kalerkantho


চালক মালিক পুলিশকেও শাস্তির আওতায় আনুন

১০ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



চালক মালিক পুলিশকেও শাস্তির আওতায় আনুন

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সরকার সড়ক নিরাপত্তা আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে। আইনটি এখন জাতীয় সংসদে যাবে। এই আইনের খসড়ায় দুর্ঘটনায় জড়িত গাড়িচালকের সর্বোচ্চ পাঁচ বছর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় যদি আইন পাস করা হয় তাহলে সেটা হবে একপেশে আইন বা ত্রুটিপূর্ণ আইন। কারণ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু গাড়িচালক এককভাবে দায়ী নয়। এর সঙ্গে গাড়ির ফিটনেসের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গাড়ির ফিটনেসের বিষয়ে চালকের কিছু করার নেই। এর সঙ্গে গাড়ির মালিক, বিআরটিএ কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। একটি গাড়ি রাস্তায় নামানোর আগে তা সঠিক আছে কি না তা দেখবেন মালিক। মালিককে ফিটনেস সনদ দেবে বিআরটিএ। আইন অনুযায়ী, সব কিছু ঠিক না থাকলে বিআরটিএ সনদ দেবে না। এরপর একটি গাড়ি রাস্তায় নামার পর তা যথাযথভাবে ফিট কি না তা দেখবে পুলিশ। পুলিশ যদি ফিটনেসহীন গাড়ি চলতে দেয় তাহলে এর দায় কেন চালকের ওপর পড়বে! এ কারণে এই আইনটি ত্রুটিপূর্ণ। চালকের পাশাপাশি ফিটনেসহীন গাড়ি সড়কে চলার সুযোগ করে দেওয়ার কারণে গাড়ির মালিক, বিআরটিএ এবং পুলিকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এটা করা হলে মালিক শাস্তির ভয়ে ফিটনেসহীন গাড়ি রাস্তায় নামাবে না। বিআরটিএ কর্মকর্তা বা পুলিশ দুর্নীতির মাধ্যমে ফিটনেসহীন গাড়ি চলার সুযোগ দেবে না।

এত গেল একটি দিক। এ ছাড়া অসংখ্য ত্রুটি রয়েছে আইনে। ভাঙাচোরা সড়কের কারণে যদি দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে চালক কতটুকু দায়ী সেটাও বিবেচনা করতে হবে। এ দুর্ঘটনা এড়াতে হলে সঠিকভাবে রাস্তা নির্মাণ হয়েছে কি না তা মনিটরিং করতে হবে। এটা দেখার জন্য আমাদের দেশে কোনো ব্যবস্থা নেই বলেই চলে। তার কারণ রাস্তায় নামলেই দেখবেন, কোনো কোনো এলাকার রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী। মাসের পর মাস এ অবস্থা চলছে। ঠিক করার কেউ নেই। এ জন্য দুর্ঘটনা ঘটছে। সাংবাদিকরা সচিত্র খবর প্রকাশ করছেন। তার পরও ব্যবস্থা নেই। তাই এই আইনে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে।

আমাদের দেশে ১৯৮২ সালে প্রথম একটি অধ্যাদেশ জারি হয়। তা কয়েকবার সংশোধন করা হয়েছে। ১৯৮২ সালে দেশের জনসংখ্যার পরিমাণ, রাস্তা ও গাড়ির সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে আইন করা হয়েছিল। এখন ২০১৮ সাল। তাই বর্তমান জনসংখ্যা, রাস্তার পরিমাণ ও গাড়ির সংখ্যা—এই তিনটি ফ্যাক্টরের মধ্যে সমন্বয় করে আইন করতে হবে। তাহলেই কেবল যুগোপযোগী আইন হবে। কিন্তু সে ব্যবস্থা দেখছি না।

দেশে সুনির্দিষ্ট গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই। এটা নির্ধারণ করে আইনে ব্যবস্থা থাকতে হবে। যাতে করে পরিবহন মালিক বা চালক-শ্রমিকরা কথায় কথায় ধর্মঘট করতে না পারে। এটা দেখার জন্য সরকারি-বেসরকারি বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি থাকতে হবে।

আইনে তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই তহবিলের টাকা কোথা থেকে আসবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। আর এটা না করার কারণে সড়কে চাঁদাবাজি বেড়ে যাবে। তহবিল গঠনের নামে মালিক ও শ্রমিক নেতারা বেশি মাত্রায় দুর্নীতি করবেন। এক টাকা তহবিলের কথা বলে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করবেন। এই চাঁদাবাজি ঠেকানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। সেটা করতে হবে।

এসবের পাশাপাশি আইনের একটি ভালো দিকও আছে। সেটা হলো আইনের খসড়া করার পরপরই মালিকপক্ষ এক সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে যে এখন থেকে আর গাড়ি চালকের কাছে চুক্তিভিত্তিক দেবেন না। এখন থেকে দৈনিক ভিত্তিতে চালক-হেলপারকে মজুরি দেওয়া হবে। ফলে বেশি ভাড়ার আশায় চালকের বেশি যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা কমে যাবে। ফলে দুর্ঘটনাও কমে যাবে বলে মনে করি।

তবে আগের আইনে চালক কত ঘণ্টা গাড়ি চালাবে তা নির্ধারণ করা ছিল। আগের আইনে বলা ছিল একটানা পাঁচ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর আধঘণ্টা বিরতি থাকবে। এরপর আবার গাড়ি চালাবে। কিন্তু নতুন আইনের খসড়ায় সে ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছে। এতে চালকদের বেশি সময় গাড়ি চালাতে বাধ্য করতে পারেন মালিকরা। আর তা হলে দুর্ঘটনার মাত্রাও বেড়ে যাবে। কারণ গাড়িচালক বিশ্রামের সময় কম পাবে।

আইনের এসব ত্রুটি কর্তৃপক্ষ নজরে নিয়ে তা যতটা সম্ভব দূর করার চেষ্টা করবে বলে প্রত্যাশা করি। আর সেটা হলেই সাধারণ মানুষ সড়কে কিছুটা হলেও নিরাপদে চলাচলের সাহস পাবে।



মন্তব্য