kalerkantho


কাতারে বৈধ-অবৈধ ৬ লাখ বাংলাদেশি কর্মী আতঙ্কে

ধরপাকড় চলছে, ছাড়িয়ে নেয় না কম্পানি

হায়দার আলী   

২১ মে, ২০১৮ ০০:০০



কাতারে বৈধ-অবৈধ ৬ লাখ বাংলাদেশি কর্মী আতঙ্কে

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ইউনিয়নের আব্দুল মজিদের ছেলে মো. আতাউর রহমান ২০১৪ সালে কাতারে গিয়েছিলেন। পরিবারের অভাব দূর করতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে গেলেও ভাগ্য তাঁর সুপ্রসন্ন হয়নি। বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা বেতনের কথা বলা হলেও দেওয়া হয়েছে ১৮ হাজার টাকা। তাও বকেয়া পড়ায় আবার দেশেই ফিরতে হলো তাঁকে।

আতাউরের মতো ৭২ জন কাতারপ্রবাসী সম্প্রতি দেশে ফিরে এসেছে। দালালদের মাধ্যমে যাওয়া ওই কর্মীদের কাতার পুলিশের অভিযানে আটক হয়ে দেশে ফেরত আসতে হয়েছে।

ফেরত আসা ওই কর্মীরা জানায়, কাতারের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই এখন প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন দিচ্ছে না। বৈধ বা অবৈধ যেই আটক হোক না কেন তাদের ছাড়িয়ে আনছে না নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মার্চ পর্যন্ত কাতারে বাংলাদেশি কর্মী গেছে সাত লাখ দুই হাজার ৫৮৭ জন। এর মধ্যে ২০১৭ সালে গেছে ৮২ হাজার ১২ জন। আর চলতি বছরের তিন মাসে গেছে ২১ হাজার ৩৪৯ জন। কিন্তু এক লাখের মতো কর্মী আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে। সে হিসাবে ছয় লাখের মতো কর্মী কাতারে এখন আতঙ্কের মধ্যে আছে।

ভুক্তভোগী শ্রমিকরা বলছে, রাস্তায় কিংবা প্রতিষ্ঠানের বাইরে অবৈধ শ্রমিকদের সঙ্গে বৈধদেরও কাতারের পুলিশ আটক করে। সে ক্ষেত্রে কম্পানিগুলো কারখানা থেকে পালিয়ে গিয়ে অবৈধভাবে অন্য কারখানায় চাকরি করছে অভিযোগ তুলে বৈধদেরও ছাড়াতে ব্যবস্থা নেয় না। প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বেতন দিতে না পারায় এই কৌশল নিয়েছে।

কাতার থেকে ফেরত আসা আতাউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কাতারে এখন ভয়ংকর অবস্থা বিরাজ করছে। সেখানের অনেক প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা কাজ করে বেতন পাচ্ছে না। আমি যে কারখানায় ছিলাম সেখানে ১২০ জনের মতো বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করত। কিন্তু মালিক চার মাস ধরে বেদন দিত না। বেতনের টাকা না পেয়ে শ্রম আদালতে মামলা করেছিলাম। কিন্তু সেটা সমাধানের আগেই গ্রেপ্তার হয়ে দেশে ফিরতে  হয়েছে।’

আতাউরের মতো ফেরত এসেছেন বগুড়ার দুপচাচিয়া উপজেলার জিয়ানগর এলাকার মাসুদ মিয়ার ছেলে মাহাবুব আলম। তিনি জানান, এক বছর আগে মেটকো রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ করে কাতারে গিয়েছিলেন তিনি। প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকার বেশি বেতন পাওয়ার কথা বলা হলেও পেয়েছেন ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। তাঁরও চার মাসের বেতন বকেয়া ফেলে কাতারের কম্পানির মালিক।

মাহাবুবের বাবা মাসুদ মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এজেন্সি আর দালালদের প্রতারণার কারণে আমরা পথের ভিখারির চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘ধারে আনা সাড়ে চার লাখ টাকার মধ্যে কিছু টাকা পরিশোধ করতে পারলেও বেশির ভাগ টাকাই দিতে পারিনি। জমিজমা বলতে কিছুই নেই। পাওনাদারদের চাপে বাড়িতে ঠিকমতো থাকতে পারি না।’

পাবনা সদর উপজেলার হেমায়েতপুর ইউনিয়নের কামারগাঁও গ্রামের মো. আকু মিয়ার ছেলে মো. আলমের অবস্থাও আতাউর ও মাহাবুবের মতো। যাওয়ার এক বছর সাত মাসের মাথায় কাতার থেকে খালি হাতে দেশে ফিরেছেন।

মো. আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মালিক বৈধ কার্ড করে দেয়নি, বেতন চার মাস ধরে দেয়নি। খাবার এবং থাকাও নিজের পকেট থেকে দিতে হচ্ছিল। নিরুপায় হয়ে বেঁচে থাকার জন্য দেশে ফিরে আসি।’

আলম ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘যে এজেন্সি ও দালালরা বেশি বেতনের কথা বলে আমাদের কাতারে পাঠাল তাদের শাস্তি কেন হবে না? আমাদের পথে বসিয়ে তারা কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে আরাম-আয়াশে থাকে।’ সরকারকে দ্রুত এসব অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, আতাউর, আলম ও মাহাবুবের মতো গত সপ্তাহে কাতার থেকে ফেরত এসেছেন বরিশালের আল আমিন, কুমিল্লার সাইফুল ইসলাম, মুন্সীগঞ্জের ইউসুফ মোল্লা, কিশোরগঞ্জের সোহেল মিয়া ও মাসুদ মিয়া, নোয়াখালীর শাকিলসহ দুই শতাধিক প্রবাসী।

এদিকে কাতারের খালিজি সোয়ান গ্রুপের প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি ৭০ জন কর্মী বেতন-ভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অফিস ও মার্কেটে ক্লিনারের কাজ দেওয়ার কথা বলে জনপ্রতি প্রায় চার লাখ টাকা নিয়ে দুটি রিক্রুটি এজেন্সি কাতারে পাঠায় তাদের। কিন্তু তাদের চুক্তি অনুযায়ী কাজ না দিয়ে সাপ্লাই কম্পানিতে পাঠায়। সেখানে যাওয়ার পর সাত মাস ধরে কোনো বেতন-ভাতাও পাচ্ছে না তারা। এখন তাদের থাকা-খাওয়ার টাকা বাংলাদেশ থেকে পাঠানো হচ্ছে।

কাতারের ওই প্রতিষ্ঠানটিতে টাঙ্গাইলের তৌহিদ ইসলাম, মো. শামিম, মো. শাকিল, উজ্জ্বল হোসেন ও শাহিন মিয়া; ময়মনসিংহের মনির হোসেন; যশোরের মো. শিপন গাজী; মানিকগঞ্জের মিলন মোল্লা; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাভেল ভূইয়া ও কাউসার মিয়া রয়েছেন বলে জানা গেছে।

কাতার থেকে ওই কর্মীদের দেশে ফেরত আনা এবং জড়িত রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে সম্প্রতি ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের পক্ষ থেকে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ডের কাছে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।



মন্তব্য