kalerkantho


ফ্রান্সের চাই কাপ

মস্কো থেকে প্রতিনিধি   

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



ফ্রান্সের চাই কাপ

স্যামুয়েল উমতিতিকে ঘিরে ফরাসি সতীর্থদের উল্লাস ছবি : এএফপি

রাষ্ট্রপ্রধান তিনি। তাঁর কত কাজ! তবু সব ফেলে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ পরশু চলে আসেন সেন্ট পিটার্সবার্গে। তাঁর দেশ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে খেলছে বলে কথা! বেলজিয়ামের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে জয়ের পর ড্রেসিংরুমে গিয়ে অভিনন্দন জানান খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফকে। এরপর বলে আসেন, ‘ফাইনাল দেখার জন্যও আমি আসছি।’

ওই ফাইনালে চোখ পুরো ফ্রান্সের। দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয় থেকে মাত্র যে এক ধাপ দূরে তারা! ২০ বছর আগে দিদিয়ের দেশমের অধিনায়কত্বে প্রথম শিরোপা জিতেছিল ফরাসিরা। এবার তিনি কোচ। আন্তোয়ান গ্রিয়েজমান, পল পগবা, কিলিয়ান এমবাপ্পেদের সোনালি প্রজন্মকে বিশ্বকাপ জয়ে পরিচালিত করাই দেশমের কাজ। সেই পূর্ণতার কত কাছাকাছিই না তিনি এখন!

দেশম অবশ্য ২০ বছর আগের সঙ্গে বর্তমান দলটির তুলনা করছেন না। সেন্ট পিটার্সবার্গের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে মুখে হাসির রেখা ফুটিয়েও দৃঢ়তার সঙ্গে দেন সেই ঘোষণা, ‘এই দুই দলের তুলনা আমি করতে পারব না। ওই দলের কথা কখনো, কখনোই আমি উল্লেখ করি না। বর্তমান দল নিয়ে আছি ফ্রান্স ফুটবলের নতুন ইতিহাস তৈরির জন্য। এটি বলছি না যে ২০ বছর আগে ফুটবলার হিসেবে যা করেছি, সে জন্য আমি গর্বিত না। আমাদের সেই অর্জন কেউ মুছে দিতে পারবে না। কোনো এক দিন যখন আমার ফুটবলীয় পথচলা থেমে যাবে, তখন না হয় এটি নিয়ে ভাবা যাবে। তবে সে সময় তো এখনো আসেনি।’

বর্তমান প্রজন্মের নতুন ইতিহাস তৈরির তাগিদই বরং জোরালো তাঁর কণ্ঠে, ‘১৯৯৮ সালের দলটি তাদের নিজস্বতা দিয়ে সবার স্মৃতিতে রয়েছে। বর্তমান দলের খেলোয়াড়রাও সেটি জানে। ওদের কারো কারো তখন হয়তো জন্মই হয়নি। কিন্তু পরে নিশ্চয়ই আমাদের সাফল্যের ছবি দেখেছে। মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছে সেই দল। এখন বর্তমান দলের সময় এসেছে নিজস্ব ইতিহাস তৈরির।’

বছর দুয়েক আগে ইউরোর ফাইনালে সে সুযোগ ছিল দেশমের দলের সামনে। নিজ দেশের সেই ফাইনালে পর্তুগালের কাছে হারের দুঃসহ স্মৃতি ভুলে যাননি। সে কারণেই আরেক টুর্নামেন্টের ফাইনালে ওঠার আনন্দ তাঁর কাছে আরো বেশি, ‘দুই বছর আগে ইউরোর ফাইনাল হারের সময়ও তো নিজস্ব কোচিং স্টাফ নিয়ে আমি ফ্রান্সের দায়িত্বে ছিলাম। সে রাতটি ছিল বড্ড যন্ত্রণার। এ কারণেই আজ আমরা খুব করে জিততে চেয়েছি। ইউরোর ফাইনাল হারের পর বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল জেতাটা হয়তো বড় কিছু মনে হতে না পারে। কিন্তু আজ আমরা ফরাসিদের আনন্দ দিতে পেরেছি। ফুটবল আমাদের সে সুযোগ এনে দিয়েছে।’ বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয়ে পুরো দলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ দেশম। আলাদা করে তবু উল্লেখ করেন পল পগবার কথা, ‘আমার দলের সব ফুটবলারেরই প্রশংসা করতে হবে। আর পগবা তো ছিল মাঠের প্রায় সব জায়গাতেই। শুধু আক্রমণে না, রক্ষণেও ভীষণ কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে। আমার মনে হয়েছে, বেলজিয়ামের কোচ রবার্তো মার্তিনেসের পরিকল্পনায় মারুয়ান ফেলাইনিকে সব সময় পগবার পেছনে লাগিয়ে রাখা হয়েছে। সে কারণে বল পায়ে ওর স্বাধীনতা হয়তো সেভাবে ছিল না। কিন্তু পল জানে, ওর কী করতে হবে। বল রিকভারি, ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে দুর্দান্ত খেলেছে। দলের সঙ্গে সঙ্গে পল পরিণত হচ্ছে।’

এই মিডফিল্ডার পরশু খেলেছেন দুর্দান্ত। দলের জয় উৎসর্গ করেছেন থাইল্যান্ডে গুহায় আটকে পড়ে পরে উদ্ধার হওয়া কিশোর দলের প্রতি। নিজের টুইটার অ্যাকাউন্টে ওই কিশোরদের ছবি দিয়ে লিখেছেন, ‘এই জয় আজকের দিনের নায়কদের জন্য। তোমরা দারুণ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছ।’ ফাইনালে উঠে আনন্দিত হলেও ভেসে যাচ্ছেন না পগবা, বছর দুয়েক আগের ইউরোর অভিজ্ঞতার কারণেই। তবে এবার ইতিহাস বদলে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তিনি, ‘ফাইনালে ওঠা অসাধারণ অর্জন। কিন্তু লক্ষ্য থেকে এখনো এক ধাপ দূরে আছি। ইউরোর ফাইনালেও উঠেছিলাম আমরা। তা জয়ের অপূর্ব সুযোগ ছিল। কিন্তু তা কাজে লাগাতে পারিনি। এবার আর তা হতে দিতে পারি না। বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠে আমি খুশি, আমরা খুশি, ফ্রান্সের সবাই খুশি। আমরা তাদের আরো বেশি আনন্দ দিতে চাই। ১৫ জুলাই জিততে চাই বিশ্বকাপ ট্রফি।’

শিরোপাকে পাখির চোখ করার ঘোষণা বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করা স্যামুয়েল উমতিতিরও, ‘আমি গোল করেছি, সে জন্য অবশ্যই গর্বিত। তবে পুরো দলই ভালো এক ম্যাচ উপহার দিয়েছে। ফাইনালে যাওয়ার লক্ষ্য পূরণ করতে পেরে আমরা সবাই আনন্দিত। এখন বিশ্বকাপটি জিততে হবে।’ যা ধ্যানজ্ঞান ১৯ বছরের তরুণ কিলিয়ান এমবাপ্পের। বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলে ‘গোল্ডেন বল’ আর বর্ষসেরা ফুটবলার হিসেবে ‘ব্যালন ডি’অর’-এর প্রার্থী হিসেবে ধরা হচ্ছে এই ফরোয়ার্ডকে। সেসব নিয়ে মোটেই মাথাব্যথা নেই এমবাপ্পের, ‘ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ ফাইনালে নিয়ে যাওয়াটা অবিশ্বাস্য। এটি স্বপ্নের ভেতরের স্বপ্ন, ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সব কিছু, যা বর্ণনার ভাষা আমার কাছে নেই। আমি অনেক বড় স্বপ্নবাজ, তবু কখনো এত বড় স্বপ্ন দেখিনি যে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ ফাইনালে নিয়ে যাব। এ অর্জন নিয়ে আমরা অবশ্যই গর্বিত। তবে এখনো আরেক ধাপ বাকি রয়েছে। আর ব্যালন ডি’অর নিয়ে আমি মোটেই ভাবছি না। আমি জিততে চাই বিশ্বকাপ।’

বেলজিয়ামের বিপক্ষে সেমিফাইনালের জয়ের আনন্দেও অমন লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি ফ্রান্স দল। বিশ্বকাপ জিততে হবে যে!

 



মন্তব্য