kalerkantho


মাদকবিরোধী অভিযান

‘বন্দুকযুদ্ধে’ সাত জেলায় নিহত আরো ৯ জন

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২২ মে, ২০১৮ ০০:০০



‘বন্দুকযুদ্ধে’ সাত জেলায় নিহত আরো ৯ জন

প্রতীকী ছবি

র‌্যাব ও পুলিশের চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। রবিবার দিবাগত রাত থেকে গতকাল সোমবার ভোর পর্যন্ত সাত জেলায় আরো ৯ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে নরসিংদী, ঝিনাইদহ, রাজশাহী ও টাঙ্গাইলে র‌্যাবের গুলিতে চারজন এবং চুয়াডাঙ্গা ও গাজীপুরে পুলিশের গুলিতে দুজন নিহত হয়েছে। আর যশোরে তিনজনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ বলেছে,  মাদক কারবারিদের মধ্যে গোলাগুলিতে তারা প্রাণ হারিয়েছে। এ নিয়ে তিন দিনে এই জেলায় কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতজনে।

মাদকবিরোধী অভিযানে র‌্যাব-পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ এ নিয়ে গত ১৮ দিনে ২৩ জন নিহত হয়েছে। আর এসব অভিযানের ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেওয়া প্রতিটি ঘটনার বিবরণ প্রায় একই। তবে নিহতদের কয়েকজনের পরিবার বলেছে, তাদের স্বজনদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে আগেই তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন বিস্তারিত :

নরসিংদী : র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নরসিংদীর শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ও নিয়ন্ত্রক ইমান আলী (২৮) নিহত হয়েছে। গতকাল ভোরে পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল খালিশারটেক এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তলসহ বিপুল ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ সময় র‌্যাবের দুই সদস্য আহত হন বলে জানান র‌্যাব-১১-এর কম্পানি কমান্ডার জসিম উদ্দিন।

র‌্যাব সূত্র জানায়, ইমান আলী খালিশারটেকে নিজ বাড়ির পাশে ইয়াবার চালান আদান-প্রদান করছে—এমন খবরের ভিত্তিতে র‌্যাব-১১ অভিযান চালায়। টের পেয়ে ইমান আলী ও তার দুই সহযোগী গুলি ছোড়ে। র‌্যাবও পাল্টা গুলি চালালে ইমান আলী গুলিবিদ্ধ হয়। বাকি দুজন পালিয়ে যায়। গুরুতর অবস্থায় ইমান আলীকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

কম্পানি কমান্ডার জানান, ইমান আলী জেলার মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, বিস্ফোরক, অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে এক ডজন মামলা রয়েছে।

ঝিনাইদহ : কালীগঞ্জ উপজেলার নরেন্দ্রপুর গ্রামে রবিবার রাতে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সবদুল ইসলাম মণ্ডল (৪৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। র‌্যাব-৬-এর ঝিনাইদহ ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার সহকারী পুলিশ সুপার গোলাম মোর্শেদ জানান, রবিবার রাতে নরেন্দ্রপুর গ্রামের তেমাথায় চেকপোস্ট বসিয়ে র‌্যাব তল্লাশি শুরু করে। রাত দেড়টার দিকে সবদুল মণ্ডল ও তার সহযোগীরা মোটরসাইকেলযোগে মাদক নিয়ে যাওয়ার পথে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় মাদক কারবারিরা র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে র‌্যাবও গুলি চালায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সবদুলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে মৃত ঘোষণা করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি নাইন এমএম পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলি, ১০০ বোতল ফেনসিডিল, ১৫০টি ইয়াবা ও একটি হেলমেট উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তিন র‌্যাব সদস্যও সামান্য আহত হন।

টাঙ্গাইল : ঘাটাইল উপজেলার দেউলাবাড়ীতে রবিবার রাতে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আবুল কালাম আজাদ খান (৪২) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়। তার বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত প্রায় ছয়টি মামলা রয়েছে বলে র‌্যাব জানায়।

টাঙ্গাইল র‌্যাব-১২, সিপিসি-৩-এর কমান্ডার মেজর মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম জানান, দেউলাবাড়ীতে একটি ইটভাটার সামনে মাদকের আড্ডায় অভিযান চালায় র‌্যাব। টের পেয়ে তারা র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। র‌্যাবও পাল্টা গুলি ছুড়লে আবুল কালাম আজাদ গুলিবিদ্ধ হয়। পরে তাকে জেনারেল হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় র‌্যাবের এএসআই (এবি) ছামিদুল ইসলাম ও ল্যান্স নায়েক আনিছুর রহমান সামান্য আহত হন।

ঘটনাস্থল থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, তিন রাউন্ড গুলি, একটি ম্যাগাজিন, ১০০ বোতল ফেনসিডিল, এক হাজার ৫০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

রাজশাহী : পুঠিয়ায় র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাদক ব্যবসায়ী লিয়াকত শিকদার (৪৫) নিহত হয়েছে। রবিবার রাত ১২টার দিকে উপজেলার বেলপুকুর ইউনিয়নের ক্ষুদ্র জামিরা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত লিয়াকত উপজেলার নামাজগ্রাম গ্রামের জাক্কার মণ্ডলের ছেলে ও স্থানীয় বানেশ্বর ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি ছিল। তার বিরুদ্ধে ১১টি মামলা রয়েছে।

র‌্যাব জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাবের একটি দল বেলপুকুরে মাদকবিরোধী অভিযান চালায়। এ সময় মাদক ব্যবসায়ীরা র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে র‌্যাব পাল্টা গুলি চালালে লিয়াকত নিহত হয়। এ ঘটনায় র‌্যাবের দুই সদস্যও আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, এক রাউন্ড গুলি ও গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়।

তবে নিহতের পরিবার জানায়, রবিবার দুপুরের আগে লিয়াকতকে র‌্যাব পরিচয়ে মোবাইল ফোনে কল করে ডেকে নেওয়া হয়। এর পর থেকে সে নিখোঁজ ছিল।

বেলপুকুর থানার ওসি গোলাম মোস্তফা জানান, ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা : জীবননগর উপজেলার উথলী গ্রামে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ জোনাব আলী নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। গতকাল ভোরের এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তি একজন মাদক বিক্রেতা বলে দাবি করেছে পুলিশ। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

জীবননগর থানার ওসি মাহমুদুর রহমান জানান, উথলী গ্রামের মহসিন আলীর ছেলে একাধিক মাদক মামলার আসামি জোনাব আলীকে আটক করার জন্য রাত ৩টার দিকে পুলিশ অভিযান চালায়। পুলিশ জীবননগর সন্ন্যাসীতলায় পৌঁছলে জোনাব আলী গুলি ছুড়তে শুরু করে। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। একপর‌্যায়ে জোনাব আলী পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি ওয়ান শুটারগান, দুই রাউন্ড গুলি ও তিনটি হাঁসুয়া এবং এক বস্তা ফেনসিডিল জব্দ করা হয়।

যশোর অফিস : রবিবার গভীর রাতে যশোরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তিনজন নিহত হয়েছেন। এঁদের প্রত্যেকের মাথায়ই গুলি বিদ্ধ হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে গোলাগুলিতে তাঁরা প্রাণ হারান। এঁদের মধ্যে দুজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন শার্শা উপজেলার টেংরা জামতলা গ্রামের সিরাজুল ইসলাম ওরফে দুখি (৪০) এবং মহিষাকুড়া গ্রামের মুত্তাজুল মোড়ল ওরফে মুক্তা (৩৫)। এ নিয়ে যশোরে গত তিন দিনে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সাতজন নিহত হলো।

কোতোয়ালি থানার ওসি আজমল হুদা জানান, রবিবার গভীর রাতে সদর উপজেলার খোলাডাঙ্গা ও মণ্ডলগাতির মাঝামাঝি জায়গায় দুই দল মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে বন্দুকযুদ্ধের খবর পায় পুলিশ। ঘটনাস্থলে পুলিশ ফোর্স গেলে অস্ত্রধারীরা পালিয়ে যায়। সেখান থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির মরদেহ এবং দুটি শাটার গান ও দুই রাউন্ড গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে একই রকম ঘটনা ঘটে সদর উপজেলার তরফনওয়াপাড়া গ্রামে। পরে সেখান থেকে দুটি মরদেহ, দুটি পিস্তল, দুই রাউন্ড তাজা গুলি, গুলির খোসা ও ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

গতকাল যশোর জেনারেল হাসপাতাল মর্গের সামনে নিহত সিরাজুল ইসলাম দুখির ছেলে রিপন বলেন, ‘আমার বাবা একজন কৃষক। ১৯ মে ভোরে দুটি সাদা রঙের মাইক্রোবাসে সাত-আটজন লোক পুলিশ পরিচয় দিয়ে বাড়ি থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায়।’

নিহত মুত্তাজুলের বড় ভাই সোহরাব হোসেনও জানান, ১৯ মে সাহরির সময় দুটি সাদা মাইক্রোবাসে করে কয়েকজন পুলিশ পরিচয়ে তাঁর ভাইকে তুলে নিয়ে যায়। গতকাল সকালে খবর পেয়ে মর্গে এসে তিনি ভাইয়ের লাশ পান।

এর আগে শনিবার রাতে শহরতলির সুজলপুরে গুলিতে ডালিম (৩৫) এবং শুক্রবার রাতে অভয়নগরে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন আবুল কালাম (৪৭), হাবিবুর রহমান (৩৮) ও মিলন কাসারী (৪০)।

টঙ্গী (গাজীপুর) : টঙ্গীতে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ রেজাউল ইসলাম রনি ওরফে বেস্তি রনি (২৭) নামের এক সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। রবিবার দিবাগত রাত সোয়া ৩টার দিকে টঙ্গীর নিমতলী এলাকার মাঠে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলির সময় সে মারা যায়। এ সময় পুলিশের দুই সহকারী উপপরিদর্শক আহত হন। টঙ্গীর এরশাদনগরের হাফিজুল ইসলামের ছেলে রনির বিরুদ্ধে টঙ্গী থানায় মাদক, হত্যা, পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৪টি মামলা রয়েছে।

টঙ্গী মডেল থানার ওসি কামাল হোসেন জানান, মাদক কেনাবেচার খবর পেয়ে পুলিশ ওই রাতে নিমতলী মাঠ এলাকায় গেলে মাদক ব্যবসায়ীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পুলিশ পাল্টা গুলি ছুড়লে মাদক ব্যবসায়ীরা পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে রনির গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ প্রায় ২০ কেজি গাঁজা জব্দ করে।

 

 

 



মন্তব্য