kalerkantho


সাম্বার ছন্দ মেলা শুরু

নোমান মোহাম্মদ, সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে   

২৪ জুন, ২০১৮ ০০:০০



সাম্বার ছন্দ মেলা শুরু

মা-বাবা দুজনই ছিলেন কৃষক। সন্তানদের মুখে তিন বেলা খাবার তুলে দিতে উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে হতো। তাতেও কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না বলে গ্রাম থেকে চলে যান শহরে। মা কাজ নেন দর্জি হিসেবে। বাবা ওয়াইন ফ্যাক্টরিতে। জীবনের এই কঠিন বাস্তবতা ছোট্ট আদেনর বুঝবে কেন! বন্ধুদের দেখাদেখি মাকে তাই বলত, ‘আমার সোডা চাই। আমি সোডা খেতে চাই।’ মায়ের জবাব, ‘ঠিক আছে আদে, ধৈর্য ধর। তুমি সোডা পাবে।’

এরপর পেরিয়ে যায় দুই দিন, তিন দিন। একদিন স্কুল থেকে ফেরা আদেনরের হাতে সোডার ছোট্ট কাচের বোতল তুলে দেন মা। ছেলেটির কাছে সোডা তখন এক জাদুকরী পানীয়। আর তা এনে দিয়েছেন বলে মাকে মনে হতো জাদুকর। অনেক অনেক বছর পর তিনি উপলব্ধি করেন কিভাবে তাঁর মা এই সোডা জোগাড় করেছেন, ‘তিনি রাত ৩টা পর্যন্ত জেগে কাপড় সেলাই করেছেন যেন আমাদের একটু সোডা খাওয়াতে পারেন অথবা এক জোড়া মোজা কিনে দিতে পারেন। একটা ছোট্ট বোতল সোডা কেনার জন্য আমার মাকে হয়তো চার-পাঁচ ঘণ্টা কাপড় সেলাইয়ের কঠোর পরিশ্রম করতে হতো।’

গল্পটি লিওনার্দো আদেনর বাক্কি তিতের। ব্রাজিল জাতীয় দলের কোচের। সন্তানের জন্য সুঁই-সুতায় স্বপ্নের বুনন ছিল যে মায়ের, তাঁর ছেলের মস্তিষ্কেই এখন ব্রাজিলিয়ানদের স্বপ্নের নকশা আঁকা। তাঁর ওপরই যাবতীয় ভরসা। ‘প্রফেসর’-এর শিষ্যরা ফুটবলপাগল জাতিকে সাফল্যের সূর্যোদয় দেখাবেন আবার, ১৬ বছর পর আবার বিশ্বকাপ জিতবে ব্রাজিল—এই আশাতেই বুঁদ সবাই।

কোস্টারিকার বিপক্ষে জয়ের পর সে আশার পাশে এখন আবার নতুন হাওয়া।

তিতের সংবাদ সম্মেলন মানে কেবল প্রশ্ন-উত্তর নয়। সাংবাদিকদের সঙ্গে জাতীয় দলের কোচের ভাবনার আদান-প্রদানও। সংবাদ সম্মেলন কক্ষ অগ্নিগর্ভা হয়ে থাকে না। তিতের প্রতি শ্রদ্ধার এক হাওয়া যেন বইতে থাকে অলক্ষ্যে। বেশির ভাগই তাঁকে সম্বোধন করেন ‘প্রফেসর’ হিসেবে। শ্রদ্ধার প্রকাশটা সেখানেও। কোস্টারিকার বিপক্ষে জয়ের পর প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার সংবাদ সম্মেলনে সব প্রশ্নের জবাব কী দারুণভাবেই না দেন তিতে!

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ড্র করার পর চাপে ছিল ব্রাজিল। চাপে ছিলেন তিতেও। কোস্টারিকার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচেও যখন গোলশূন্য প্রথমার্ধ, চাপটা সবাইকে চেপে ধরছিল আস্ত পাহাড়ের মতো। কিন্তু জীবনের দুঃসময় তিতেকে শিখিয়েছে সাহসী হতে। তাইতো ব্রাজিলের কোচ হিসেবে কার্লোস দুঙ্গার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর দলের কৌশল ঢেলে সাজাতে পারেন। দলের সেরা খেলোয়াড় নেইমারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফেলতে পারেন। কোস্টারিকার বিপক্ষেও যখন প্রথমার্ধে দলের কৌশল কাজ করেনি, দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই উইলিয়ানের বদলে মাঠে নামিয়ে দেন দগলাস কস্তাকে। ৬৭ মিনিটের সময় আরেক ফরোয়ার্ড রবের্তো ফিরমিনোকে পাঠান। সেটিও গাব্রিয়েল জেসুসকে না তুলে।

ফিরমিনো-জেসুসকে একসঙ্গে খেলানোর ঝুঁকি তিনি জানেন। তাঁদের একসঙ্গে খেলানোর অনুশীলনও করাননি সেভাবে। কিন্তু জয়ের জন্য মরিয়া তিতে ঠিকই ঝুঁকিটা নিলেন, ‘আমি ফিরমিনোকে জেসুসের সঙ্গে খেলানোর ট্রেনিং করাইনি। ওকে শুধু বলেছিলাম, এমন কিছু হতে পারে। শুধু ট্যাকটিকাল বোর্ড দেখিয়ে বলেছিলাম, প্রতিপক্ষের পাঁচ ডিফেন্ডারের লাইনের বিপরীতে ফিরমিনোকে কোথায় চাই। ও হেসে বলেছে, হ্যাঁ প্রফেসর, আমি তা করতে পারব।’ ঠিকই তো ৯১তম মিনিটে ফিলিপে কৌতিনিয়োর গোলে দারুণ অবদান রেখে কোচের আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন লিভারপুলের ফরোয়ার্ড।

শুধু জয়ের জন্য না, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের তুলনায় ব্রাজিলের খেলার উন্নতিও চোখে পড়ার মতো। বিশেষত কোস্টারিকার বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে। আরো বেশি আক্রমণাত্মক মানসিকতা নিয়ে খেলেছে ব্রাজিল; দু-পাশের ওয়াইড এরিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছে খেলা, দ্রুতগতিতে কয়েক পাসে প্রতিপক্ষের রক্ষণ খুলে দেওয়া, অ্যাটাকিং থার্ডের মুভমেন্টও চোখ-জুড়ানো। কেবল গোলটাই পাচ্ছিল না। আর গোলের খেলা ফুটবলে গোল না হলে বাকি সবই যে ব্যর্থ! ইনজুরি সময়ে কৌতিনিয়ো ও নেইমারের গোলে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় মুথ থুবড়ে পড়তে হয়নি ব্রাজিলকে।

‘বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ শেষ প্রথম ম্যাচে। এখন আরো বেশি মনোযোগী আমরা হতে পারব’—সেন্ট পিটার্সবার্গে আগের দিন বলেছিলেন তিতে। পরশু ম্যাচ শেষে বিজয়ীর বেশে এসে ঘোষণা, ‘ছেলেদের খেলায় উন্নতি রয়েছে যথেষ্ট। দ্বিতীয়ার্ধে তো আমরা দারুণ সুন্দর ফুটবল খেলেছি।’ পেলে-গারিঞ্চা কিংবা জিকো-সক্রেটিসের ব্রাজিলের মতো তারা খেলেনি সত্য। কিন্তু সাম্বা সুরের ছন্দটা পাওয়া গেছে কোস্টারিকার বিপক্ষে।

আর তিতেই তো বলেছেন, বিশ্বকাপ চলাকালীনই সেরা ফর্মের নেইমারকে দেখা যাবে। ইনজুরি থেকে সেরে ম্যাচ ফিটনেস পেতে পাঁচ ম্যাচ লাগবে বলে দাবি ছিল। দুটি প্রস্তুতি ও বিশ্বকাপের দুই ম্যাচ তো হয়ে গেছে। নেইমারের সেরা ফর্মে ফেরায় তাই হয়তো দেরি নেই খুব একটা।

না জয় নেইমার-নির্ভরতা কমিয়েছেন, কিন্তু বিশ্বকাপ জিততে হলে নেইমারের জাদু তো লাগবেই তিতের! তাহলে নিজের মাকে যেমন তাঁর কাছে জাদুকর মনে হতো, ব্রাজিলিয়ানদের কাছেও তিতেও মনে হবে তাই। হয়তো আদুরে নাম ‘প্রফেসর’ থেকে বদলে হয়ে যাবে ‘ম্যাজিশিয়ান’।

 

 



মন্তব্য