kalerkantho


ক্রোয়েশিয়ার দুঃখে যেন সমব্যথী প্রকৃতিও

মস্কো থেকে প্রতিনিধি   

১৭ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



ক্রোয়েশিয়ার দুঃখে যেন সমব্যথী প্রকৃতিও

ততক্ষণে ফ্রান্সের বুনো উদ্যাপন থিতিয়ে এসেছে খানিকটা। ক্রোয়েশিয়ার স্তব্ধতার ঘোর কাটেনি যদিও। বিশ্বকাপ ট্রফি চলে এসেছে সাজানো মঞ্চে। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে রাশিয়া-ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়ার তিন রাষ্ট্রপ্রধান ভ্লাদিমির পুতিন, এমানুয়েল ম্যাঁকো, কলিন্দা গ্রাবার-কিতারোভিচও উপস্থিত। তখনই হঠাৎ আকাশ ভেঙে লুঝনিকি ভেসে যায় জলধারায়। কী বৃষ্টি! কী বৃষ্টি!

যেন ক্রোয়েশিয়ার দুঃখের সমব্যথী হয়েছে প্রকৃতিও!

ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট তাঁর ফুটবলপ্রেম দিয়ে এরই মধ্যে দেশ ছাড়িয়ে ফুটবলবিশ্বেরও তুমুল জনপ্রিয়। বিশ্বকাপ ফাইনালে দলের হারের পর বিমর্ষ হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু সে অনুভূতি চাপা দিয়ে ক্রোয়াটদের লাল-সাদা জার্সিতে হাসিমুখে পুরস্কার মঞ্চে যান তিনি; ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের হাতে হাত রেখে। এরপর রানার্স-আপের পদক নিতে আসা লুকা মডরিচ, ইভান পেরিসিচ, ইভান রাকিটিচকে জড়িয়ে ধরে কিভাবেই না সান্ত্বনা দেন গ্রাবার-কিতারোভিচ!

বিশ্বকাপজুড়ে যেমন খেলেছে, যেমন লড়াই করেছে ফাইনালে—তাতে পুরো ফুটবলবিশ্বেরই সান্ত্বনা পাওয়ার দাবিদার ক্রোয়েশিয়া।

ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে এসে কোচ জ্লাতকো দালিচ প্রথমেই অভিনন্দন জানান ফ্রান্সকে; এরপর নিজ দলকে নিয়ে গর্বের ঝিলিক তাঁর কণ্ঠে, ‘প্রথমত আমি ফ্রান্সকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। বিশ্বকাপ জিততে না পারায় আমরা অবশ্যই বিমর্ষ। আবার একই সঙ্গে নিজেদের নিয়ে গর্বিতও।’ সেই গর্বের বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দেন তিনি, “ছেলেদের আমি বলেছি, ‘তোমরা মাথা উঁচু রাখো। কারণ নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে লড়েছ তোমরা। টুর্নামেন্টে যেমনটা খেলেছ, তা নিয়ে গর্বিত হও। তোমাদের মন খারাপ হতে পারে; তবে মনে রাখবে, কখনো কখনো হারতেও হয়।’ বিশ্বকাপের আগের ম্যাচগুলোতে জয়ের গৌরব যেমন ছিল, তেমনি এই হারের পরও তা মর্যাদার সঙ্গে মেনে নিচ্ছি। আর এটি তো ঠিক, বিশ্বকাপ শুরুর আগে কেউ যদি বলত ক্রোয়েশিয়া রানার্সআপ হবে—আমরা খুশি মনে তা মেনে নিতাম।”

ফাইনালে আর্জেন্টাইন রেফারি নেস্তর পিতানার পেনাল্টি দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অবশ্য খুশি মনে মেনে নিচ্ছেন না দালিচ। তবে এ নিয়ে কোনো শোরগোল তুলতেও রাজি নন ক্রোয়েশিয়ার কোচ, ‘আমি রেফারিং নিয়ে কখনোই কথা বলতে চাই না। তবে এটি কিছু কিছু বলব। তাই বলে ভাববেন না আমি তাঁকে দোষারোপ করছি। আমরা ভালো খেলছিলাম। এরপর ওই পেনাল্টি আমাদের মনোবলে বড় ধাক্কা দেয়। আমার মনে হয়েছে, বিশ্বকাপ ফাইনালে এমন পেনাল্টি হয় না। রেফারির সিদ্ধান্ত আমরা সম্মান করি। উনি ভেবেছেন এটি পেনাল্টি; তাই দিয়েছেন। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, এটি পেনাল্টি নয়।’ পাশাপাশি নিজেদেরও কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন। ভাগ্যের সহায়তা পাননি বলেও আক্ষেপ দালিচের, ‘ফরাসিরা তাদের ট্যাকটিকস দিয়ে আমাদের চমকে দিতে পারেনি। আমরাই বরং দুটো সফট গোল খেয়ে যাই। বাকি দুই গোলের একটি আত্মঘাতী এবং আরেকটি পেনাল্টি থেকে। আসলে টুর্নামেন্টে যে ভাগ্য আমাদের পাশে ছিল সব সময়, তা ফাইনালে ছিল না। আর চার গোল হজম করার পর তো ম্যাচ জয়ের আশা করা যায় না।’

রূপকথার মতো ফাইনালে ওঠার তৃপ্তি-গর্ব ক্রোয়েশিয়ার সবার। সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করায় অনুশোচনার কিছু দেখছেন না কেউ। লুকা মডরিচ যেমনটা বলেছেন, ‘আমাদের কোনো অনুশোচনা নেই। কারণ ম্যাচের বেশির ভাগ সময় আধিপত্য ছিল ক্রোয়েশিয়ার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছু উদ্ভট গোল খেলাটি নিয়ে যায় ফ্রান্সের দিকে।’ ইভান রাকিটিচের কণ্ঠেও এর প্রতিধ্বনি, ‘প্রথমার্ধে আমরা খেলেছি ওদের চেয়ে ভালো; অনেক বেশি আক্রমণ করেছি। কিন্তু আজ রাতে আমরা ছিলাম দুর্ভাগা। ওরা চার গোল করেছে গোলে তিনটি শট থেকে। তবু আমি ফ্রান্সকে অভিনন্দন জানাই।’ ফুল ব্যাক সিমে ভারসালিকোও স্মরণীয় এই অভিযাত্রা নিয়ে তৃপ্ত, ‘আজ আমরা হূদয় দিয়ে খেলেছি। সে জন্য হারেও কোনো অনুশোচনা নেই। আমাদের সমর্থকরা সেটি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। এই বিশ্বকাপে আমরা যা করেছি, যা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

ভুল বলেননি খেলোয়াড়রা। সে কারণেই তো কোচ দালিচ অভিনন্দন জানাচ্ছেন শিষ্যদের, ‘খেলোয়াড়দের আমি অভিনন্দন জানাই। আজ ওরা সম্ভবত টুর্নামেন্টে সেরা ম্যাচ খেলেছে। ম্যাচের অনেকটা সময় নিয়ন্ত্রণ ছিল আমাদের কাছে কিন্তু গোল খেয়ে যাই বাজে সময়ে। ফ্রান্সের মতো এমন শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ভুল করার কোনো সুযোগ নেই। তবু ১-৪ গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায়ও আমি ভাবিনি, খেলা শেষ। আমাদের ছেলেরা চেষ্টা চালিয়ে গেছে। কিন্তু পারিনি। এটাই জীবন। তবে সব মিলিয়ে দুর্দান্ত এক বিশ্বকাপ খেলেছে ক্রোয়েশিয়া; দেখিয়েছে তাদের শক্তি। আমি খেলোয়াড়দের নিয়ে গর্বিত। দল নিয়ে গর্বিত। দেশ দিয়ে গর্বিত।’

লুঝনিকির ঝুম বৃষ্টিতে ক্রোয়েশিয়ার জন্য বিষণ্নতার পাশাপাশি ওই গর্বের ছটাও ছিল নিশ্চয়ই।



মন্তব্য