kalerkantho


হাসিনা-মোদি সরকারের মধ্যে ফাটলের চেষ্টা

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



হাসিনা-মোদি সরকারের মধ্যে ফাটলের চেষ্টা

দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনি পরামর্শক লর্ড কারলাইল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ও ভারতের নরেন্দ্র মোদির সরকারের মধ্যে সমস্যা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত বুধবার রাতে কারলাইলকে ভারতে প্রবেশ করতে না দেওয়ার পর গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রভিশ কুমার এ কথা জানান। তিনি আরো জানান, কারলাইল কেবল বাংলাদেশ ও ভারতের সরকারের মধ্যেই নয়, ভারত সরকারের সঙ্গে বিএনপির ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টির  চেষ্টা চালাচ্ছেন।

লর্ড কারলাইলের নয়াদিল্লি সফরের উদ্দেশ্য ভারতের কাছে স্পষ্ট বলেও জানান রভিশ কুমার। তিনি বলেন, ‘তিনি (কারলাইল) ভারত ও বাংলাদেশের সরকারের মধ্যে কোনো না কোনো সমস্যা সৃষ্টি করতে চাচ্ছিলেন। আর তিনি ভারত সরকার ও বাংলাদেশে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টির চেষ্টা করছিলেন।’

গতকাল নয়াদিল্লিতে পূর্বনির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনে লন্ডন থেকে স্কাইপে যুক্ত হন কারলাইল। প্রবেশ করতে না দেওয়ার জন্য ভারতের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করে তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ সরকারের নজিরবিহীন চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ভারত তাঁকে প্রবেশ করতে দেয়নি। এ জন্য ভারতের লজ্জিত হওয়া উচিত।

কারলাইলের ওই বিবৃতির কপি দেখিয়ে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সংবাদ সম্মেলনে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘আপনি (কারলাইল) ভারতের মাটি ব্যবহার করছেন। আপনি এখানে যা বলতে চেয়েছিলেন, তা লন্ডনেও বলতে পারতেন। এটিই সন্দেহজনক। আপনার উদ্দেশ্য নিয়েই সংশয় আছে। আপনি যখন ভারতে আসছেন তখন এই ভূখণ্ডের আইনের প্রতি আপনার শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত।’

কারলাইল বৈধ বা যথাযথ ভিসায় ভারতে আসেননি উল্লেখ করে মুখপাত্র রভিশ কুমার বলেন, “ভিসা আবেদনের ফরমে আপনি যে উদ্দেশ্যের কথা লিখেছেন, তা পালন করছেন না। তিনি (কারলাইল) ‘বিজনেস ভিসার’ জন্য আবেদন করেছিলেন।”

রভিশ কুমার বলেন, “এটি কেমন ‘বিজনেস’? ‘বিজনেস ভিসায়’ এখানে এসে কি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ আছে? ভারতে তাঁর সফরে নির্ধারিত কর্মকাণ্ড আর ভিসা আবেদন ফরমে উল্লেখ করা উদ্দেশ্যের মধ্যে সাদৃশ্য নেই। এ কারণে তাঁকে ভারতে প্রবেশ করতে দিতে অস্বীকৃতি জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভিসা দেওয়া না-দেওয়ার একচ্ছত্র এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট দেশেরই থাকে।”

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ লর্ডস সভার সদস্য ও আইনজীবী লর্ড কারলাইলের গতকাল বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে লে মেরিডিয়ান হোটেলে খালেদা জিয়ার সাজা ও চলমান মামলাগুলোর বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করার কথা ছিল। ভারতের মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ ও সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর উদ্যোগে ঢাকায় রাজনৈতিক কূটনৈতিক মহলে নানা শঙ্কা দেখা দেয়। কারণ বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এ দেশের মাটি ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে দেয় না এবং ভারতের কাছ থেকেও অনুরূপ উদ্যোগ প্রত্যাশা করে।

পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক চলতি মাসের শুরুতে ঢাকায় ভারতীয় উপহাইকমিশনার ড. আদর্শ সোয়াইকার সঙ্গে লর্ড কারলাইলের ভারত সফর বিষয়ে আলোচনা করেন। এরপর ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে লর্ড কারলাইলকে ভারতে প্রবেশ করতে না দিতে নয়াদিল্লিকে জোরালো সুপারিশ করে। নয়াদিল্লিও বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কারলাইলকে ‘বিজনেস ভিসা’য় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

ভারতে প্রবেশ করতে না পেরে গত বুধবার রাতেই লর্ড কারলাইল তাঁর নিজ দেশ যুক্তরাজ্যে ফিরে যান। এর আগে তিনি দিল্লি বিমানবন্দর থেকে সেখানকার ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার ড. আলেকজান্ডার ইভান্সকে ফোন করে ভারতে তাঁর প্রবেশে হস্তক্ষেপ করার অনুরোধ জানান। কিন্তু তাঁর এই অনুরোধে ডেপুটি হাইকমিশনার অসহায়ত্ত প্রকাশ করেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘বিজনেস ভিসায়’ ভারতে এসে সংবাদ সম্মেলন করার উদ্যোগের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ায় ভারত কারলাইলের ভিসা বাতিল করে।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, ভিসা বাতিলের বিষয়টি কারলাইলকে বেশ আগেই জানানো হয়েছিল। এর পরও তিনি মাত্র দুই ঘণ্টা পরের ফিরতি ফ্লাইটের বোর্ডিং পাস নিয়েই এসেছিলেন।

‘ভিসা বাতিলের বিষয়টি আগে জানানো হয়নি’ বলে কারলাইলের দাবি প্রসঙ্গে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, ফিরতি ফ্লাইটের বোর্ডিং পাস সঙ্গে নিয়ে আসাই প্রমাণ করে যে ভিসা বাতিলের বিষয়টি তাঁকে জানানো হয়েছিল এবং তিনি তা জানতেন।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কটাক্ষ এবং মানবতাবিরোধী জামায়াত নেতাদের পক্ষে বিবৃতি দেওয়া কারলাইল গতকালও তাঁর বিবৃতিতে ওই বিচার নিয়ে সমালোচনার ইঙ্গিত করেন। বাংলাদেশেও আসতে না পারার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয় তারও একটি উদাহরণ এটি। একে তিনি অসম্মানজনক বলে উল্লেখ করেন।

কারলাইল তাঁকে প্রবেশ করতে না দেওয়ার বিষয়ে ভারত সরকারের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করে বলেন, ‘গতকাল (বুধবার) আমি যখন মাঝ আকাশে তখন আমাকে ভারতে প্রবেশ করতে দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। ভারত সরকার ভালোভাবেই জানত যে আমি ব্রিফ করতে এবং কমনওয়েলথ মানবাধিকার উদ্যোগের কর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসছি। ৭০ বছরের জ্যেষ্ঠ একজন আইনজীবী ও সংসদ সদস্যের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই করা যায় না।’

লর্ড কারলাইল শিগগিরই লন্ডনে সংবাদ সম্মেলন করারও ঘোষণা দিয়েছেন।

 

 



মন্তব্য