kalerkantho


সরকারি চাকরি

অবসরের বয়সসীমা নিয়ে অসন্তুষ্ট মুক্তিযোদ্ধারা

রেজাউল করিম   

২৪ মে, ২০১৮ ০০:০০



অবসরের বয়সসীমা নিয়ে অসন্তুষ্ট মুক্তিযোদ্ধারা

সরকারি চাকরি থেকে অবসরের বয়সসীমা নিয়ে অসন্তুষ্ট মুক্তিযোদ্ধারা। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০১৫ সালে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরকালীন বয়স ৬৫ বছরে উন্নীত করার নির্দেশ দিলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারি কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা ছিল ৫৭ বছর। মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা দুই বছর বাড়িয়ে ৫৯ বছর করে সম্মানিত করা হয়। কিন্তু পরে সরকারি কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা ৫৯ বছর করা হলে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করতে আবার এক বছর বাড়ানো হয়। প্রথমে দুই বছর, পরে এক বছর বাড়ানো সরকারের এই সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে হাইকোর্টের এক রায়ে। এ অবস্থায় সরকারি চাকরি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরকালীন বয়স ৬১ বছর করার বিষয়টি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। মুক্তিযোদ্ধারাও চেয়ে আছেন আপিল বিভাগের দিকে।

মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে আনার পর দেশ ও সরকারের কাছে কিছুই চাননি তাঁরা। বিশ্বের অনেক দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা অনেক বেশি। ভিয়েতনামসহ অনেক দেশে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধারা ৬৫ বছরেরও বেশি বয়স পর্যন্ত চাকরি করতে পারেন। বাংলাদেশে বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও মুক্তিযোদ্ধারা এ নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের যৌক্তিক দাবি আমলে নেওয়া হচ্ছে না। দুই বছর বয়স বাড়িয়ে তা আবার এক বছরে নামিয়ে আনায় তাঁরা হতাশ।

জানা যায়, বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দেড় হাজারের বেশি মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। চলতি বছরই তাঁদের বেশির ভাগের বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হবে এবং তাঁরা অবসরে যাবেন। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মুক্তিযোদ্ধাদের মতো সুবিধা পাওয়ার বিধান থাকলেও তাঁরাও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশেই মুক্তিযোদ্ধারা একটু বেশি সুবিধা পান। এটি তাঁদের যৌক্তিক পাওনা। অনেক দেশেই সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণ চাকরিজীবীদের চেয়ে বেশি সময় পর্যন্ত চাকরি করার সুযোগ পান। আমাদের দেশেও একটা উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। কিন্তু তাতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি বলে আদালতে মামলা করেন। সরকারের উচিত, মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে কোনো যৌক্তিক দাবি উত্থাপিত হলে তা বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। দেশে দীর্ঘদিন মৃুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী সরকার ক্ষমতায় থাকায় তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকার তাঁদের জন্য ধাপে ধাপে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। চাকরিতে বয়স নিয়ে একটু সমস্যা রয়েছে। আদালতে এ নিয়ে একটি মামলাও চলছে। এ অবস্থায় বয়স বাড়ানো হবে কি না, তা আদালতের রায়ের পর বলা যাবে। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সর্ব্বোচ্চ নজর দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার।

মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেক কিছু করেছেন। যার তুলনা হয় না। সরকারি চাকরিতে কিছু মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। তাঁদের অনেকে এখনো সবল। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিভাবক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। বিষয়টি তিনি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবেন বলেই তাঁরা প্রত্যাশা করছেন।

আপিল বিভাগের রায়

সরকারি চাকরি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ বছরে উন্নীত করার দাবি বেশ পুরনো। ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এ নিয়ে একটি রায় দেন। ওই রায়ে সরকারি চাকরি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ বছরে উন্নীত করার প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। এর আগে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন ২০১৫ সালের ১৬ নভেম্বরের রায়ে সেটিই বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের আবেদন (লিভ টু আপিল) নিষ্পত্তি করে তত্কালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ আপিলটি নিষ্পত্তি করেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষের আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১৫ সালে সরকারি চাকরি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়স ৬৫ বছর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আদেশটি ছিল পরামর্শমূলক। বাধ্যতামূলক নয়। কারণ, এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সরকারের নির্বাহী বিভাগের। তবে বয়স বাড়ানোসংক্রান্ত ফাইল ওই সময় মন্ত্রিপরিষদে উত্থাপন করতে যে বাধা ছিল আপিলের রায়ের ফলে সেটির সমাধান হওয়ার কথা। কিন্তু সেটিও বোধ হয় হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘আপিল বিভাগ ওই রায়ে বিভিন্ন দেশের নজির তুলে ধরে বলেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরকালীন বয়স ৬৫ বছর করা যেতে পারে। এ ছাড়া জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সম্মান দেখাতে এটুকু সরকারের করা উচিত বলে রায়ে আপিল বিভাগ মত দিয়েছিলেন।

জানা যায়, ২০০৬ সালের ১২ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে ৬৫ বছর করার প্রস্তাব মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করতে বলা হয়। ওই নির্দেশনা প্রতিপালিত না হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধা জামাল উদ্দিন শিকদার ২০১৩ সালে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। পরে আরো ৬৮০ জন মুক্তিযোদ্ধা ওই রিট আবেদনে পক্ষভুক্ত হন। আইনসচিব, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ও জনপ্রশাসন সচিবকে ওই রিটে বিবাদী করা হয়। ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি ওই আবেদনের রায়ে হাইকোর্ট বলেন, রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে বিবাদীদের ওই প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে উপস্থাপন করতে হবে। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চেম্বার আদালত হাইকোর্টের রায় স্থগিত করে নিয়মিত আপিলের আবেদন করতে বলেন। ওই বছরের ৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ আপিলের আবেদন করে।

২০১৬ সালের ১৮ জানুয়ারি সরকারি চাকরি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ বছরে উন্নীত করার প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হলে সেটি নাকচ করে দেয় মন্ত্রিপরিষদ বৈঠক। এ বিষয়ে আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দল এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। চাইলে এখনো তারা বয়স বাড়াতে পারে। এতে আইনগত কোনো বাধা নেই।

অবসরকালীন বয়স ৬১ করতে হাইকোর্টের রায়

সরকারি চাকরি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা ৬১ করতে হাইকোর্ট একটি আদেশ দিয়েছিলেন। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি এ কে এম সাহিদুল হকের ডিভিশন বেঞ্চ গত ১১ এপ্রিল এই রায় দেন। রায়ে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা ৬০ বছর নির্ধারণ করে করা আইন বাতিল ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা ৬১ বছর না করে ৬০ বছর নির্ধারণ করা ছিল বৈষম্যমূলক। এটা সংবিধানের ২৭, ২৯ ও ৩১ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। এ কারণে অবসরসংক্রান্ত এই বিধানকে অবৈধ ঘোষণা করা হলো।

রায়ে আরো বলা হয়, সরকারি কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা ছিল ৫৭ বছর। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের বয়সসীমা দুই বছর বাড়িয়ে ৫৯ বছর করে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরকারি কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা ৫৯ বছর করে সরকার। এ অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করতে অবসরের বয়সসীমা এক বছর বাড়ানো হয়। প্রথমে দুই বছর এবং পরে এক বছর বাড়ানো সরকারের এই সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরি থেকে অবসরের বয়সসীমা সাধারণ কর্মচারীদের চেয়ে দুই বছর বাড়িয়ে ৬১ বছর করার সিদ্ধান্ত দেয়। ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বলা হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়ন না করে এক বছর বাড়ানো হয়, যা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মানের শামিল। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের ৬১ বছর পর্যন্ত সরকার সব সুবিধা দেবে বলে আদালত মনে করেন। আদালত বলেন, সরকার যদি আবার কখনো সাধারণ কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ায়, সে ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের দুই বছর বেশি রাখতে হবে।

মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৪ সালের গণকর্মচারী (অবসর) আইন সংশোধন মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা ৫৭ থেকে ৫৯ বছর করা হয়। ২০১৩ সালে ওই আইন পুনরায় সংশোধন করে সরকারি চাকরিরত মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়স নির্ধারণ করা হয় ৬০ বছর। আর সাধারণ কর্মচারীদের নির্ধারণ করা হয় ৫৯ বছর। কিন্তু অবসরের বয়সসীমা ৬১ বছর না করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মুক্তিযোদ্ধা তপন কুমার সাহা ও সোনালী ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক মশির উদ্দিন।

গত ৭ মে হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ লিভ টু আপিল দাখিল করলে আপিল বিভাগের চেম্বার বেঞ্চ হাইকোর্টের রায়টি স্থগিত করেন এবং এ বিষয়ে শুনানির জন্য আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন।

রিটকারীরা জানান, এর আগে ২০১৫ সালে সরকারি চাকরি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ বছরে উন্নীত করার প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়ে আপিল বিভাগ একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আশা করা যায়, এবারও ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে আপিল বিভাগে। মুক্তিযোদ্ধারা আশা করেন অবসরের বয়সসীমা ৬১ বছর করার নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন তা বহাল থাকবে।


মন্তব্য