kalerkantho


সিটি করপোরেশন নির্বাচন

প্রচারের সুযোগ এমপিদেরও

বিশেষ প্রতিনিধি   

২৫ মে, ২০১৮ ০০:০০



প্রচারের সুযোগ এমপিদেরও

সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের প্রচার চালানোর সুযোগ দিয়ে আচরণ বিধিমালা সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী সিটি নির্বাচনের প্রচারে কোনো প্রতীক প্রতিকৃতি ছাড়া অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করা যাবে না। কোনো প্রার্থীর প্রতীক যদি ধানের শীষ বা অন্য কোনো খাদ্যদ্রব্য হয় তাহলে তা সরাসরি নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করা যাবে না। সিটি করপোরেশন (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালায় এ ধরনের ১১টি বিষয় সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সম্মতিতে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে এমপিদের প্রচারের সুযোগ বিষয়ে পাঁচ সদস্যের কমিশনের একজন নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি দেন।

ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ সাংবাদিকদের এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন সিটি করপোরেশন (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা ২০১৬-এর ১১টি বিষয় সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে এ নির্বাচনে নির্বাচনী পোস্টার কোথাও সাঁটানো যাবে না; ঝুলিয়ে রাখতে হবে। প্রার্থীর সংজ্ঞার ক্ষেত্রে মেয়র, কাউন্সিলর, সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর না বলে ‘যেকোনো প্রার্থী’ বুঝতে হবে। অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের তালিকা থেকে সংসদ সদস্যদের বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কাজে তাঁরা সরকারি সার্কিট হাউস, ডাকবাংলো বা সরকারি কোনো কার্যলয় ও সরকারি কোনো কর্তৃপক্ষকে ব্যবহার করতে পারবেন না।

হেলালুদ্দীন বলেন, নির্বাচনী প্রচারে কোনো প্রতীকের প্রতীকৃতি ছাড়া অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করা যাবে না। আগে জীবন্ত প্রাণী সম্পর্কে এ বিধান

 ছিল। এখন সব প্রতীকের ক্ষেত্রে এ বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে। মেয়র পদে প্রতি থানায় একটির বেশি ক্যাম্প স্থাপন না করার বিধি ছিল। কমিশন এ ক্ষেত্রে থানার বদলে ওয়ার্ড শব্দটি স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সংগতি রেখে নির্বাচনী প্রচারে টিভি, ভিসিআর—এসব ব্যবহারের পক্ষেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী রবিবার এসব সংশোধনী আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে।

আগামী ২৬ জুন গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশোধিত এই বিধিমালা প্রযোজ্য হবে কি না জানতে চাইলে ইসি সচিব বলেন, ‘ভেটিংয়ের জন্য কত দিন সময় লাগবে তা আমরা জানি না। এ জন্য গাজীপুরে এ বিধমালা ব্যবহারের সুযোগ কম।’ 

সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারে সংসদ সদস্যদের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি দলের দাবিই ইসি মেনে নিল কি না জানতে চাইলে ইসি সচিব বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও ইসির স্টেকহোল্ডার। তাদের সুপারিশ যুক্তিপূর্ণ ছিল।

সংসদ সদস্য পদ লাভজনক নয় এবং ইসি তাঁদের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবেও মনে না করায় তাঁরা স্বপদে থেকেও সিটি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন কি না জানতে চাইলে ইসি সচিব বলেন, এর জন্য মূল আইনটি সংশোধন করা প্রয়োজন।

এক প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব কালের কণ্ঠকে বলেন, সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী প্রচারের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এক নির্বাচন কমিশনারের নোট অব ডিসেন্ট দেওয়ার ঘটনাটি সত্য। এ বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

এদিকে নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, সংসদ সদস্যের ঢালাওভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রচার চালানোর সুযোগ দেওয়ায় সবার সমান সুযোগ থাকবে না। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ বিষয়ে গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি মনে করি, নির্বাচন কমিশন একটি খারাপ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তে নির্বাচনব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’

গত ১৩ এপ্রিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার সঙ্গে বৈঠক করে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল এ বিষয়ে নির্বাচনী আচরণবিধি সংশোধনের দাবি জানিয়েছিল। এরপর ১৯ এপ্রিল এ বিষয়ে বৈঠক করে কমিশন। বৈঠকে একজন নির্বাচন কমিশনার এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বলেন, সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী প্রচারের সুযোগ দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে। অপর একজন কমিশনার সব সংসদ সদস্যকে এ সুযোগ দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেন। এর পরও সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের ওই দাবির পক্ষেই কমিশনের সিদ্ধান্ত হয় এবং আইন ও বিধি সংস্কার কমিটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানমকে এ বিষয়ে সুপারিশ প্রস্তুত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সিটি করপোরেশন (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালার ২(১৩) বিধিতে ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’র সংজ্ঞা দেওয়া আছে। এতে বলা হয়েছে, ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী বা তাঁদের সমপদমর্যাদার কোনো ব্যক্তি, সংসদ সদস্য এবং সিটি করপোরেশনের মেয়রকে বোঝাবে। ২২ নম্বর বিধিতে বলা হয়েছে, ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচনপূর্ব সময়ে নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণায় বা নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। তবে শর্ত থাকে যে এ ধরনের ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ভোটার হলে তিনি কেবল ভোট দেওয়ার জন্য কেন্দ্রে যেতে পারবেন।’

ইসি সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ২০১৬ সালের এই বিধি অনুসারে সিটি করপোরেশন এলাকার সংসদ সদস্যদের নিজ এলাকায় অবস্থান করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা ছিল না। কিন্তু ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’র সংজ্ঞা থেকে সংসদ সদস্যদের বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ায় এখন তাঁরা নির্বাচনী প্রচারেও অংশ নিতে পারবেন।

এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সব সংসদ সদস্যকে এ সুযোগ দেওয়া হবে, নাকি সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যরাই এ সুযোগ পাবেন, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের আইন ও বিধি সংস্কার কমিটি একমত ছিল না। কমিটির সদস্যদের এক পক্ষের যুক্তি ছিল, সব সংসদ সদস্যকে এ সুযোগ দেওয়া হলে পরিস্থিতি ১৯৯৪ সালে অনুষ্ঠিত মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনের মতো হতে পারে। ব্যাপক বিতর্কিত ওই নির্বাচনের প্রচারে সংসদ সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতি সে সময় নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সব সংসদ সদস্যকে প্রচার চালানোর সুযোগ দিলে একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। অন্য পক্ষের যুক্তি ছিল, সংসদ সদস্যরা অফিস অব প্রফিট বা প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত নন। অন্যান্য নাগরিকের মতো তাঁদেরও নির্বাচনী প্রচার চালানোর অধিকার রয়েছে। গতকাল কমিশন সভায়ও এ বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশের ঘটনা ঘটে।

মেয়র বা চেয়ারম্যান পদে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার পক্ষে আইন সংশোধনের পর ২০১৫ সালে পৌরসভা নির্বাচনে এমপিদের প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ওই বছরের নভেম্বরে প্রণীত পৌরসভা (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা ২০১৫-এর ২২ নম্বর বিধিতে এমপিদের ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁদের নির্বাচনী প্রচার বা কার্যক্রমে নিষিদ্ধ করা হয়। সে সময়ও এ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে সব নির্বাচন কমিশনার একমত ছিলেন না। কিন্তু ওই নিষেধাজ্ঞার পক্ষেই সরকারের অবস্থান ছিল।

 


মন্তব্য