kalerkantho


শেষবেলায় হাসল ব্রাজিল

২৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



শেষবেলায় হাসল ব্রাজিল

কৌতিনিয়োর সঙ্গে গোল উৎসব নেইমারের। শেষ মুহূর্তে এ দুজনের গোলেই স্বস্তির জয় ব্রাজিলের। ছবি : এএফপি

বিষাদকাব্যের বিশ্বকাপই তাহলে হতে যাচ্ছে!

বিশ্বকাপের আকাশজুড়ে আশঙ্কার এই মেঘের ওড়াউড়ি পরশু থেকেই। কালও তা ছিল অনেকক্ষণ। ব্রাজিল-কোস্টারিকা ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিট পেরিয়েও। আগের দিন আর্জেন্টিনার পরাজয়ে যে বিষণ্নতায় ডুব বিশ্বকাপের, সেখান থেকে ভেসে ওঠার লক্ষণ তো দেখা যাচ্ছিল না! গোলশূন্য ড্রয়ে যদি এ দ্বৈরথ শেষ হয়, তাহলে যে আলবিলেস্তেদের মতো সেলেসাওদের বিশ্বকাপ ভাগ্যও ঝুলে যাবে!

সেটি হতে দেয়নি ব্রাজিল। হতে দেননি ফিলিপে কৌতিনিয়ো, নেইমাররা। যে কোস্টারিকার দেয়ালে ৯০ মিনিট মাথা কুটে মরেছেন লিওনার্দো বাচ্চি তিতের দল, সে দেয়াল হলুদ জোয়ারে ভাসিয়ে দেয় ইনজুরি সময়ে। প্রথমে কৌতিনিয়ো, এরপর নেইমার। আর এই কোস্টারিকার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে শুধু নিজেরা বাঁচেনি ব্রাজিল; বাঁচিয়ে রেখেছে বিশ্বকাপকেও। অন্য ম্যাচগুলোর ফল পক্ষে না গিয়ে আর্জেন্টিনার বিদায় হলে আর ব্রাজিলও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করলে টুর্নামেন্টের সিংহভাগ আকর্ষণই যে মরে যাবে!

অথচ আর্জেন্টিনার মতো কালকের ব্রাজিলও হারিয়ে যেতে বসেছিল ব্যর্থতার চোরাবালিতে। না হয় প্রবল প্রতিপক্ষের মতো তিন গোল খায়নি, কিন্তু নিজেরাও তো গোল দিতে পারছিল না। নির্ধারিত ৯০ মিনিট পেরিয়ে ইনজুরি সময়ে আসে অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বাঁ দিক থেকে মার্সেলোর ক্রস ধরেছিলেন বদলি হিসেবে নামা রবের্তো ফিরমিনো। বল দেন গাব্রিয়েল জেসুসকে। এই ফরোয়ার্ডের ফার্স্ট টাচ মোটেই জুতসই হয়নি। কিন্তু সেটিই চমৎকারভাবে পড়ে কৌতিনিয়োর সামনে। ওই ফাঁকা পোস্টের সামনে গোল মিস করার কোনো সুযোগ ছিল না। ইনজুরির সময়ের প্রথম মিনিটে টুর্নামেন্টে কৌতিনিয়োর এই দ্বিতীয় গোল আর শেষ মিনিটের নিজের প্রাপ্য গোলটি পেয়ে যান নেইমার। ডান প্রান্ত দিয়ে দগলাস কোস্তার দৌড়ের পর বলটি তুলে দেন নেইমারের পাতে; ওই ফাঁকা তেকাঠির সামনে। চলতি বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলটি করতে তাতে মোটেই অসুবিধা হয়নি তাঁর।

ইনজুরি সময়ের দুই গোল, না-ও তো হতে পারত! সমালোচকরা তা বলতেই পারেন। কিন্তু অমন কিছু হলে সেটি হতো ব্রাজিলের প্রতি বড্ড অন্যায়। কোচ তিতের ফুটবল-দর্শনের প্রতি বড় অবিচার। গড়পড়তা প্রথমার্ধের পর দলকে জাগিয়ে তুলতে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই উইলিয়ানের জায়গায় কোস্তাকে নামিয়েছেন। মিডফিল্ডার পাউলিনিয়োকে তুলে দ্বিতীয় ফরোয়ার্ড হিসেবে ফিরমিনোকেও মিনিট বিশেক পর। দ্বিতীয়ার্ধে তাই বল পায়ে সাম্বার সুর তুলেছে সেলেসাওরা। আক্রমণে আক্রমণে কোণঠাসা করে ফেলেছিল কোস্টারিকাকে। গোলটাই শুধু পাচ্ছিল না। ৭৮তম মিনিটে যা-ও রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান, সেটিও বাতিল হয়ে যায় ভিএআরে। এত কিছুর পরও জয়টা ব্রাজিলের প্রাপ্য না— সেটি অন্তত কেউ বলতে পারবে না।

প্রথমার্ধে ব্রাজিল অবশ্য ঠিক ব্রাজিলে ছিল না। কোস্টারিকার গা-জোয়ারি ফুটবলে সেটি থাকার উপায়ও নেই। সুইজারল্যান্ডের মতোই নেইমারকে টার্গেট করে নেমেছিল তারা। প্রথম ১৫ মিনিটের মধ্যে চারবার ফাউল করা হয় তাঁকে। কিছু হাফ চান্স তৈরি হচ্ছিল, তবে তুলনামূলক পরিষ্কার গোলের সুযোগ পায় কোস্টারিকাই। ওপরে উঠে যাওয়া মার্সেলোর পেছনের ফাঁকা জায়গা কাজে লাগিয়ে ওখান থেকে কাটব্যাক, বোর্হেসের শট একটুর জন্য চলে যান পোস্ট ঘেঁষে। ওদিকে ২৬তম মিনিটে জেসুস বল একবার জালে পাঠান ঠিক; তবে অফসাইডের কারণে বাতিল হয়ে যায় তা।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে উইলিয়ানের বদলে দগলাস কোস্তাকে নামান ব্রাজিল কোচ। তাতেই ব্রাজিলের খেলা হয়ে হয়ে আরো শাণিত। অ্যাটাকিং থার্ডে আছড়ে পড়ে একের পর এক আক্রমণ। তবু শুরুর ১৫ মিনিটের ঝড়ে কিভাবে যে গোল পায়নি ব্রাজিল!

৪৮তম মিনিটে দ্রুতগতিতে দারুণ কিছু ওয়ান-টু পাসে কোস্টারিকার গোলমুখ খুলে ফেলে ব্রাজিল। ডান দিক থেকে পাউলিনিয়ো ক্রস করেছিলেন দ্বিতীয় পোস্টে। নেইমারের পায়ে বল গেলেই গোল; কিন্তু ঝাঁপিয়ে নিজেকে সামনে ফেলে দেন কেইলর নাভাস। মিনিট দুয়েক পরের ত্রাতা বারপোস্ট। দানিলোর বদলে রাইটব্যাকে খেলতে নামা ফাগনেরের নিখুঁত ক্রস খুঁজে নেয় গাব্রিয়েল জেসুসের মাথা। হেডটি করেছিলেনও দুর্দান্ত। কিন্তু কোস্টারিকার গোলরক্ষককে তা ফাঁকি দিলেও ক্রসবারে প্রতিহত হয়ে ফেরত আসে। ওই মুভেই ফিলিপে কৌতিনিয়োর শট এক ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে বেরিয়ে গেলে আবারও বেঁচে যায় কোস্টারিকা।

তবে এসব কিছু ছাপিয়ে গেছে ৫৬তম মিনিটে নাভাসের সেই অবিশ্বাস্য সেভে। কোস্তার বল কেড়ে নেওয়ায় সে মুভের শুরু, এরপর কাটব্যাক। কোস্টারিকার গোলমুখ তখন হাঁ হয়ে খুলে গেছে নেইমারের সামনে। প্রথম প্রচেষ্টায় বলে-পায়ে দারুণ সংযোগও হয়। কিন্তু পাখির উড়ালে অবিশ্বাস্যভাবে গোলমুখী সেই বলকে বাইরে ঠেলে দেন নাভাস। সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয় অবিশ্বাস্যের অনুরণন। একই রকম অবিশ্বাস ৭২তম মিনিটেও। এবার রক্ষণ থেকে ক্লিয়ার করা বলে দ্রুতগতিতে কাউন্টার অ্যাটাকে উঠে আসে ব্রাজিল। মার্সেলোর কাছ থেকে বল পেয়ে কৌতিনিয়োর পাসটি ভালো হয়নি। কিন্তু কোস্টারিকার ডিফেন্ডারের পায়ে লেগে বল খানিকটা ফাঁকা জায়গা পেলে মুহূর্তে সুযোগটি নিয়ে নেন নেইমার। চোখের পলকে সে বল ধরে এগিয়ে যান বিদ্যুত্গতিতে। তিন ডিফেন্ডারের সাধ্যি নেই তাঁকে আটকে রাখার! পেনাল্টি এরিয়ার কাছাকাছি চলে যান। এ রকম জায়গা থেকে ক্যারিয়ারে কত গোল করেছেন নেইমার! কিন্তু এ শটকে তেকাঠির মধ্যে রাখতে পারেন না।

সেন্ট পিটার্সবার্গের হলুদের ঢেউয়ে ততক্ষণে হতাশার বুদ্বুদ ছড়িয়ে পড়ছে। এ দিন নীল জার্সি পরা ব্রাজিল বেদনায় রাঙায় কিনা হৃদয়, এ আশঙ্কা হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছিল ক্রমশ। তা কেটে যাওযার উপক্রম ৭৮তম মিনিটে; যখন নেইমারকে ফাউল করায় পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। কোস্টারিকানরা যে তেড়েফুঁড়ে এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছে, তা নয়। কিন্তু রেফারি ভিএআরের সাহায্য নেন। টাচলাইনের পাশে ঘটনার রিপ্লে দেখে বদলান নিজের সিদ্ধান্ত। ব্রাজিলের পেনাল্টি বাতিল! আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে বলা ব্রাজিল কোচ লিওনার্দি বাচ্চি তিতের কথাটি তখন কানে বাজছিল গ্যালারির গর্জনেও, ‘আমি ভিএআর নিয়ে কিছু বলব না। বললেই মনে হবে পরের ম্যাচের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে চাইছি।’ কোস্টারিকার বিপক্ষে ৩ পয়েন্ট না পেলে কিন্তু এই পেনাল্টি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক কিছুই বলতে হতো তিতেকে।

এর প্রয়োজন পড়েনি। বিশ্বকাপকেও বিষাদকাব্য হতে দেয়নি ব্রাজিল। দুই ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে নক আউট পর্বে ওঠার পথে ভালোভাবেই রয়েছে তিতের দল। সেন্ট পিটার্সবার্গের কখনো আঁধার না হওয়া রাতে তাই বেজে ওঠে সাম্বার সুর। যে সুরের দোলায় দুলছে এখন সবুজ এ গ্রহের আনাচ-কানাচ!



মন্তব্য