kalerkantho


পর্তুগালের চার রোনালদোরও

সামীউর রহমান   

২১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



পর্তুগালের চার রোনালদোরও

আবার গোল রোনালদোর। তাঁর এই গোলেই মরক্কোর বিপক্ষে জয় পর্তুগালের। ছবি : এএফপি

সেইউতা, জিব্রাল্টার প্রণালিতে ছোট্ট একটা দ্বীপ। ১৪১৫ সালে এখানেই পর্তুগিজ সম্রাটের বাহিনী আর মরক্কোর সুলতানের বাহিনী মুখোমুখি হয়েছিল এক মরণপণ যুদ্ধে। জাহাজে করে এক রাতের ঝটিকা আক্রমণে সেইউতা দখলে চলে আসে পর্তুগিজদের। এখান থেকেই ধীরে ধীরে আফ্রিকায় বিস্তৃত হয় পর্তুগিজ উপনিবেশ। রাশিয়া বিশ্বকাপে মরক্কো আর পর্তুগাল যখন মুখোমুখি, তখনো উঠে এলো সেই যুদ্ধের প্রসঙ্গই। এক রাতের আচমকা আক্রমণেই পতন হয়েছিল এই দুর্গের, সেভাবেই ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর একটা মাত্র হেডেই ফয়সালা হয়ে গেল হারজিতের। মরক্কোর সুলতানের সৈনিকদের বীরগাথা কেউ লেখেনি, যেমনটা কেউ লিখবে না কতটা মরিয়া হয়ে খেলে পর্তুগিজদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল অ্যাটলাসের সিংহরা।

পৃথিবীতে নিয়মের চেয়ে অনিয়মই বোধ হয় বেশি! এমন একটা  অনুভূতিই হতে পারে মরক্কানদের। কিছুদিন আগে, ২০২৬ বিশ্বকাপের স্বাগতিক হতে চেয়েও পারেনি মরক্কো, হেরে গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকোর যৌথ উদ্যোগের কাছে। বিশ্বকাপে ইরানের বিপক্ষে ম্যাচে ভালো খেলেও হার মানতে হয়েছে আত্মঘাতী গোলে। আর পর্তুগালের বিপক্ষে শুরুতে গোল হজম করে পিছিয়ে পড়ার পর গোলের অনেক সুযোগ তৈরি করেও যে শেষ পর্যন্ত সোনার হরিণের দেখা পেলেন না বেনাতিয়া-আমরাবাতরা।

বলকে কথা শোনানোর আগাম হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। সেটা বাস্তবায়নে সময় নিয়েছেন মাত্র চার মিনিট! শুরুর আলগা ভাবটা গা ঝাড়া দিয়ে ঝটপট কর্নার আদায় করে নেয় পর্তুগাল। কর্নারে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে মরক্কান ফুটবলাররা বল পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মৌতিনিয়োর পায়ে, তিনি অবশ্য কর্নার পতাকার কাছাকাছিই ছিলেন। সেখান থেকেই লম্বা করে বাড়িয়েছিলেন ডি বক্সের ভেতরে। পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত ডি কোস্তা ছিলেন রোনালদোর মার্কার, তাঁর আড়াল ভেঙেই নিচু হয়ে হেড করে ভেসে আসা বলটা জালে পাঠিয়ে দেন রোনালদো। এই বিশ্বকাপে রোনালদোর চতুর্থ গোল, পর্তুগালেরও চতুর্থ গোল চলে আসে তাতেই। একই সঙ্গে দেশের জার্সিতে ৮৫তম গোল হয়ে যায় রোনালদোর। ফেরেংক পুসকাসের ৮৪ গোল ছাড়িয়ে ৮৫ গোল করা রোনালদোই এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি গোল করা ইউরোপিয়ান ফুটবলার। আর বিশ্বের সব ফুটবলারের ভেতর রোনালদোর অবস্থান দ্বিতীয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডটা এখনো ১৪৯ ম্যাচে ১০৯ গোলের মালিক আলী দাইয়ির।

গোল পাওয়ার পর ফের্নান্দো সান্তোস চেয়েছেন আসরে নিজেদের প্রথম জয়টা নিশ্চিত করতে, আর মরক্কো চেয়েছে আরেকটা হার এড়াতে। বেশি উজ্জীবিত ফুটবল খেলেছে অ্যাটলাসের সিংহরাই। বলের দখল, নিখুঁত পাস, গোলমুখী আক্রমণ প্রচেষ্টা, লক্ষ্যে শট; সবই বেশি মরক্কোর। বেলহান্দার হেড এক হাতে ফিরিয়েছেন রুই প্যাত্রিচিও, ১৫ গজ দূর থেকে বেলহান্দার শট ঠেকিয়েছেন পরশুই উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্সে যোগ দেওয়া এই গোলরক্ষক। রোনালদো যদি তলোয়ার হন, তাহলে প্যাত্রিচিও ছিলেন ঢাল। অনেক আঘাত বাঁচিয়ে শেষ পর্যন্ত দলের জয় নিশ্চিত করতে তাঁর ভূমিকাটা রোনালদোর গোলের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না।

দ্বিতীয়বারের মতো ম্যাচসেরার পুরস্কারটা পেয়েছেন রোনালদো। তাঁর সম্পর্কে কোচ ফের্নান্দো সান্তোস ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘রোনালদো হচ্ছে পর্তুগিজ পোর্ট ওয়াইনের মতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে আরো পরিশুদ্ধ আর সেরা হয়ে উঠছে। সে সব সময় নিজেকে বদলাচ্ছে। সে জানে সে কী পারে এবং সেটা সে করে দেখাচ্ছে। সে এখন যেটা করছে সেটা সে তিন-চার বছর আগেও করেছে এবং আগামী কয়েক বছর ধরে করে দেখাবে।’ ম্যাচসেরা হয়ে রোনালদো বলেছেন, ‘আমি খুবই খুশি। গোল করেছি এ জন্য নয়, ম্যাচটা আমরা জিততে পেরেছি সে জন্য। আমাদের একটা একটা করে ম্যাচ ধরে এগিয়ে যেতে হবে।’ গ্রুপ পর্বে শেষ ম্যাচে ইরানের মুখোমুখি হবে রোনালদোর পর্তুগাল। সেই ম্যাচ নিয়ে রোনালদোর প্রত্যাশা, ‘আমাদের প্রত্যাশা হচ্ছে ভালো খেলাটা ধরে রাখা, আর গ্রুপ পর্বে নিজেদের ভালো একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া।  আমরা নকআউট পর্বে প্রায় পৌঁছে গেছি, এরপর বাকিটা দেখব। চেষ্টা করব গ্রুপে প্রথম হতে।’

দুই ম্যাচ থেকে পর্তুগালের পয়েন্ট ৪, রোনালদোর গোলসংখ্যাও ৪। তবে ৩ গোলের ম্যাচে দলকে এনে দিয়েছিলেন ১ পয়েন্ট, আর ১ গোলের ম্যাচে দল পেয়েছে ৩ পয়েন্ট!

 



মন্তব্য