kalerkantho


পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত আরো ১১ জন

চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে ২১ দিনে নিহত ৫৮

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৫ মে, ২০১৮ ০০:০০



পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত আরো ১১ জন

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে গত বুধবার রাত থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সাত জেলায় কথিত বন্দুকযুদ্ধে ১১ জন নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ফেনী, কুমিল্লা, মাগুরায় ও কক্সবাজারে দুজন করে এবং সাতক্ষীরা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নারায়ণগঞ্জে একজন করে নিহত হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বেশ কিছু মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র। অভিযান পরিচালনাকারী পুলিশের পক্ষ থেকে এসব ঘটনার যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা মোটামুটি একই ধরনের। বলা হয়েছে, নিহত প্রত্যেকে চিহ্নিত মাদক কারবারি। মাদকের বিরুদ্ধে গত ৪ মে সারা দেশে শুরু হয়েছে র‌্যাব-পুলিশের বিশেষ অভিযান। চলমান এ অভিযানে গত ২১ দিনে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮। স্থানীয় নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন ফেনী : ফুলগাজীতে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। গতকাল ভোরের এ ঘটনায় নিহতরা হলেন ফুলগাজীর মাইজ গ্রামের মোহাম্মদ মোস্তফার ছেলে শাহ মিরন হোসেন শামীম ও মনতলা গ্রামের ফটিক মিয়ার ছেলে মজনু মিয়া ওরফে মনির। তাঁরা চিহ্নিত মাদক কারবারি বলে দাবি পুলিশের। তবে দুই লাখ টাকা না পেয়ে পুলিশ তাঁদের হত্যা করেছে বলে দাবি করে পরিবারের সদস্যরা।

ফুলগাজী থানার ওসি হুমায়ূন কবির জানান, গোপন খবরের ভিত্তিতে থানার পুলিশের একটি দল গতকাল রাত ৪টার দিকে সীমান্তবর্তী মুন্সীর হাট ইউনিয়নের জামমুড়া এলাকায় অভিযান চালায়। টের পেয়ে মাদক কারবারিরা গুলি ছুড়লে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। এ সময় শামীম ও মনির গুলিবিদ্ধ হন। পরে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে একটি কাটা বন্দুক, তিনটি কার্তুজ, ৭০০ পিস ইয়াবা ও ২০০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। নিহতদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মাদকসংক্রান্ত প্রায় এক ডজন মামলা রয়েছে।

টাকা না পেয়ে হত্যার অভিযোগ : এদিকে দুই লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় শামীম ও মনিরকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি পরিবারের। শামীমের মা আনোয়ারা বেগম বলেন, ফুলগাজী থানার দারোগা শফিক বুধবার সন্ধ্যায় শামীমকে ধরে নিয়ে যান। পরে দুই লাখ টাকা দাবি করেন। কিন্তু দিতে না পারায় রাতেই পুলিশ শামীমকে হত্যা করে। থানায় গেলে শামীমকে একবার দেখতেও দেওয়া হয়নি।

মনিরের বোন রেজিনা বেগম দাবি করেন, তাঁর ভাই ফেনী শহরের বড় মসজিদ রোড এলাকায় তাঁর বাসায় ছিলেন। গত বুধবার রাতে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে তাঁকে ওই বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে দেড় লাখ টাকা দাবি করা হয়। দিতে না পারায় মনিরকে হত্যা করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই ছাত্রদলের রাজনীতি করেন। তাই এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকটি হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হয়েছিল।’

অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি হুমায়ূন কবির বলেন, ‘চাঁদা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ওরা চিহ্নিত মাদক কারবারি।’

কক্সবাজার : কক্সবাজারের মহেশখালীতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে একজন ‘ইয়াবা কারবারি’ নিহত হয়েছে। অপরদিকে স্থানীয় এমপি আবদুর রহমান বদির ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত আরেক ইয়াবা কারবারি টেকনাফ সীমান্তে ধরা পড়েছে। পুলিশ জানায়, মহেশখালী দ্বীপের বড় মহেশখালী ইউনিয়নের মুন্সির ডেইল নামক স্থানে ইয়াবা কারবারি মোস্তাক আহমদ (৩০) বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ আফরুজুল হক টুটুল জানান, দুই দল ইয়াবা কারবারির মধ্যে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে সেখানে পুলিশ গিয়ে মোস্তাকের লাশ উদ্ধার করে।

অন্যদিকে টেকনাফ সীমান্তের সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আকতার কামালকে (৩২) গত রাত সাড়ে ৮টার দিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা আটক করেছে। টেকনাফ থানা পুলিশ জানায়, ইউপি সদস্য আকতার কামালের বিরুদ্ধে ইয়াবা পাচারের মামলা রয়েছে। আকতার কামালের ভগ্নিপতি সাবেক ইউপি মেম্বার সোলতান আহমদ রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি মাইক্রোবাস নিয়ে গিয়ে আমার শ্যালক আকতার কামালকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে।’

পর্যটন নগরীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার পাশে ইয়াবা কারবারিদের আস্তানা থেকে হাসান (৩৫) নামের এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। কক্সবাজার সদর মডেল থানার পুলিশ গতকাল রাত সাড়ে ৩টায় লাশটি উদ্ধার করে। নিহত হাসান শহরের কলাতলী আদর্শ গ্রাম এলাকার মৃত খুইল্যা মিয়ার ছেলে।

সদর মডেল থানার ওসি ফরিদ উদ্দীন খন্দকার জানান, ইয়াবা কারবারিদের দুই গ্রুপে গোলাগুলির খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ইয়াবা কারবারি হাসানের লাশ উদ্ধার করা হয়। তাঁর বুকে ও পিঠে তিনটি গুলি বিদ্ধ হয়েছে। ঘটনাস্থলে একটি বন্দুক ও দুই রাউন্ড গুলি পাওয়া যায়।

এদিকে নিহতের বড় ভাই শহর মুল্লুক দাবি করেন, গত মঙ্গলবার সাহরি খাওয়ার সময় সাদা পোশাকধারী কিছু লোক এসে বাড়ি থেকে হাসানকে তুলে নিয়ে যায়।

কুমিল্লা : পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে কুমিল্লায় আরো দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি আবুল ফয়সাল জানান, গত বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে পৌর এলাকার রামরায় থেকে তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি বাবুুল মিয়া ওরফে লম্বা বাবুলকে আটক করা হয়। মাদকের খোঁজে রাত ১টার দিকে তাঁকে নিয়ে আমানগন্ডার মন্তাজের বাগানে অভিযানকালে বাবুলের সহযোগীরা গুলি ছুড়লে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। দুই পক্ষের গোলাগুলিতে বাবুল ছাড়াও এসআই মোজাহের, কনস্টেবল মিজান ও ফরিদ আহত হন। আহত বাবুলকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে একটি এলজি ও ২০০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। ওসি আরো জানান, বাবুলের বিরুদ্ধে মাদক আইনে পাঁচটি মামলা রয়েছে।

অন্যদিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি নজরুল ইসলাম জানান, গোপন খবর পেয়ে গত বুধবার দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরনো ট্যাংক রোডের গোয়ালমথন এলাকায় অভিযানকালে টের পেয়ে মাদক কারবারি রাজিব (২৫) ও তাঁর সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পুলিশও ১৭ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন রাজিব। পরে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

মাগুরা : জেলা শহরে দুটি মাদক কারবারি গ্রুপের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মিজানুর রহমান কালু (৪৫) ও শেখ আইয়ুব হোসেন (৫০) নিহত হয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসা ও ৫০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করা হয়।

মাগুরার সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) ছয়েরউদ্দিন জানান, বুধবার রাত দেড়টার দিকে শহরতলির পারনান্দুয়ালী সরকারি হাউজিং প্রকল্প এলাকায় দুই মাদক কারবারি দলের বন্দুকযুদ্ধের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই ব্যক্তিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। তাঁদের উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত বলে জানান। আইয়ুবের নামে হত্যা ও মাদক আইনে ২১টি এবং কালুর বিরুদ্ধে ১৮টি মামলা রয়েছে।

তবে নিহত কালুর স্ত্রী কাজল বেগম জানান, গত মঙ্গলবার রাতে চার-পাঁচ ব্যক্তি পুলিশ পরিচয়ে বাড়ি থেকে কালুকে নিয়ে যায়। পরে খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে তাঁরা লাশ শনাক্ত করেন। তবে নিহত আইয়ুবের ব্যাপারে তাঁর পরিবারের কেউ কথা বলতে চায়নি।

তবে ভায়না এলাকার বাসিন্দা রাফিজুল ও নিজনান্দুয়ালী এলাকার রাজিবসহ অনেকে জানায়, কালু ও আইয়ুব দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত।

সাতক্ষীরা : কালীগঞ্জে এক ব্যক্তির গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল ভোরে উপজেলার চৌবাড়িয়া গ্রাম থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়। নিহত আব্দুল আজিজ (৪৫) সদর উপজেলার পরানদহ গ্রামের কেরামত আলীর ছেলে। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, পাঁচ রাউন্ড গুলি ও ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়।

ওসি হাসান হাফিজুর রহমান জানান, গুলিবিদ্ধ এক মাদক কারবারির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশের চোয়ালে ও গলায় দুটি গুলির চিহ্ন রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া : আখাউড়ায় পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে আমির খাঁ (৪০) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তাঁর বাড়ি উপজেলার চানপুর গ্রামে। পুলিশ জানায়, সহকারী পুলিশ সুপার (কসবা সার্কেল) আব্দুল করিম ও আখাউড়া থানার ওসি মোশারফ হোসেন তরফদারের নেতৃত্বে উপজেলার বনগজ এলাকার স্টিল ব্রিজের কাছে অভিযান চালানো হয়। এ সময় আমির খাঁ ও তাঁর সহযোগীরা পুলিশের ওপর গুলি ছুড়লে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। পরে আমির খাঁকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।  

আখাউড়া থানার ওসি জানান, আমির খাঁ জেলার শীর্ষ মাদক কারবারি ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ১২টি মামলা রয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে মাদক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ : সিদ্ধিরগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সেলিম ওরফে ফেন্সি সেলিম (৩২) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে একটি শুটারগান, ছয় রাউন্ড গুলি, একটি ছুরি, পাঁচ বোতল ফেনসিডিল ও ৬০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসিসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন। 

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি আব্দুস সাত্তার জানান, মাদক বিক্রেতা সেলিমকে মাদক বিক্রির সময় হাতেনাতে ধরতে গতকাল ভোরে দক্ষিণ নিমাইকাসারী ক্যানেলপারে গেলে সেলিম ও তাঁর সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও গুলি চালায়। এ সময় ঘটনাস্থলেই গুলিবিদ্ধ হন ফেন্সি সেলিম। তাঁকে শহরের খানপুর হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

পুলিশ জানায়, সেলিম ছাড়াও তাঁর বাবা আবুল কাশেম ওরফে গাঞ্জা কাশেম এবং মা মর্জিনা বেগমের বিরুদ্ধে মাদকের একাধিক মামলা রয়েছে।


মন্তব্য