kalerkantho


গরিবের চাল ব্যবসায়ীর ঘরে

ওজনে কম দেওয়া বিতরণ না করার অভিযোগ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৪ জুন, ২০১৮ ০০:০০



গরিবের চাল ব্যবসায়ীর ঘরে

কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় দুস্থদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া বিপুল পরিমাণ চাল গতকাল বুধবার স্থানীয় ব্যবসায়ীদের গুদাম থেকে জব্দ করা হয়েছে। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নে আটক করা হয়েছে ৪৫৬ বস্তা চাল। গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নে আটক করা হয়েছে ১৭৬ বস্তা। অন্যদিকে বরিশালের মুলাদী উপজেলার সদর ইউনিয়নের এক গ্রাম পুলিশ সদস্যের বাড়ি থেকে ২০ বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়েছে। প্রতি বস্তায় চাল থাকে ৫০ কেজি করে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, তাঁরা চাল বিতরণ করেছেন। সুবিধাভোগীরাই ওই চাল বিক্রি করে দিয়েছে।

অন্যদিকে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার চাচুড়ী ইউনিয়নে মাথাপিছু বরাদ্দ ১০ কেজির চেয়ে কম চাল বিতরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

উল্লেখ্য, পবিত্র রমজান মাস ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় অতিদরিদ্র ব্যক্তি ও পরিবারকে ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ) কর্মসূচির আওতায় চাল বরাদ্দ দিয়েছে।

কুড়িগ্রাম : ফুলবাড়ী উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নে পাঁচ হাজার ২৮৪টি কার্ডের বিপরীতে ৫২ দশমিক ৮৪০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বিতরণ করা হয় তিন হাজার ৪৮৪টি কার্ডের চাল। বাকি এক হাজার ৪০০ কার্ডের চাল ব্যবসায়ীর গুদাম থেকে উদ্ধার করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। জব্দ করা ৪৫৬ বস্তা চালের আনুমানিক মূল্য চার লাখ ৩৪ হাজার টাকা।

বিজিবি সূত্র জানায়, খবর পেয়েই বাহিনীর একটি টহলদল গতকাল সকালে কাশিপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের পাশের দুটি গুদামে অভিযান চালায়। গুদাম দুটির মালিক ওই এলাকার মৃত রহমত মাস্টারের ছেলে শাহাদৎ হোসেন মিন্টু ও চান্দ মিয়ার ছেলে রমজান আলী। দুজনই পালিয়ে গেছেন। অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া বিজিবির কাশিপুর কম্পানি কমান্ডার সুবেদার সহিদ ইসলাম জানান, তাঁরা বাদী হয়ে দুই গুদাম মালিকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে।

কাশিপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান গোলজার হোসেন মণ্ডলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। তবে ব্যবসায়ীর গুদাম থেকে ভিজিএফের চাল উদ্ধারের খবর শুনেছি।’

গাইবান্ধা : ধাপেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের জন্য বরাদ্দ করা ভিজিএফের চাল থেকে ১৭৬ বস্তা কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ পেয়ে গতকাল ভোরে অভিযান চালান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সঞ্জয় কুমার মহন্ত। স্থানীয় ব্যবসায়ী আজাদুল ইসলামের বাড়ির চারটি ঘর থেকে ওই চাল উদ্ধার করা হয়।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) সঞ্জয় কুমার মহন্ত জানান, ব্যবসায়ী আজাদুল ইসলাম পালিয়ে গেছেন। এ ঘটনায় সাদুল্যাপুর থানার ধাপেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ও ব্যবসায়ী আজাদুল ইসলামসহ কয়েকজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। 

সাদুল্যাপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান মনির জানান, ধাপেরহাট ইউনিয়নে ৩৭ দশমিক ৮৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই চাল ১০ কেজি করে তিন হাজার ৭৮৫ পরিবারের মধ্যে বিতরণ করার কথা। কিন্তু চাল সুষ্ঠুভাবে বিতরণ না করে তিন-চতুর্থাংশ কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালায়।

ধাপেরহাট ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য লাইলি বেগম বলেন, দু-তিনটি ওয়ার্ডের সুবিধাভোগীরা চাল পেলেও তাদের ওজনে কম দেওয়া হয়। এ ছাড়া সুবিধাভোগীদের নামে স্লিপ তৈরি করে সেই স্লিপ ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেন চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন সদস্য। এতে বাধা দিলে তাঁকে লাঞ্ছিত করে চেয়ারম্যানের লোকজন।

চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, চাল উত্তোলনের পর ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে সুবিধাভোগীরা।

বরিশাল : মুলাদী সদর ইউনিয়নের চরলক্ষ্মীপুর এলাকা থেকে আল আমিন নামের এক গ্রাম পুলিশকে ২০ বস্তা চালসহ আটক করা হয়েছে। গতকাল তাঁর বাড়ি থেকে এ চাল উদ্ধার করা হয়।

মুলাদী থানার ওসি জিয়াউল হাসান জানান, জিজ্ঞাসাবাদে আল আমিন জানিয়েছেন যে তিনি সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে চাল কিনে বাড়িতে রেখেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। সেটা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে।

নড়াইল : কালিয়া উপজেলার চাচুড়ী ইউনিয়নে ভিজিএফের চাল মাথাপিছু ১০ কেজি করে দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে ছয় থেকে আট কেজি করে। ঈদের আগে ১৩ জুন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চাল বিতরণ করার পর এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক আফসার বিশ্বাস চাল তুলে একটি দোকানে নিয়ে মেপে দেখেন সাড়ে সাত কেজি হয়েছে। ওই গ্রামের মালেক বিশ্বাস ও হনুফা, ডহর চাচুড়ী গ্রামের আবুল হাসানসহ প্রায় ২০ জন একইভাবে মেপে সাড়ে সাত কেজি থেকে আট কেজি পর্যন্ত পেয়েছে।

চাচুড়ী ইউনিয়নে ৭৮৬ জনকে দেওয়ার জন্য আট টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। চাল মেপে না দিয়ে বালতিতে করে দেওয়া হয়।

ইউনিয়ন পরিষদের সচিব জাহাঙ্গীর আলম জানালেন, চেয়ারম্যান আর সদস্যরা মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েই আট কেজি করে চাল দিচ্ছেন। পরিবহনসহ নানা ধরনের খরচপাতি থাকার অজুহাতে চাল কম দেওয়া হয়।

চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম হীরোক বলেন, হয়তো মাপের সময় আধাকেজি কম হতে পারে। চাল তো আর সোনা মাপার দাঁড়িপাল্লায় মাপা হয় না। চাল উত্তোলন করে আনার সময়ই দেড় টন কালিয়াতেই বিক্রি করা হয়েছে—এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হুদা বলেন, পরিমাণে কম দেওয়ার কোনো অভিযোগ পেলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

[প্রতিবেদনটির জন্য তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নড়াইল প্রতিনিধি]



মন্তব্য