kalerkantho


এবার জরুরি বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা

১০ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



এবার জরুরি বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা

ড. সামছুল হক, অধ্যাপক, বুয়েট

সড়ক পরিবহন খাতে সীমাহীন নৈরাজ্যের কারণে আমাদের দেশে, বিশেষ করে রাজধানীতে শিক্ষার্থীরা যে আন্দোলন করেছে তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। পরিবহন খাতে কী ধরনের নৈরাজ্য বিরাজ করছে তা আমরা জানি, কারণ আমরা প্রতিনিয়ত এর ভুক্তভোগী। সড়ক দুর্ঘটনার পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিবাদ না হলেও এসব মৃত্যু মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। গত ২৯ জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলায় দুই শিক্ষার্থীর প্রাণপ্রদীপ নিভে গেছে একাধিক বাসের রেষারেষি প্রতিযোগিতায়। রাজধানীর সড়ক কিংবা রাজধানীর বাইরের সড়ক-মহাসড়কে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার বলি হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যেসব দাবি জানানো হয়েছে তার বেশির ভাগই সরকার মেনে নিয়েছে। সড়ক পরিবহন আইন কঠোর  করা হচ্ছে। ঘাতকের ফাঁসির বিষয়টিও আইনের মাধ্যমে যতটুকু সম্ভব নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই আন্দোলন থেকে একটি বার্তা আমরা পেয়েছি, সেটা হলো জরুরি ভিত্তিতে পরিবহন খাতে নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তোলা দাবিগুলোর  মধ্যে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানে স্পিডব্রেকার স্থাপন বা আন্ডারপাস স্থাপনের মতো কাজগুলো করতে একটু সময় লাগবে। তবে বেশির ভাগ বিষয়ই মিটমাট হয়ে গেছে।

এখন দরকার পরিবহন খাতের বিজ্ঞানসম্মত ও স্থায়ী চিকিৎসা। কুর্মিটোলায় দুই শিক্ষার্থীর প্রাণহানির কারণ ছিল বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এটি বন্ধ করতে বহু আগেই সুপারিশ করা হয়েছিল। এর জন্য কম্পানিভিত্তিক বাস সেবা পরিচালনা করতে হবে। খণ্ড খণ্ড মালিকনির্ভর গণপরিবহন ব্যবস্থা বদলে দিতে হবে। বাসের মুনাফা সমানুপাতিক হারে ভাগ হবে। একটি ব্যবস্থা থাকবে, নির্দিষ্ট রঙের গাড়ি নির্দিষ্ট রুটে চলবে। তাহলে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে। ফিটনেসহীন গাড়ি সড়কে নামানো যাবে না। দেশে গাড়ি আছে ৩৫ লাখ। এই গাড়িগুলোর সঠিক ফিটনেস সনদ বিআরটিএ দিতে পারবে না। কারণ তাদের ফিটনেস দেওয়ার বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অর্থাৎ যন্ত্রপাতি নেই। খালি চোখে দেখে বিআরটিএর কর্মকর্তারা কিভাবে ফিটনেস দেন? গাড়ির ৪২টি বিষয় ঠিকঠাক আছে কি না তা খালি চোখে দেখা যায় না। এ জন্য যন্ত্র লাগে। এ জন্য ব্যবস্থা আছে শুধু বিআরটিএ মিরপুর অফিসে। রাস্তায় ফিটনেসহীন গাড়ি চললে দুর্ঘটনা ঘটবেই। যানবাহন ফিট করার দায়িত্ব যাদের তাদের দক্ষ জনবলও নেই। বিষয়টি তামাশার মতো হয়ে গেছে।

সড়কে লাখ লাখ চালক গাড়ি চালাচ্ছে লাইসেন্স ছাড়া। তাদের প্রশিক্ষণ দেবে কে? চালক তৈরির উদ্যোগ আগে নেয়নি সরকার। এখন নিচ্ছে। রুট পারমিট দেওয়া হচ্ছে তাদের, যাদের ক্ষমতা আছে। সেখানেও বাণিজ্য হচ্ছে। পুলিশের চোখ সব সময় রাস্তায় থাকে না। তাদের এত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তারা আইনের ভয় দেখিয়ে রাস্তায় চাঁদাবাজি করে। ফিটনেসহীন গাড়ি, লাইসেন্সহীন গাড়ি চলতে দেয় তারা। রাস্তায় ধীরগতির ও দ্রুতগতির গাড়ি একসঙ্গে চললে কিভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে তার জন্য ট্রাফিক পুলিশ পারদর্শী নয়। এখানেও কাজ করছে হাতের ইশারা, বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনার চেষ্টা সেই বৃথাই।

আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফিটনেসহীন গাড়ি চলে না। চালকের লাইসেন্স থাকে, থাকে পুলিশের নিবিড় তদারকি। আমাদের দেশে লাখ লাখ নসিমন-করিমন, ভটভটি জাতীয় বোঝা হয়ে গেছে। বাস ও ট্রাকের মধ্যে সংঘর্ষের পেছনে এই ধীরগতির গাড়িও দায়ী।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো লাইসেন্স, ফিটনেস, রুট পারমিট, কম্পানি গঠন করে পরিবহন ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে দিতে হবে। সেখানে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ থাকবে সরকারের। কিন্তু পরিবহন নেতা হয়ে চাঁদাবাজি করা যাবে না বলে এটা করতে দেওয়া হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সরকারকে সাহসী হতে হবে। না হলে সড়কের নৈরাজ্য থেকেই যাবে। আবারও হয়তো কোনো সময় সড়ক দুর্ঘটনার জন্য আন্দোলন হবে। এই সম্ভাবনাকে শেষ করতে হলে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে সাহসের সঙ্গে।

শ্রুতলিখন : পার্থ সারথি দাস



মন্তব্য