরা হলেন সদর সার্কেলের এএসপি আবদুল আউয়াল, ফায়ার সার্ভিসের ডিএডি জসিম উদ্দিন মজুমদার এবং খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক নয়নময় ত্রিপুরা। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

আঞ্চলিক দলগুলোর বিরোধের জের ধরে গত কয়েক মাসে পানছড়ি বাজার বয়কট, খাগড়াছড়ি-পানছড়ি সড়কের দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়াসহ চার গ্রামবাসীকে ধরে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই সব ঘটনাকে কেন্দ্র করেই গতকাল ইউপিডিএফের কর্মসূচি পালন করার কথা ছিল।

আরেক হামলায় একজনের মৃত্যু : স্বনির্ভর বাজারে হামলার কয়েক ঘণ্টা পর দুপুর ১২টার দিকে খাগড়াছড়ি-পানছড়ি সড়কের পেরাছড়া ব্রিজ এলাকায় হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত। হামলায় আহত ছন কুমার চাকমাকে (৫৫) উদ্ধার করে খাগড়াছড়ি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিকেল ৩টার দিকে তাঁর মৃত্যু ঘটে। ছন কুমার চাকমা জেলা সদরের শিবমন্দির এলাকার মৃত বন মিলিনী চাকমার ছেলে।

খাগড়াছড়ি হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ড. নয়নময় ত্রিপুরা জানান, ছন কুমার চাকমা মূলত মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গেছেন। তাঁর শরীরে গুলির কোনো চিহ্ন নেই।

পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধের জের ধরে গত ৩ মে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন রাঙামাটির নানিয়ার চর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা। তিনি জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ছিলেন। তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার পথে পরের দিনই দুর্বৃত্তদের হামলায় প্রাণ হারান নবগঠিত ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) সভাপতি তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাসহ পাঁচজন। এর আগে ৩ জানুয়ারি ইউপিডিএফের অন্যতম সংগঠক মিঠুন চাকমাকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে।



মন্তব্য