kalerkantho


‘এই কষ্ট আর সহ্য হয় না’

বৃষ্টির তিন ঘণ্টা পরও হাঁটুপানি

আরিফুর রহমান ও রফিকুল ইসলাম   

২৪ মে, ২০১৮ ০০:০০



‘এই কষ্ট আর সহ্য হয় না’

জলমগ্ন সড়কে যানজট। অগত্যা হাঁটুপানি-কোমরপানিতেই হেঁটে যাত্রা। গতকাল রোকেয়া সরণির দৃশ্য। ছবি : লুৎফর রহমান

জহির উদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ী গতকাল বুধবার মাওয়া ঘাট থেকে মিরপুর ১১ নম্বরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে যখন বাসে চাপেন তখন দুপুর ১২টা। রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় যানজটে আটকে থাকা বাসে তাঁর সঙ্গে যখন এ প্রতিবেদকের কথা হয় তখন ঘড়ির কাঁটায় বিকেল পৌনে ৪টা। চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ। বললেন, ‘ভাই, আর কষ্ট সহ্য হচ্ছে না। কিন্তু কী করব। বিকল্প কোনো রাস্তাও নেই।’

আবার নারায়ণগঞ্জ থেকে হিমাচল বাসে করে মিরপুর ১২ নম্বরে যাচ্ছিলেন সৌরভ রহমান। যানজটে অতিষ্ঠ হয়ে একপর্যায়ে আগারগাঁও থেকে হেঁটেই গন্তব্যে রওনা দেন তিনি।

বাংলামোটর থেকে কাজীপাড়ার উদ্দেশে দুপুর দেড়টায় বিহঙ্গ পরিবহনের বাসে ওঠেন এক যাত্রী। যানজটের কারণে কচ্ছপগতিতে চলা বাসটি যখন তালতলা বাসস্ট্যান্ডে থামে তখন বিকেল সাড়ে ৩টা। তালতলা থেকে কাজীপাড়া পর্যন্ত বাকিটা পথ হেঁটেই রওনা হন তিনি।

এদিকে ভারি বৃষ্টি শেষ হওয়ার তিন ঘণ্টা পর বিকেল ৩টায় গিয়েও দেখা গেছে মিরপুরের কালশী রোড পানিতে থইথই, তাতে ভাসছে ময়লা। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। সেই পানি মাড়িয়েই বাসায় ফিরছে মানুষ। কেউ কেউ বাড়তি ভাড়া দিয়ে রিকশায় পার হচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ গজের এই রাস্তা।

রাজধানীর আগারগাঁও থেকে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর, পল্লবী, কালশী সড়কটি গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কার্যত ছিল স্থবির। সকালে টানা কয়েক ঘণ্টার ভারি বর্ষণে সড়কে দিনভর লেগে থাকে তীব্র যানজট। কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, পর্বতা, মিরপুর ১০ নম্বর ও পল্লবীতে দেখা দেয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। আগারগাঁও থেকে রোকেয়া সরণি হয়ে মিরপুর ১০ নম্বরে যাওয়ার রাস্তার ফুটপাত ধরে ছিল মানুষের ঢল। বেশির ভাগই বাস ছেড়ে হেঁটেই গন্তব্যে রওনা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ ও নারীরা।

সরেজমিনে গেলে আগারগাঁও থেকে মিরপুর পর্যন্ত কথা হয় বাসচালক, যাত্রী, সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক ও কয়েকজন রিকশাচালকের সঙ্গে। প্রত্যেকের চোখে-মুখে ছিল বিরক্তির ছাপ। মিরপুর সড়কে সদরঘাট থেকে আসা বিহঙ্গ ও ইউনাইটেড পরিবহনের বাস, মাওয়া ঘাট থেকে আসা স্বাধীন এক্সপ্রেস, নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা হিমাচল, গুলশান থেকে আসা বিহঙ্গ, যাত্রাবাড়ী থেকে আসা খাজা বাবা ও শিকড়—সব পরিবহনের বাস বলতে গেলে ছিল ফাঁকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রোকেয়া সরণিতে আসা বৈশাখী বাসও ফাঁকা হয়ে যায়। বিভিন্ন রুট থেকে আসা বাসগুলো এই সড়কের আগারগাঁও পর্যন্ত আসার পরই ভয়াবহ যানজটের শুরু। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থবির বাসে বসে থেকে যাত্রীরা একপর্যায়ে হেঁটে রওনা হয় গন্তব্যে।

এদিকে মূল সড়কের যানজটের প্রভাব পড়ে অলিগলিতেও। অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকরা বিকল্প পথে চলতে গিয়ে গলি-উপগলিতে যানজট আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। মোটরসাইকেলচালকরা উঠে গেছে ফুটপাতে। রিকশাচালকরাও উল্টো পথে রওনা হয়। এসব কারণে মিরপুর সড়ক কার্যত অচল হয়ে যায়।

একাধিক যাত্রী জানায়, জলাবদ্ধতায় আগের দিন মঙ্গলবারও রোকেয়া সরণি ছিল কার্যত অচল ও স্থবির। সেদিনও বৃষ্টিপাতের কারণে সড়কে যানজট দেখা দেয়। ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রীদের।

যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, মেট্রো রেল প্রকল্পের কাজ চলায় রোকেয়া সরণিতে ব্যাপকভাবে খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়েছে। এতে সড়কটির প্রশস্ততা অর্ধেকে নেমে এসেছে। সচল রাস্তাটুকুও খানাখন্দে ভরা। খানাখন্দের কারণে গাড়ির গতি কমে যাচ্ছে। স্যুয়ারেজ লাইন বন্ধ হয়ে পড়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এ কারণে যানজট রোকেয়া সরণির নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর রমজান মাসের এই সময়টাতে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে যাত্রীসাধারণ।

বিকেল ৩টায় কালশী এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, হাঁটু সমান পানিতে ডুবন্ত রাস্তার একাংশ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে যানবাহন। এতে ওই অংশে যানজট লেগে আছে। এতে দূরের যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েছে। আর যারা কাছের গন্তব্যে পানি ভেঙে হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করছে তারা ভয়ে ভয়ে পা ফেলছে গর্ত আছে কি না, তা দেখে চলার জন্য।

ওই এলাকার পানি নিষ্কাষণ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় এই ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে মানুষকে। তা ছাড়া রাস্তা খুঁড়ে পয়োনিষ্কাশন পাইপ ও কেবল বসানোর কাজ চলায় কালশী এলাকার মানুষের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয়। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় বৃষ্টির পানি রাস্তায় জমে থাকে দীর্ঘ সময়। আর এতে ড্রেনের ময়লা বাইরে বেরিয়ে আসে। কারো কারো বাসার গেট পর্যন্তও পানি উঠে যায়। এতে অনেকে ঘর থেকেও বের হতে পারে না।

এ ছাড়া সম্প্রসারিত রূপনগর আবাসিক এলাকায় যাওয়ার রাস্তা ও শহীদ জিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ রোড বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে। রাস্তার ডান পাশে রোজ গার্ডেন গ্রামার স্কুল এবং বাঁ পাশে রাইজিং স্কলার্স একাডেমি। মোড় থেকে সামনে এগোতেই আবাসিক ভবন। ভবনের নিচেই ছোট ছোট দোকান; কিন্তু খোলেনি একটিও। পানি কমলে দোকানগুলো খুলবে বলে জানায় স্থানীয় লোকজন।

তবে একটু দূরে দেখা গেল রড-সিমেন্ট বিক্রির একটি দোকান খোলা। এর এক কর্মী বিকেল সাড়ে ৩টায় কালের কণ্ঠকে জানান, সকাল থেকে একজন ক্রেতাও তাদের দোকানে আসেনি।

গুগল ম্যাপের তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড থেকে মাটিকাটা রোড হয়ে কালশীর সাংবাদিক আবাসিক এলাকার দূরত্ব ৬.৯ কিলোমিটার। ট্রাফিক ছাড়া স্বাভাবিকভাবে ১২ মিনিটেই এই পথ যাওয়া সম্ভব। তবে জাবালে নূর নামে একটি পরিবহনের বাসচালক সেলিম জানালেন, আধাঘণ্টার বেশি সময়েও সাংবাদিক আবাসিক এলাকা পার হওয়া যায়নি।

বিকেল সাড়ে ৩টার একটু পরে ওই গাড়ির যাত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘দুপুর আড়াইটায় বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে উঠেছি। কিন্তু এখনো গন্তব্যে যেতে পারিনি।’

কালশীর সাংবাদিক আবাসিক এলাকার সামনের রাস্তায় হাঁটুর ওপরে পানি। ওই এলাকা দিয়ে রিকশায় যাওয়ার পথে পিয়ারা বেগম নামের এক গৃহবধূ গর্তে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলেন। পরে পিয়ারা বেগম বলেন, ‘কত দিন ধরে রাস্তায় পানি জমে যায়। কেউ দেখেই না! এসব দেখার কি কোনো মানুষ নেই?’

কালশীর শহীদ জিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ রোডের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আব্দুল খালেক। দুই যুগের বেশি সময় কাটিয়েছেন এই এলাকায়। কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই এ এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়। ড্রেন ময়লায় ভর্তি। তাই বৃষ্টির পানি যেতে পারে না। এখন আবার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে। বাসা থেকেও বের হতে হয় রিকশায়।’

আবহাওয়া অফিসের দেওয়া তথ্য মতে, গতকাল সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত রাজধানীতে ৫২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। পশ্চিমা লঘুচাপটি বিহার ও তত্সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। এর প্রভাবে ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব বিভাগেই হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হবে আজও। কোথাও কোথাও ভারি বর্ষণও হতে পারে।

 


মন্তব্য