kalerkantho


কার রূপকথা পাবে পূর্ণতা

নোমান মোহাম্মদ মস্কো থেকে   

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



কার রূপকথা পাবে পূর্ণতা

ইভানা ব্রালিচ-মাজুরানিচকে কে চেনেন! এই লেখকই ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় রূপকথার লেখক। মৃত্যুর ৮০ বছর পরও। কিন্তু এত দিন পর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী যে দাঁড়িয়ে গেছে! ক্রোয়েশিয়া ফুটবল দলের বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠা যে সে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রূপকথা! আর শিরোপা জিতলে তো কথাই নেই!

ফ্রান্সেরটি হয়তো সবচেয়ে বড় রূপকথা বলা যাবে না। বিশ্বকাপ জিতেছে তারা ২০ বছর আগে। ১৮ বছর আগে ইউরোও। তবু রূপকথার নতুন পর্ব তো লেখা যায়। ফাইনালে ওঠার পর সে লক্ষ্যই দলের। কাল মস্কোভস্কায়া অবলাস্ট কমপ্লেক্সে সংবাদ সম্মেলনে সে কথাই বলে যান ফ্রান্সের পল পগবা। প্রতি বিশ্বকাপ জয়ের জন্য জাতীয় দলের জার্সিতে যে একটি করে তারকা সংযুক্ত হয়, সেদিকে ইঙ্গিত করে এই মিডফিল্ডারের কথা, ‘ক্রোয়েশিয়ার জার্সিতে কোনো তারা নেই; তারা একটি চাইবে। যেমনটা চাই আমরাও। আমাদের জার্সিতে এক তারকা রয়েছে; কিন্তু তা আমি জিতিনি। এখন আমাদের দলের সবাই নিজেরা তারকা জিততে চাই। একই সঙ্গে জানি, এটি হবে ভীষণ কঠিন ম্যাচ। বিশ্বকাপ ফাইনাল তো তেমনই হয়।’

ফাইনালের প্রতিপক্ষ যখন ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়া, ফেভারিটের পাল্লা ফরাসিদের দিকেই ঝুঁকে। বছর দুয়েক আগে ইউরোতে ফ্রান্স-পর্তুগাল ফাইনালেও যেমনটা ছিল। সেখানে অতিরিক্ত সময়ের গোলে জিতে যায় পর্তুগিজরা। সেখানে নিজেদের ভুলটা বুঝতে পারছেন পগবা, ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার প্রত্যয়ও ঝরেছে তাই, ‘মিথ্যে বলব না, ইউরোর ফাইনালে উঠেই ভেবেছিলাম শিরোপা জিতে গেছি। জার্মানিকে হারানোর পর নিজেরাই বলাবলি করছিলাম যে আমরা ট্রফি জিতে গেছি। বিশ্বকাপ ফাইনালে একই ভুল আর করব না। এই ম্যাচ খেলতে নামব ভিন্ন মানসিকতা নিয়ে।’ ফাইনালে তাই নিজেদের ফেভারিটও ভাবছেন না তিনি, ‘ফাইনালে আমি নিজেদের ফেভারিট ভাবি না। আমরা এক দল হিসেবে খেলতে পারব কি না—এ নিয়ে বিশ্বকাপের শুরুতে যে অনেকের অনাস্থা ছিল, তা ভুলে যাইনি। আর আমরা তো এখনো কিছু জিতিনি।’

নক আউট পর্বের তিনটি ম্যাচই ক্রোয়েশিয়া খেলেছে ১২০ মিনিট করে। ফাইনালে ক্লান্তি তাদের কাবু করতে পারে বলে বাতাসে যে তত্ত্ব, তাতে পাত্তা দিচ্ছেন না পগবা, ‘আমরা ওসব নিয়ে মোটেই ভাবছি

না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কঠিন এক ম্যাচ খেলেছে ক্রোয়েশিয়া। কখনোই হাল ছেড়ে দেয়নি। ০-১ গোলে পিছিয়ে থাকার পর ওভাবে জেতা সহজ কথা নয়। এখন আমাদের দুটো দলের সামনে একটি কাপ। ওরা আমাদের চেয়ে ৯০ মিনিট বেশি খেলেছে বলে সেটি ক্রোয়েশিয়াকে পিছিয়ে রাখবে কি না জানি না। নাকি এটিতে ওরা জেতার জন্য আরো উদ্দীপিত থাকবে।’ মডরিচের জন্য আলাদা পরিকল্পনা আছে কি না—এ নিয়ে হাসি পগবার, ‘ক্রোয়েশিয়ার তো শুধু মডরিচ নেই, রাকিটিচ, পেরিসিচ, এমনকি ডিফেন্ডারদের কথাও বলতে হবে। মডরিচের জন্য আলাদা পরিকল্পনা থাকবে বলে মনে হয় না। প্রত্যেকের জন্যই পরিকল্পনা থাকবে আমাদের।’

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পরশু ক্রোয়েশিয়ার রূপকথার জয়ে জয়সূচক গোলদাতা মারিও মান্দজুকিচ। তবে পুরো ম্যাচে অসাধারণ খেলে নায়ক লুকা মডরিচও। দলকে ফাইনালে নিয়ে যাওয়ার পর সমালোচকদের ধুয়ে দিয়েছেন তিনি, “লোকে যা বলছিল, আমরা তা ভুল প্রমাণ করেছি। বিশেষত ইংরেজ সাংবাদিক, টেলিভিশন পণ্ডিতরা আমাদের খাটো করে দেখেছিল। আর সেটি ছিল বড় ভুল। সব কিছু আমরা পড়েছি, শুনেছি। এরপর নিজেরা বলেছি, ‘ঠিক আছে, আজ দেখব কারা আগে ক্লান্ত হয়।’ আগেই যেটি বলেছি, তাঁদের আসলে প্রতিপক্ষকে আরো সম্মান করা উচিত ছিল।” দলকে ফাইনালে তোলার গর্বও তাঁর কণ্ঠে, ‘আমরা আজ আবার দেখিয়েছি আমরা ক্লান্ত হইনি। শারীরিক, মানসিক সব দিক দিয়েই ম্যাচে আমরা কর্তৃত্ব দেখিয়েছি। আমাদের তো অতিরিক্ত সময়ে যাওয়ার আগেই জেতা উচিত ছিল। তবু ফাইনালে ওঠা সব মিলিয়েই অপূর্ব এক অর্জন; স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো ব্যাপার। অনেক বছর চেষ্টার পর আমরা ফাইনালে উঠলাম। এটি ক্রোয়েশিয়ার ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্য। নিজেদের নিয়ে আমরা তাই গর্বিত।’ এখন বিশ্বকাপ জয়ের পাখির চোখ করছেন এই মাঝমাঠের শিল্পী, ‘এটি আমার ক্যারিয়ারের সেরা সাফল্য। যদি সেরাও না হয়, অন্যতম সেরা তো বটেই। এখন চেষ্টা করব বিশ্বকাপ জয়ের জন্য।’

ক্রোয়েশিয়ায় এখন কোচ জলাতকো দালিচের জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের মূলমন্ত্রটা ম্যাচ শেষে বলেছেন তিনি, ‘আমরা জিতেছি কারণ সব বিভাগেই আমরা ইংল্যান্ডের চেয়ে ভালো খেলেছি। ওদের আমরা হেয় করিনি বরং সম্মান করেছি। বিরতির সময় খেলোয়াড়দের বলেছি, মাথা ঠাণ্ডা রেখে বল পাস দাও; মাথা গরম কোরো না। আজ আমরা নিজেদের সেরা খেলেছি। আর্জেন্টিনার চেয়েও ভালো।’ চাপহীন খেলাও জয়ের অন্যতম কারণ বলে দাবি করে ফাইনালেও সেভাবে খেলার প্রতিশ্রুতি তাঁর, ‘সেমিফাইনালের আগে ছেলেদের বলেছিলাম, তোমাদের ওপর কোনো চাপ নেই, নার্ভ নিয়ে ভেবো না, মাথা গরম কোরো না। তোমরা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছ। এ নিয়ে গর্বিত হও এবং নিজেদের খেলা উপভোগ কর। মাঠে নেমে ওরা ঠিক তাই করেছে। ফাইনালেও আমি চাই ওরা সেভাবে খেলুক।’

ফাইনালের প্রতিপক্ষ ফ্রান্স নিয়ে তাঁর প্রবল সমীহ। তবে নিজেদেরও প্রস্তুত রাখছেন দালিচ, ‘যে দল বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠে, তাদের কোনো দুর্বলতা নেই। ফ্রান্সও দারুণ সব ফুটবলারের সমন্বয়ে দুর্দান্ত দল। ওদের প্রতি আমার পূর্ণ সম্মান রয়েছে। তবে এ নিয়ে কাল আমরা ভাবব। এখন ফাইনালে উঠেছি। আজ রাতে তা উপভোগ করব। কাল থেকে শুরু করব ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচের প্রস্তুতি। আমাদের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্দান্ত এক ম্যাচ হবে এটি। সে জন্য আমরা প্রস্তুত।’

প্রস্তুত ফুটবলবিশ্বও। ক্রোয়াট রূপকথার পূর্ণতা দেখার জন্য। অথবা ফ্রান্সের ফুটবল রূপকথার নতুন অধ্যায়ের জন্য।

 



মন্তব্য