kalerkantho


গণসংবর্ধনার জবাবে শেখ হাসিনা

এ মণিহার আমায় নাহি সাজে

বিশেষ প্রতিনিধি   

২২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



এ মণিহার আমায় নাহি সাজে

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গতকাল আওয়ামী লীগ আয়োজিত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জনতার উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : পিআইডি

নিজেকে দেওয়া গণসংবর্ধনা বাংলাদেশের মানুষকে উৎসর্গ করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল শনিবার রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেওয়া গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের কলি উদ্ধৃত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে...।’ তিনি বলেন, ‘জনগণ কতটুকু পেল সেটাই আমার কাছে সব থেকে বিবেচ্য বিষয়। এর বাইরে আমার আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই।’ তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘নৌকা ঠেকাতে হবে কেন? শ্রাবণ শেষে বন্যা হবে, আপনাদের নৌকায় চড়তেই হবে।’

দেশকে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীতকরণ, মহাকাশ বিজয়, গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ও কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, আসানসোল থেকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি অর্জন করায় আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এই গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। নিজ দল আওয়ামী লীগ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার উদ্দেশে একটি অভিনন্দনপত্র পড়ে শোনান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বত্তৃদ্ধতায় বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর প্রতিকূল ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পথচলা ও আওয়ামী লীগকে গোছানো এবং বাংলার মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিজের পথচলার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘জাতির পিতা বলেছিলেন, বাংলার মানুষ যেন অন্ন পায়, বস্ত্র পায়, বাসস্থান পায়, শিক্ষা পায়, উন্নত জীবন পায়—জাতির পিতার সেই স্বপ্ন পূরণ করাই আমার লক্ষ্য।’ তিনি বলেন, ‘এই সংবর্ধনা আমি উৎসর্গ করছি বাংলার জনগণকে, বাংলার মানুষকে।’

অনুষ্ঠানের মধ্যমণি ও প্রধান অতিথি শেখ হাসিনার বত্তৃদ্ধতার আগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কণ্ঠশিল্পী ও সংসদ সদস্য মমতাজের গান এবং সাদিয়া ইসলাম মৌয়ের নির্দেশনায় নৃত্যনাট্যে ছিল বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বের প্রশংসায়।

গতকাল বিকেলে এই অনুষ্ঠান হলেও এতে যোগ দিতে দুপুর থেকে বৃষ্টি উপেক্ষা করে জড়ো হতে থাকে ক্ষমতাসীন দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। বিকেল সাড়ে ৩টায় অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এ সময় স্লোগানে স্লোগানে তাঁকে স্বাগত জানায় নেতাকর্মী-সমর্থকরা। রং-বেরঙের ক্যাপ ও টি-শার্ট পরে এই সমাবেশে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। ঢাক-ঢোল, বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে মিছিল নিয়ে আসে অনেকে। ইংরেজি বর্ণ ‘এল’ আকৃতির বিশাল মঞ্চের সামনে ২০ হাজার চেয়ার বসানো হয়। এতে স্থান সংকুুলান না হওয়ায় অনেকেই বসে বাইরে।

গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠান ঘিরে মৎস্য ভবন থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের রমনার ভিআইপি গেট পর্যন্ত ৪০টি তোরণ তৈরি করা হয়। তোরণগুলো ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ও দেশের বিভিন্ন উন্নয়নের ছবি দিয়ে সাজানো। এ ছাড়া উদ্যানের মঞ্চের সামনের দিকে পশ্চিম পাশে করা হয় চিত্র প্রদর্শনী, যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন-অর্জনসহ তাঁর অসংখ্য ছবি আঁকা ছিল।

 ‘৫ ঘণ্টা ঘুমাই’ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা তিনি ঘুমান। বাকি সময় এ দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য কাজ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘একটা মানুষের তো ২৪ ঘণ্টা সময়। এই ২৪ ঘণ্টা থেকে আমি মাত্র পাঁচ ঘণ্টা নিই আমার ঘুমানোর জন্য। এ ছাড়া প্রতিটি মুহূর্ত আমি কাজ করি দেশের মানুষের জন্য, দেশের উন্নয়নের জন্য। এর বাইরে আমার আর কোনো কাজ নেই। আমি কোনো উৎসবে যাই না। আমি কোথাও যাই না, কিচ্ছু করি না। সারাক্ষণ আমার একটাই চিন্তা, আমার দেশের উন্নয়ন, দেশের মানুষের উন্নয়ন। সারাক্ষণ চেষ্টা করি, কোথায় কোন মানুষটা কী অবস্থায় আছে, তার খোঁজখবর রাখতে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বলেছিলেন, বাংলাদেশ হবে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড। ২০৪১ সালে আমরা সেই বাংলাদেশকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলব। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘শুধু একটা জিনিস দেখতে চাই, এই বাংলাদেশ ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে উঠবে। জাতির পিতার সোনার বাংলাদেশ অবশ্যই আমরা গড়ে তুলব। এই এগিয়ে চলার পথ আমরা যেন অব্যাহত রাখতে পারি।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম শহরের মতো নাগরিক সুযোগ সুবিধা পাবে। গ্রামবাসী উন্নত জীবন ধারণ করবে। এই লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এ দেশকে আগামীতে কেমন করে উন্নত করব সেই পরিকল্পনা আমরা করছি। দেশকে নিয়ে জাতির পিতা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ব আমরা।’ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে দেশের মানুষ কিছু পায়। মানুষের অস্তিত্ব টিকে থাকে, এটা আমরা বারবার প্রমাণ করেছি।’

নৌকায় চড়তেই হবে : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দেশের মানুষ নৌকায় ভোট দিয়েছিল বলেই স্বাধীনতা পেয়েছে। নৌকায় ভোট দিয়েছিল বলেই আজ দেশে এত উন্নয়ন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। যতক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণ মানুষের জন্য কাজ করে যাব। দেশের ও মানুষের উন্নয়নে বাবা বেহেশত থেকে দেখে যেন শান্তি পান। ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তীতে উন্নত, সমৃদ্ধ দেশের উৎসব পালন করব।’

বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ২১ বছর তারা মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে। হাড্ডিসার, কঙ্কালসার দেহ দেখিয়ে বাইরে থেকে টাকা এনে তারা সেই টাকা লুটপাট করেছে, বিদেশে পাঠিয়েছে। যারা বঙ্গবন্ধুর খুনি, জিয়া তাদের বিদেশে দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছে; বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার যেন না হয় সে জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশও জারি করেছিল।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম যে ক্ষমতায় যেতে পারলে বঙ্গবন্ধুর খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করব। সেই কাজ করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশ আজ কলঙ্কমুক্ত হয়েছে।’

গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের সদস্যদের কথা স্মরণ করতেই আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। এ সময় অনুষ্ঠানস্থলের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। অনেককে চোখের পানি মুছতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘ঘরে-বাইরে অনেক আঘাত এসেছে। কিন্তু কখনো নীতি থেকে সরে দাঁড়াইনি। সব সময় নীতি-আদর্শের মধ্যে থেকেছি। যারা দলের জন্য রক্ত দিয়েছেন, আত্মত্যাগ স্বীকার করেছেন; আমি জনগণের সেবক, তাদের সেবা করেই নিজের সার্থকতা খুঁজে পাই। জাতির পিতা মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকারের জন্য কাজ করেছেন। আমি তাঁর কন্যা হিসেবে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। তাঁর স্বপ্নের উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে কাজ করে যাচ্ছি।’

পবিত্র কোরআন, বাইবেল ও ত্রিপিটক থেকে পাঠের মাধমে মূল অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। সংবর্ধনা মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও তাঁর তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ছাড়াও কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মানে দেওয়া মানপত্র পাঠ করার পর সেই মানপত্রের বাঁধাই করা একটি স্মারক তাঁর হাতে তুলে দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।



মন্তব্য