kalerkantho


বরিশাল

বর্ধিত এলাকায় বর্ধিত কষ্ট

রফিকুল ইসলাম ও আজিম হোসেন, বরিশাল   

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



বর্ধিত এলাকায় বর্ধিত কষ্ট

বাঁশের চাটাইয়ের বেড়ার ওপর টিনের ছাউনির ঝুপড়িঘর। সেখানেই বাস দিনমজুর হারুনের। একসময়ের জাগুয়া ইউনিয়ন এখন পড়েছে বরিশাল নগরের বর্ধিত এলাকা ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে। নিজের একখণ্ড জমিতে ছিল মাথা গোঁজার ঠাঁই। দিনমজুরির পাশাপাশি পরিবারের ‘ভরসা’ ছিল সরকারের ভিজিডি কার্ডের মাসে ৩০ কেজি চাল। কিন্তু জাগুয়া সিটি করপোরেশনে চলে যাওয়ার পর সেটিও বন্ধ। এখন জমি বিক্রি করে নলছিটির মগড় ইউনিয়নে চলে গেছেন হারুন।

জেহাদুল ইসলাম জেহাদ আর তাহিমা আক্তার মনা। একজনের বয়স ১১ বছর, অন্যজনের ৭। জেহাদ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী আর তাহিমা শারীরিক প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী সন্তানের বাবা পূর্ব-পশ্চিম হরিণাফুলিয়া এলাকার তৌহিদুল ইসলাম খন্দকার। তিনিও  বর্ধিত ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। পেশায় রাজমিস্ত্রির সহযোগী। প্রতিবন্ধী ভাতা পেতে কাউন্সিলরের কাছে ছুটছেন। তবুও ভাতা জোটেনি। কারণ তিনি নগরের বর্ধিত অংশের বাসিন্দা। তৌহিদুলের দাবি, রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়নে থাকলে তিনি শুধু ভাতা নয়, এর চেয়ে বেশি সুবিধা পেতেন।

বর্ধিত এলাকার বাসিন্দা হওয়ার কারণে সামাজিক নিরাপত্তার সব সুযোগ-সুবিধা হারিয়েছে অনেকেই। সিটির চেয়ে ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে থাকাকালে এসব বাসিন্দা অনেক সুবিধা পেত। এর মধ্যে প্রতি মাসে ভিজিডির-ভিজিএফের খাদ্যশস্য, বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী আর মাতৃত্বকালীন ভাতা অন্যতম। তবে সিটি করপোরেশন এলাকায় বয়স্ক, মাতৃত্বকালীন ও প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা থাকলেও বর্ধিত এলাকার বাসিন্দারা কম পাচ্ছে। বর্ধিত এলাকায় উন্নয়নের চেয়েও ভাতার বিষয়টি ভোটারদের প্রভাবিত করছে। সব রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে বর্ধিত এলাকার কথা উঠে এলেও নির্বাচনের পর তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। 

জানা গেছে, ২০০২ সালের ২৫ জুলাই পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশন হিসেবে যাত্রা শুরু করে বরিশাল নগর। ৩০টি সাধারণ আর ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ড নিয়ে এই সিটি। শুরুতে প্রায় ছয় লাখ লোকের এই নগরের আয়তন ছিল ২৫ বর্গকিলোমিটার। পরে ২০০৮ সালের পর নতুন এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে সিটি আয়তন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ বর্গকিলোমিটারে। ২৩ থেকে ৩০ নম্বর ওয়ার্ড বর্ধিত এলাকার বেশি পড়েছে। পূর্ব ও পশ্চিম হরিণাফুলিয়া, রূপাতলী, ডেফুলিয়া, কাশীপুর ও সাগরদী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব এলাকা আগে রায়পাশা-কড়াপুর, কাশীপুর ও জাগুয়া ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ২৩ থেকে ৩০ নম্বর পর্যন্ত আটটি ওয়ার্ডের মানুষ নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের দেওয়া টাকায় উন্নয়ন হচ্ছে শুধু বরিশালের মূল শহরে। বঞ্চিত ওই আটটি ওয়ার্ডের জনসংখ্যা দুই লাখের বেশি। কিন্তু এসব নাগরিকের জন্য নেই পানির সুব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, চিকিৎসাসেবা, ড্রেনেজ সিস্টেম ও সুয়ারেজ লাইন। নগরের ৫৯৩ কিলোমিটার সড়কের ২০৬ কিলোমিটারই কাঁচা। এর প্রায় পুরোটাই বর্ধিত এলাকায়। আছে ছোট-বড় বাঁশের সাঁকোও। সিটি এলাকায় প্রবেশ না করলে কোনো পানি, সড়কবাতি ও বাড়তি করের ফাঁদে পড়তে হতো না তাদের।

নগরের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এনামুল হক বাহারের দেওয়া তথ্যানুসারে, তাঁর ওয়ার্ডে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ৬৫ জন। ভাতা পাচ্ছে মাত্র ২৫ জন। অন্যদিকে ৭০০ বয়স্ক ব্যক্তির মধ্যে ৩৫০ জন ভাতা পাচ্ছে। এর বাইরে মাতৃত্ব ভাতা পাচ্ছে মাত্র ১০ জন। ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন হাওলাদার বলেন, ওয়ার্ডে জনসংখ্যা ২২ হাজারের বেশি। এর মধ্যে প্রতিবন্ধী রয়েছে ১৭৭ জন। যাদের মধ্যে ভাতা পাচ্ছে মাত্র ২২ জন। বয়স্ক ভাতার পাওয়ার যোগ্য রয়েছে ৮০০-এর বেশি। আর ভাতা পাচ্ছে ৩৭৭ জন।

২৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সিটিতে যত ধরনের বরাদ্দ আসে তা ভাগ হয় নগরকেন্দ্রিক কয়েকটি ওয়ার্ডে। আমরা বর্ধিত এলাকার কাউন্সিলররা সব বরাদ্দ কম পেয়ে থাকি। তাই সাধারণ মানুষকে তা দিতে পারি না।’ তিনি বলেন, বর্ধিত এলাকার উন্নয়ন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তবে এসব এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের বরাদ্দ দেওয়া হয় না বললেই চলে। ভোটাররা ভাতাই চাচ্ছে। 

সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘বর্ধিত এলাকাগুলোর দিকে বিশেষভাবে লক্ষ রাখার চেস্টা করেছি। প্রতিবন্ধী আর মাতৃত্বকালীন ভাতা বর্ধিত এলাকায় কমপক্ষে ২০ শতাংশ বেশি দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। বর্ধিত এলাকাগুলোতে লোকসংখ্যা অনেক বেশি। তাই সমহারে সব সুবিধা দিলেও বর্ধিত এলাকার সবাই তা পায় না।’

 



মন্তব্য