kalerkantho

নায়ক পেরিশিচ

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



নায়ক পেরিশিচ

ক্রোয়েশিয়াকে ফাইনালে নেওয়ার দুই নায়ক মান্দজুকিচ ও পেরিশিচ। ছবি : এএফপি

লুকা মডরিচ শক্তি, ইভান রাকিটিচ নির্ভরতা। কিন্তু যখনই বলা হবে লড়াইয়ের কথা, তখন নিতেই হবে ইভান পেরিশিচের নাম। পরশু রাতেও ক্রোয়েশিয়া লড়ছিল। ১-০তে পিছিয়ে পড়ে, আগের দুই ম্যাচের ক্লান্তি সঙ্গী করে, সেখান থেকে তাদের সত্যিকার লড়াইয়ে ফেরালেন পেরিশিচই। ম্যাচে সমতা আনলেন, পুরো দলকে জাগালেন আবার নতুন লক্ষ্যে ঝাঁপাতে।

সেই ক্রোয়েশিয়ার কাছেই মূলত হেরে গেছে ইংল্যান্ড। এর আগ পর্যন্ত তারা ম্যাচে ছিল ভালোভাবেই। কিন্তু সমতায় ফিরে ক্রোয়াটরা যেমন ছুটলেন একেকটা স্ফুলিঙ্গ হয়ে, হ্যারি কেইনরা সেখানে ক্রমেই গেলেন ঝিমিয়ে। বাঁ পায়ের ফ্লিকে করা পেরিশিচের নিজের অবিশ্বাস্য গোলটি বাদ দিন। অতিরিক্ত সময়ে জয়ের নেশায় থাকা ক্রোয়াটদের দ্বিতীয় গোলটারও তো বদ্ধ মুখটা খুলে দিয়েছেন তিনিই। পিভারিচের ক্রস কাইল ওয়াকার শূন্যে তুলে দিলে টুর্নামেন্টে ইংলিশদের অন্যতম সেরা পারফরমার কিয়েরন ট্রিপিয়ারের সঙ্গে একটা এরিয়াল লড়াইয়ে নামেন

 তিনি। পেরিসিচের শক্তি, অদম্য মনোভাবের কাছেই মূলত হার হয়েছে ইংলিশ উইঙ্গারের। পেরিসিচ ব্যাক হেডারে বলটা বক্সের ফাঁকা জায়গায় ফেলতেই তো গোলের ওই হিরণ্ময় মুহূর্তটা তৈরি হয়ে যায়। কিংবা অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধেই মান্দজুকিচকে যে দুর্ধর্ষ ক্রসটা ছেড়েছিলেন তিনি। জর্ডান পিকফোর্ড বাধা হয়ে না দাঁড়ালে তখনই তো ২-১ হয়ে যায়।

১-০তে পিছিয়ে পড়াটা ক্রোয়াটদের জন্য ছিল দুঃস্বপ্নের। নক আউটে আগের দুটি ম্যাচেই যে পিছিয়ে পড়ে ফেরার লড়াই করতে হয়েছে তাদের। তাতে শেষ হাসি হাসলেও অনেকটা জীবনীশক্তি তো হারাতে হয়েছে তাদের। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আবার সে পরীক্ষায় নামা ক্রোয়াটদের প্রয়োজন ছিল নতুন সঞ্জীবনীর, যা দিয়েছেন পেরিসিচ। ‘বেঞ্চে বসে থাকলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে’—বলেন যিনি, তাঁকে নিয়ে তো বাজি ধরাই যায়। বাছাই পর্বে ক্রোয়েশিয়ার ১১টি ম্যাচেই শুরুর একাদশে ছিলেন তিনি, এক মুহূর্তের জন্যও বেঞ্চে যাননি। গোল করেছেন গ্রিসের বিপক্ষে জেতা শেষ প্লে-অফেও।

লুঝনিকিতেও পরশু রাতে ক্রমেই আঁধারে ডুবতে থাকা ক্রোয়াটদের আলোর রেখা দেখিয়েছেন তিনি। ডানদিক থেকে ভ্রাসাইকোর ক্রসটা কানেক্ট করতে না পারলে কেউ তাঁকে দায় দিত না। ইংলিশ ডিফেন্ডারের প্রহরা ছিল সামনে। কিন্তু এখানেও অদম্য মনোভাব তাঁকে পথ দেখিয়েছে। ভেসে আসা বলটাতে হেডেই যেতেন হয়তো বেশির ভাগ স্ট্রাইকার। কিন্তু পেরিসিচ অন্য জাতের। নিচু হয়ে আসা ওয়াকারের প্রায় মাথার ওপর থেকে বাঁ পায়ের অমন ফ্লিকে তিনি বল জালে পাঠাবেন, কে অনুমান করতে পেরেছে! ’৯৮-এ লিলিয়ান থুরামের জোড়া গোলে ক্রোয়াটদের যখন স্বপ্নভঙ্গ হয়, তখন পেরিসিচ কিশোর। মায়ের সঙ্গেই বেশির ভাগ সময় স্মৃতিচারণা হয় তাঁর সেই ফাইনালের। পরশু ম্যাচ শেষেও বলছিলেন, ’৯৮-এর ফাইনাল নিয়ে কদিন আগেও মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁর একটাই স্বপ্ন, তা হলো ক্রোয়েশিয়াকে ফাইনালে দেখা, আজ সেই স্বপ্নটা পূরণ হলো।’ অদম্য পেরিসিচের শক্তিটা তাই শুধু তাঁর টেকনিকে নয়, মনের জোর আর স্বপ্নই তাঁকে টেনে নিয়ে চলে।

তবু যদি শুধু ফুটবলীয় সামর্থ্যের আলাপ হয় সেখানেও পেরিসিচ জ্লাতকো দালিচের বড় সম্পদ। পরশু রাতে দারুণ সব সোলো রানে মুহুর্মুহু তাঁর বক্সে ঢুকে পড়াই ইংলিশদের এলোমেলো করেছে সবচেয়ে বেশি। পুরো ম্যাচে তাঁর সাতটি শট। দুই দল মিলিয়েও কারো তিনটির বেশি শট ছিল না এদিন। ক্রোয়েশিয়া দলেও বল পায়ে এক ব্রোজোভিচ ছাড়া তাঁর বেশি দৌড়াননি কেউ। পেরিসিচের ছোটাও শুধু ছোটা নয়, তাঁর চেয়ে বেশি লক্ষ্যমুখী এদিন আর কে ছিল। এক গোল, এক অ্যাসিস্ট, সাত শটই বলছে সব। ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাস গড়ার দিনে ম্যাচ সেরার পুরস্কারেও তাঁকে ছাড়া আর কাউকে ভাবা যায়নি। তবে ফাইনালের টিকিটের চেয়ে বড় পুরস্কার তো আর নেই। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন একদিন বিশ্বকাপে জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোলটা করবেন, পেরিসিচ এদিন তেমনই এক গোল শুধু নয়, তাঁর সমগ্র দিয়েই টেনেছেন যে ক্রোয়েশিয়াকে। ফিফাডটকম

 



মন্তব্য