kalerkantho


সীতাকুণ্ডের অবৈধ পর্যটন স্পটে এক বছরে মৃত্যু ৮

সতর্ক করে লাল পতাকা টাঙিয়েছে প্রশাসন

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)   

২৫ জুন, ২০১৮ ০০:০০




সীতাকুণ্ডের অবৈধ পর্যটন স্পটে এক বছরে মৃত্যু ৮

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অনুমোদনহীন অবৈধ পর্যটন স্পটগুলোতে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা বেড়েই চলেছে। বৃহস্পতিবার বাঁশবাড়িয়া সাগরসৈকতে একসঙ্গে দুই ছাত্রসহ গত এক বছরে উপজেলার বিভিন্ন অবৈধ পর্যটন স্পটে মারা গেছে কমপক্ষে আটজন। একের পর এক এসব দুর্ঘটনার পরও অবৈধ পর্যটন স্পট হওয়ায় এসব মৃত্যুর দায় নিতে রাজি নয় প্রশাসন। তবে বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর বাঁশবাড়িয়া সি-বিচে ঘাট ইজারাদারের নির্মাণ করা অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, সীতাকুণ্ডে বেশ কয়েকটি অনুমোদনহীন পর্যটন স্পট রয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত, গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত, সৈয়দপুর সমুদ্রসৈকত, মুরাদপুর বাংলাবাজার সমুদ্রসৈকত, বাড়বকুণ্ড সাগরপার, সলিমপুর-কাট্টলী সমুদ্রসৈকত, ছোট দারোগার হাট লবণাঙ্গ পাহাড় ও ভাটিয়ারী লেক এলাকা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব স্পটের একটিও সরকারিভাবে স্বীকৃত পর্যটন স্পট নয়। এ কারণে এখানে কোনো নিরাপত্তাকর্মীও নেই। এর পরও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিবছর এখানে বহু দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হলো, যাতায়াতে কোনো নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকায় নানা ধরনের অপরাধ ও দুর্ঘটনা এসব এলাকায় নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আবার প্রশাসনিক নজরদারি ও কোনো কৈফিয়ত না থাকায় অসত্ উদ্দেশ্য নিয়ে বহু তরুণ-তরুণীরও এখানে আগমন ঘটে। ফলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পাশাপাশি এখানে প্রায়ই খুনোখুনির ঘটনাও ঘটে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ১৬ আগস্ট সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী সৈকতে গোসল করতে নেমে প্রাণ হারান চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ছাত্র নাকিব মোহাম্মদ খাব্বাব। এ ঘটনার পরপরই সলিমপুর শুকতারা রেস্তোরাঁর কাছে সাগরপারে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় চট্টগ্রামের কাট্টলীর এক কলেজছাত্র। এ ছাড়া গত এক বছরে ছোট দারোগার হাট ঝরনায় এক তরুণী ও ভাটিয়ারী লেক এলাকায় তিন তরুণ-তরুণী খুন হয়। ভ্রমণে আসার নামে এখানে অপকর্ম করে সঙ্গীরা প্রমাণ লোপের জন্য তাদের খুন করে বলে পুলিশের ধারণা।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বাঁশবাড়িয়ার অবৈধ সি-বিচের পানিতে নেমে নিখোঁজ হন দুই তরুণ। তাঁরা হলো ঢাকার নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা কলেজছাত্র ইমন (১৯) ও রাজ (২০)। ঘটনার পর ২৪ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে পরদিন শুক্রবার বিকেলে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল।

বাঁশবাড়িয়ার ইউপি চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী জাহাঙ্গীর বলেন, ‘বাঁশবাড়িয়ার সাগরপার নিয়ে ঘাটের ইজারাদার এম এ কাসেম রাজা বাণিজ্য শুরু করেছিলেন। তিনিই সেখানে অবৈধভাবে দোকানপাট নির্মাণ করে সবাইকে উত্সাহিত করেন। আবার সাইনবোর্ড দিয়ে লিখেছেন যে তত্ত্বাবধান করছেন তিনি। এভাবে কোনো ব্যক্তি সরকারি সম্পদ সাগরপারে নিজের ইচ্ছামতো পর্যটন স্পট তৈরি করতে পারে কি না আমার জানা নেই।’ চেয়ারম্যান বলেন, ‘এম এ কাসেম রাজা এত দিন সাইনবোর্ড লাগিয়ে পর্যটকদের কাছে নিজের নাম প্রচার করেছেন। অথচ বৃহস্পতিবার দুর্ঘটনার পর তাঁর লোকজন ঘাট বন্ধ করে উধাও হয়ে যায়। পানিতে ডুবে প্রাণ হারানো দুই শিক্ষার্থীর সহপাঠীরা নিরুপায় হয়ে এম এ কাসেম রাজার লোকজনের কাছে গেলে তারা সাহায্য তো দূরের কথা উল্টো তিরস্কার করে। বিষয়গুলো সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিবেচনা করা উচিত।’

সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকতে দুই ছাত্রের মৃত্যুর পর আমরা লাল পতাকা টাঙিয়ে দিয়েছি, যাতে আর কোনো পর্যটক এখানে এসে সাগরে না নামে। এটি সরকারের অনুমোদন দেওয়া কোনো বৈধ বিচ ছিল না। তাই এখানে কোনো নিরাপত্তার ব্যবস্থাও সরকারিভাবে করা সম্ভব নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই বিচসংলগ্ন ঘাটের ইজারাদার এম এ কাসেম রাজা যেভাবে সি-বিচে অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা নির্মাণ করেছেন তাও আমরা তুলে দেব। এগুলোরও কোনো বৈধতা নেই। কেউ সরকারি সম্পদ সাগরপারে ব্যক্তিগত স্থাপনা করে নিজেকে মালিক দাবি করতে পারে না।’

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তারিকুল আলম বলেন, ‘বাঁশবাড়িয়া সি-বিচটি সম্পূর্ণ অবৈধ হওয়ায় এখানে আগত কোনো পর্যটকের দায়-দায়িত্ব প্রশাসনের নয়। এ কারণে আমরা এখানে কাউকে আসা কিংবা সাগরে নামায় নিরুত্সাহিত করব।’



মন্তব্য