kalerkantho


সিলেট

আরিফুলের পুঁজি উন্নয়ন, কামরানের ভরসা নৌকা

হায়দার আলী ও ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট থেকে   

১৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



আরিফুলের পুঁজি উন্নয়ন, কামরানের ভরসা নৌকা

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে নির্বাচনের মাঠে দুই প্রার্থীকে নিয়ে আলোচনায় নগরবাসী। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও নৌকার মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সদ্য সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে ঘিরেই চলছে সব হিসাব-নিকাশ। দুই প্রার্থীর পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে গেছে নগরের অলিগলি। নিজ দলের প্রার্থীর পক্ষে কর্মী-সমর্থকরাও বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে ভোট চাইতে। দুই প্রার্থীর মধ্যে কে এগিয়ে তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। নগরবাসী মনে করছে, আরিফুলের উন্নয়ন আর কামরানের নৌকা প্রতীকই জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।

নগরের রাস্তা প্রশস্তকরণ, জলাবদ্ধতা দূরীকরণসহ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো এগিয়ে রাখছে আরিফকে। আবার সরকারের সামগ্রিক উন্নয়ন ও নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করায় এবার বাড়তি সুবিধা পাবেন কামরান। একদিকে উন্নয়ন, অন্যদিকে প্রতীক, এ দুইয়ে জয়-পরাজয়ের হিসাব কষছে দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটাররা।

নগরের সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের শুরু থেকেই টানা দুইবারের মেয়র ছিলেন বদরউদ্দিন আহমদ কামরান।

 জনপ্রিয়তা ও সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে তাঁর আলাদা সুনাম থাকলেও নগরীর উন্নয়নে ছিলেন পিছিয়ে। মানুষের চাহিদার ক্ষেত্রে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেননি। যার কারণেই নগরবাসী ২০১৩ সালে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল কামরানের দিক থেকে। আস্থা রেখেছিল বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আরিফুল হকে। ৩৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন আরিফ। সেই নির্বাচনে আরিফুল হক বিজয়ী হওয়ার পর সিলেট-১ আসনের এমপি ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের আশীর্বাদ নিয়ে নগরের উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। নগরের অন্যতম সমস্যা জলাবদ্ধতা, যানজট ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা, রাস্তা প্রশস্তকরণ, খাল ও ছড়া দখলমুক্ত করাসহ বেশ কিছু উন্নয়নকাজ করেন আরিফুল হক।

নগরবাসীর ভোগান্তি দূরীকরণে করা এসব দৃশ্যমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভোটের মাঠে আরিফের পক্ষে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক উন্নয়ন এবং বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ব্যক্তি জনপ্রিয়তা কামরানের ভোটে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সারা দেশের মতো সিলেটের ভোটের মাঠে নৌকার জনপ্রিয়তা থাকায় এর সুফল পেতে পারেন মেয়র প্রার্থী কামরান। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের একক প্রার্থিতা থাকায় এবং ২০ দলীয় জোটে তিন প্রার্থী হওয়ায় কিছুটা বাড়তি সুবিধা পাবেন কামরান। নগরবাসী মনে করছে, আরিফুলের উন্নয়ন এবং কামরানের নৌকা প্রতীকই জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এবার মেয়র পদে লড়ছেন সাতজন প্রার্থী। তাঁদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবং সংসদের বাইরে থাকা সবচেয়ে বড় দল বিএনপির প্রার্থী ছাড়াও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী বদরুজ্জামান সেলিম, নাগরিক ফোরামের ব্যানারে জামায়াতে ইসলামীর মহানগর আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সিপিবি-বাসদের প্রার্থী আবু জাফর, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ডা. মুয়াজ্জেম হোসেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. এহসানুল হক তাহের।

সরেজমিন : গতকাল মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টা। নগরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কুয়ারপাড় জামালের দোকান। সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থী রুহেনা খানম মুক্তার পক্ষে জিপ গাড়ি প্রতীকে ভোট চাচ্ছেন আসমা খাতুন। নিজেকে আওয়ামী সমর্থক দাবি করলেও শুধু কাউন্সিলর প্রার্থীর জন্য কেন ভোট চাচ্ছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কামরান ভাই ভালো, সে এমনিতেই ভোট পাইব। এ জন্য নৌকার প্রার্থী নিয়ে আমাদের চিন্তা করার সময় নেই।’

পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা কাজীর বাজার এলাকার ভোটার শুক্কুর মিয়া বলেন, ‘ভালা লোক দিয়া কিতা করতাম, যদি এলাকার উন্নয়ন না অয়। যে উন্নয়ন করছে তারেই ভোট দিমু।’ ‘কে উন্নয়ন করেছে?’ এমন প্রশ্নের জবাবে পাল্টা প্রশ্ন রেখে শুক্কুর মিয়া বলেন, ‘কোন রাস্তাবায় আইছইন? দেখছইন না রাস্তা কী ফকফকা। রাস্তা বড় অইছে, জলাবদ্ধতা কমছে, মানুষ শান্তিতে বসবাস করছে। আমরার এলাকার এত এত কাজ করছে আরিফ, হেই তারেই আবার ভোট দিমু।’ পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা মিরাজ মিয়া বলেন, ‘তুমি ভোট দিলেই আরিফ পাস অইবো? হের দলেই কোন্দল আছে, বিদ্রোহী প্রার্থী আছে। জামায়াত জোটের প্রার্থী অইছে, ভোট কাটকাটি হইলে নৌকার প্রার্থী কামরানই জয়ী অইবো।’ আওয়ামী লীগের সমর্থক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সারা দেশের উন্নয়ন করছে নৌকা, সেই নৌকার প্রার্থী কামরান। প্রতীক দেখেই মানুষ ভোট দেবে। সেই হিসাবে কামরানই এগিয়ে আছেন।’

নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকায় জহুরুলাল সরকারের চায়ের দোকান। রাস্তার পাশে রিকশা রেখে ১০ থেকে ১২ জন রিকশাচালক চা খাচ্ছেন। নির্বাচনের কথা বলতেই পঞ্চাশোর্ধ্ব আলীম উদ্দিন বলেন, ‘রাস্তাঘাট, ড্রেনসহ আমাদের এলাকার উন্নয়ন যে করছে, তারেই ভোট দিমু।’ ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ঘাসিটুলা এলাকার হাসিম মিয়া ও কাজল শাহ্ বলেন, ‘জামায়াত ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকলে আরিফুলের বিজয় নিশ্চিত আছিল। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই অইব।’ মির্জাজাঙ্গাল এলাকার সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ক্ষমতায় ছিল সরকার। বিএনপির আরিফ ছিলেন মেয়র। শেখ হাসিনা উন্নয়ন চান, আরিফও উন্নয়ন করেছেন সিলেটে। আরিফকে সহযোগিতা করেছেন আমাদের এলাকার মন্ত্রী মুহিত সাহেব। আওয়ামী লীগের টাকায় আরিফুল উন্নয়ন করেছেন, এখন সে কারণে আওয়ামী লীগের প্রার্থীই বিপাকে পড়েছেন।’

১৩ নম্বর ওয়ার্ডের মির্জাজাঙ্গাল এলাকার বাবুল দেব বলেন, ‘নৌকা বুঝি না, ধানের শীষও বুঝি না। যে উন্নয়ন করব তারেই ভোট দিমু।’ পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা রিকশাচালক ইমরান মিয়া বলেন, ‘যে কাজ পনেরো বছরেও হয় নাই সে কাজ আরিফ আড়াই বছরে পারল কিভাবে?’ ১২ নম্বর ওয়ার্ডের টিকরপাড়ার বাদশা আহমদ বলেন, ‘সুষ্ঠু ভোট নিয়ে আমরা চিন্তিত। সিলেটের মানুষ শান্তিপ্রিয়। আমরা চাই সুষ্ঠু ভোট হোক। যিনি বিজয়ী হন তিনি ভোটের মাধ্যমে হন এটা আমরা চাই।’

একই ওয়ার্ডের কুয়ারপাড়া এলাকার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আরিফ নিজ দলেই বেকায়দায় আছেন। একদিকে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী, আরেকদিকে ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াতের প্রার্থীর শক্ত অবস্থান। দুই প্রার্থীর ভোট কাটাকাটি হলে সুবিধা পাবেন কামরান।’

নগরের লামাবাজার এলাকার ব্যবসায়ী আবুল হাশেম বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ভেতরেও বিরোধ আছে। ঐক্যবদ্ধভাবে নামতে পারলে তবে সুযোগ আছে। তা না হলে বিপদ আছে।’ ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হাওলদারপাড়ার কাঁচামাল ব্যবসায়ী সনু দাস, ছমির মিয়া, কুনুর মিয়া, সোলেমান, শাহাদাতসহ সবারই এক কথা, ‘যিনি নগরের উন্নয়ন করবেন তাঁকেই ভোট দেব।’ পাশের গোয়াবাড়ি এলাকার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা বিজয় প্রসাদ ঘোষ বলেন, ‘কামরান অবশ্যই বিজয়ী হবেন। তিনি ভালো মানুষ, নগরের মানুষের বিপদে আপদে তিনি পাশে থাকেন।’

সরেজমিনে নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, ভোটারদের আগ্রহ কামরান-আরিফকে ঘিরে। যেহেতু দলীয় প্রতীকে এবার প্রথম সিটি নির্বাচন হচ্ছে, তাই সরকারের ইমেজের কারণে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগকে শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারলে কামরান সফল হতে পারবেন। এদিক থেকে খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থায় নেই আরিফুল হক চৌধুরী। দলের বিদ্রোহী প্রার্থী নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম এখনো অনড় অবস্থানে। কেন্দ্র থেকে সেলিমকে মাঠ থেকে সরাতে ব্যর্থ হয়ে বহিষ্কারও করা হয়। আর সেলিমের পাশাপাশি ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াতের মহানগর আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়েরও স্বতন্ত্র প্রার্থী, এই দুই প্রার্থী ভাগ বসাবেন আরিফুলের ভোটে। এ ছাড়া বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের এখনো আন্তরিকভাবে আরিফের পক্ষে কাজ করতে দেখা যায়নি। তবে শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রতীক ছাপিয়ে যদি ব্যক্তি ইমেজ আর নগরীর উন্নয়নকে ভোটাররা প্রাধান্য দেয়, তাহলে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবেন আরিফ। নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রশস্ত করা, জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগ, নগরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, ছড়া-খাল উদ্ধারসহ ফুটপাত দলমুক্ত করতে তাঁর উদ্যোগ নগরবাসীর নজর কেড়েছে। তাই শেষ মুহৃর্তে ব্যক্তি ইমেজ আর উন্নয়ন প্রাধান্য পেলে এগিয়ে থাকবেন আরিফ।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদউদ্দিন আহমেদও কালের কণ্ঠকে বললেন একই কথা, ‘মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের ব্যক্তি ইমেজকে নয়, দলের প্রতীককেই গুরুত্ব দিচ্ছে তৃণমূল নেতাকর্মীরা। প্রতীককে প্রধান্য দিয়ে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে চলছে প্রচারণা। সেভাবেই দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি আমাদের প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন।’

বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক সম্পর্কে আসাদউদ্দিন বলেন, ‘আমরা প্রতীকে গুরুত্ব দিলেও তারা ব্যক্তি ইমেজকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। আমাদের সরকারের টাকায় উন্নয়ন করেছেন নগরীতে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। সে জন্যই তারা উন্নয়নকেই প্রধান্য দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে।’

সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিলেটে দুই প্রার্থীর মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণের সুযোগ আছে। কারণ বদরউদ্দিন আহমদ কামরান একবার পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন এবং দুইবার সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন এবং তাঁর দলও ক্ষমতায় ছিল। তিনি প্রায় ১৭ বছর একটানা দায়িত্বে ছিলেন। নগরীর জন্য তিনি কী করেছেন সেটা নগরবাসী জানে। কিন্তু আমাদের মেয়র তিন বছর জেল খেটেও নগরীর যে উন্নয়ন করেছেন, তা নগরবাসী দেখেছে। উন্নয়ন আর ব্যক্তি ইমেজেই আমাদের প্রার্থী এগিয়ে। মানুষ এসব দেখেই বিপুল ভোটে বিজয়ী করবে।’

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদউদ্দিন আহমেদ ও সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদই নন, উভয় দলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীই প্রতীক আর উন্নয়নকেই প্রধান্য দিয়ে নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে নগরীর অলিগলিতে।



মন্তব্য