kalerkantho


বরিশাল

প্রকাশ্যে ধানের শীষে ভোট প্রার্থনা

রফিকুল ইসলাম ও আজিম হোসেন, বরিশাল   

২১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



প্রকাশ্যে ধানের শীষে ভোট প্রার্থনা

জামায়াত নেতা হলেন অ্যাডভোকেট মোয়াযযম হোসাইন হেলাল নাশকতা ও ভাঙচুরের ১৮টি মামলার আসামি। তাই দলীয় কর্মসূচি দূরের কথা, সামাজিক অনুষ্ঠানেও যেতেন না ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে। নিজেকে সব সময় আড়াল করে রাখতেন। কিন্তু গতকাল শুক্রবার তিনি বিএনপির উঠান বৈঠকে প্রকাশ্যে ভোট চাইলেন ধানের শীষে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার জন্য এই নির্বাচন। কেন্দ্রে যেতে হবে, ভোট দিতে হবে ধানের শীষে। ‘ভোট বিপ্লবের’ মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হবে। তবেই ‘দেশনেত্রী’ খালেজা জিয়া মুক্তি হবেন।

সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর হঠাৎ করেই আলোচনায় আসেন মহানগর জামায়াতের আমির মোয়াযযম হোসাইন হেলাল। নাগরিক পরিষদের ব্যানারে হঠাৎ করেই ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে ফেলেন নগর। উদ্দেশ্য—সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু বিএনপির মজিবর রহমান সরোয়ার দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় জামায়াত নেতা নির্বাচন থেকে পিছু হটেন। কারণ জামায়াতের সঙ্গে সরোয়ারের সম্পর্কটা বেশ পুরনো।

ওই সম্পর্কের সূত্র ধরেই গতকাল ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে উঠান বৈঠকে অংশ নেন হেলাল। বিএনপি নেতা শরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুর বাসভবনের সামনে বিকেলে ওই উঠান বৈঠক হয়। তাতে আরো অংশ নেন মেয়র পদপ্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, বিএনপি নেতা এ বি এম মোশাররফ হোসেন, শরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু। শতাধিক নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে তাঁরা ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে ভোট চান। ওই বৈঠক শেষে মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি জহিরউদ্দিন মোহাম্মদ বাবরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০১৩ সালে দপদপিয়া এলাকায় ট্রাকে আগুন দেওয়ার ঘটনায় করা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাফিজ আহমেদ বাবলু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিকেল ৪টার দিকে উঠান বৈঠক শুরু হয়। এর কিছু সময় পরে জামায়াতের হেলাল ভাই অংশ নেন। সভা শেষ করে দ্রুত চলে যান।’ তিনি আরো বলেন, এর আগে জামায়াত নিজস্ব কর্মীদের মধ্যে ধানের শীষের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে। এবারই জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতা প্রকাশ্যে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাইলেন। বৈঠকে জামায়াতের বেশ কিছু নেতাকর্মীও অংশ নিয়েছিল।

জামায়াত নেতা মোয়াযযম হোসাইন হেলাল বলেন, ‘শুরুতেই আমরা বলেছিলাম সরোয়ার নির্বাচন করলে জামায়াত প্রার্থী দেবে না। আমরা শুরু থেকেই ২০ দলীয় জোটের প্রার্থীকে সমথর্ন দিয়েছি। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণার দিন থেকে দলীয় নেতাকর্মীরা ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাইছে। প্রচার নিজ দলীয় কর্মীদের মধ্যে অব্যাহত রয়েছে। তাই অনেকেই ভাবতে পারে আমরা বিএনপির সঙ্গে নেই। মূলত ভোটারদের সেই ভুল ধারণা দূর করতেই আমি প্রকাশ্যে ভোট চেয়েছি। আমাদের জোট আছে, থাকবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার পাহাড়। দলীয় কর্মকাণ্ডও চালাতে পারছি না। পুলিশ আমাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে দুই ওয়ার্ডে জামায়াতের শীর্ষ দুই নেতাকে কোনো মামলা ছাড়াই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তাই কর্মীরা প্রকাশ্যে ভোট চাইতে পারছে না। কৌশলে তারা ধানের শীষের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। জামায়াতের একটি ভোটও ধানের শীষের বাইরে যাবে না। সেভাবেই কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া আছে।’

মেয়র পদপ্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক ভালো। তারা যখন রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা অবস্থায় ছিল, তখন আমি ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ রক্ষা করেছি। জামায়াত মেয়র প্রার্থী না দিয়ে তার প্রতিদান দিয়েছে। ২০ দলীয় জোট নাগরিকদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সব সময়ই ঐক্যবদ্ধ ছিল। আগামীতেও থাকবে। আমাদের ঐক্যের কারণে সাধারণ ভোটাররা ৩০ জুলাই কেন্দ্রে যাবে। কোথাও বাধা এলে কর্মীরা তা প্রতিহত করবে।’

জামায়াত স্টাইলে প্রচার বিএনপির : বৃহস্পতিবার রাত গড়িয়ে শুক্রবার সকাল ৫টায় কলিং বেলের শব্দে হঠাৎ ঘুম ভাঙে নগরীর ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আলাউদ্দিন শিকদারের। দরজা খুলে তিনি দেখেন ধানের শীষ প্রতীকের লিফলেট নিয়ে কয়েকজন লোক অপেক্ষায়। তিনি কাছে যেতেই ধানের শীষে ভোট চাইলেন তাঁরা। প্রথমে অবাক হলেও পরে আলাউদ্দিন তাঁদের কাছে জানতে চাইলেন ভোরের আলো ফোটার আগে ভোট চাইতে আসার কারণ। অনেকটা শঙ্কা প্রকাশ করেই একজন জবাব দিলেন, ‘হামলা এড়িয়ে নীরব ভোট বিপ্লবের লক্ষ্যেই এই পথ অনুসরণ।’

একই চিত্র দেখা যায় গতকাল সন্ধ্যায় নগরীর গির্জা মহল্লা এলাকায়। তবে সেখানে ছিল নারী কর্মীরা। ছয় নারী কর্মী লিফলেট হাতে এক বাসায় ঢুকে কুশল বিনিময় করেই ভোট চাইল ধানের শীষে। ওই টিমের নেতৃত্বে থাকা ৯ নম্বর ওয়ার্ড মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা মহানগর মহিলা দল বৃহস্পতিবার থেকে প্রচারণায় নেমেছি। প্রতি ওয়ার্ডে তিনটি করে টিম কাজ করছে। তবে নিজস্ব ওয়ার্ডে কোনো টিম কাজ করছে না। আর কাজ করছি সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত। কারণ আমাদের টার্গেট প্রচার করে দলীয় প্রার্থীর বিজয়। তাই হামলা-সংঘর্ষ এড়িয়ে এই পথ অবলম্বন।’

নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডেই এই পদ্ধতিতে ধানের শীষ প্রতীকে প্রচার চালাচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। পদ্ধতিটি তাদের জামায়াতের কাছ থেকে শেখা। জামায়াত নেতা মোয়াযযম হোসাইন হেলাল বৃহস্পতিবার থেকে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ শুরু করলে তাদের প্রচারের স্টাইলও বদলে যায়।

৩০ ওয়ার্ডে মহিলা দলের শতাধিক টিম : শুরুর দিকে মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান প্রচারে অনেকটা পিছিয়ে ছিলেন। কিছু পুরুষ কর্মীকে কয়েকটি ওয়ার্ডে দেখা গেলেও নারী কর্মী দেখা যায়নি তখন। তবে বৃহস্পতিবার থেকে মহিলা দলের শতাধিক টিম ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে প্রচারে নেমেছে। সন্ধ্যায় নৌকা প্রতীকের প্রচার শেষ হলে তখন ধানের শীষের প্রচার শুরু হয়। মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার শিরিন বলেন, ‘আমরা মহিলা দলকে নিয়ে বৈঠক করেছি। প্রত্যেক ওয়ার্ডে ৩-৪টি টিম ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছে। পুরো সিটিতে মহিলা দলের এক শর বেশি টিম ধানের শীষের প্রচার চালাচ্ছে। তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কৌশলে ভোট বিপ্লবের জন্য প্রচার চালাতে।’

ভোরে বিএনপি-জামায়াতের ১৫০ টিম : গত বুধবার নগর জামায়াতের আমিরের সঙ্গে বিশেষ এক বৈঠক হয় বিএনপির প্রার্থী ও নেতাদের। তখন সিদ্ধান্ত হয় জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে যৌথ প্রচার টিম করার। তখন দেড় শ টিম করা হয়, যার প্রতিটিতে দুই দলের পাঁচজন করে কর্মী কাজ করবে। এরপর বৃহস্পতিবার থেকে জামায়াতের কর্মীরা মাঠে নামে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে। শুরু হয় ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে প্রচার। তা-ও আবার জামায়াতের কৌশল অনুসারে। ফজরের নামাজ আদায় করেই প্রচারে নেমে পড়ে প্রতিটি টিম। চলে সকাল ১০টা পর্যন্ত। এরপর সংঘবদ্ধ না হয়ে যে যার মতো প্রচার চালিয়ে যায়।

লিফলেটবিহীন প্রচার : জামায়াতের কৌশল অনুসরণ করে নগরীর প্রতিটি মসজিদে প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে ভোট চাওয়া হয়। তবে যারা ভোট চায় তারা কোনো লিফলেট কিংবা স্টিকার দেয় না ভোটারদের। তারা শুধু বলে ‘যোগ্য প্রার্থী হিসেবে’ সরোয়ারকে ধানের শীষে ভোট দিতে। নামাজ শেষে মসজিদের প্রবেশদ্বারে সাধারণ মুসল্লিদের মতো অবস্থান নেয় প্রচারকারী দলের সদস্যরা। মুসল্লিরা বের হলে কৌশলে ধানের শীষে ভোট চেয়ে নেয়।

অচেনা প্রচারকারী : নগরীর ৫ নম্বর ওয়ার্ডে গতকাল প্রচার চালায় মহিলা দলের একটি টিম। ওই টিমের নেতৃত্বে ছিলেন শাহানুর বেগম। তবে তিনি ভোটার ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের। আর দায়িত্বে রয়েছেন ওই ওয়ার্ড মহিলা দলের সহসভানেত্রীর। মহিলা দলের ওই নেত্রীর সঙ্গে তাঁর ওয়ার্ডের আরো চার নেত্রী ছিলেন। এ কারণে শাহানুরকে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার কিংবা অন্য কোনো প্রার্থীর প্রচারকারীরা চেনে না। একই চিত্র দেখা যায় নগরীর ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ধানের শীষে পুরুষ কর্মীদের প্রচারে। সেখানে প্রচারে অংশ নেন ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতা মজিবুল হক। তাঁর সঙ্গে থাকা বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীরাও একই ওয়ার্ডের। ফলে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার কিংবা অন্য প্রার্থীর প্রচারক কেউই তাদের চেনে না। ওই ওয়ার্ডের ভোটার শহিদুজ্জামান সেলিম বলেন, ‘ধানের শীষের পক্ষে যারা ভোট চাইছে তাদের কাউকেই আমরা চিনিনি। তারা আমাদের ওয়ার্ডের ভোটার কিংবা বাসিন্দাও নয়।’

 



মন্তব্য