kalerkantho


উন্নয়ন ইস্যুতে আস্থায় ছিলেন খালেক

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



উন্নয়ন ইস্যুতে আস্থায় ছিলেন খালেক

ছবি: কালের কণ্ঠ

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থীকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির ঘাঁটিতে কেন খুলনাবাসী এবার তাঁকে নির্বাচিত করল—এ নিয়ে এখন চলছে নানা আলোচনা। তাঁকে আগেও একবার, ২০০৮ সালে খুলনার মানুষ মেয়র নির্বাচিত করেছিল; কিন্তু পরবর্তী ২০১৩ সালে নির্বাচনে তাঁর ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল নগরবাসী। এবার তারা কেন আবার তাঁকেই নির্বাচিত করল?

খুলনার নাগরিকসমাজের একাধিক ব্যক্তি, ভোটার, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজনীতিক হিসেবে তালুকদার খালেক এবং বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু—দুজনই খুবই গ্রহণযোগ্য। রাজপথে লড়াই-সংগ্রামে থেকে এ দুই নেতাই মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছেন।

তালুকদার খালেক আওয়ামী লীগ খুলনা মহানগর শাখার সভাপতি। একজন প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিক। চারবারের এমপি, একবারের মন্ত্রী, এক মেয়াদে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) মেয়র। এবার প্রথমবারের মতো কেসিসিতে সরাসরি দলীয় মনোনয়নের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করেছেন। তবে এই নির্বাচনে দলের ইমেজের চেয়েও ব্যক্তি খালেকের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি কাজে লেগেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তিনি বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে আরো যেসব বিষয় কাজ করেছে তা হচ্ছে—দলীয় সংহতি, অনেক পেশাজীবী ও নাগরিকসমাজের সমর্থন, প্রতিদ্বন্দ্বী দলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কাউন্সিলরের সমর্থন এবং ভোটারদের মনে নগরীর উন্নয়নের স্বার্থ।

এবারে খালেকের পক্ষে দলের নেতাকর্মীরা একাট্টা হয়ে কাজ করেছে। এ ছাড়া এই প্রার্থীর পক্ষে নানা পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠনের মানুষও মাঠে নামে। তাদের মধ্যে সাবেক খেলোয়াড়, সাংস্কৃতিককর্মী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও সাংবাদিকদের সংগঠনের পাশপাশি ছিল ঝালকাঠি সমিতি, খুলনাস্থ দাকোপ সমিতি, ডুমুরিয়া সমিতি প্রভৃতি। এসব সংগঠনের একাধিক সদস্য বলেছেন, খুলনার উন্নয়ন প্রশ্নে তাঁরা তালুকদার খালেককেই সঠিক ব্যক্তি মনে করেছেন।

এ ছাড়া অন্তত আধাডজন বিএনপি দলীয় কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মেয়র পদে তালুকদার খালেকের পক্ষে কাজ করেছেন। বিএনপি নেতা ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শেখ হাফিজুর রহমান একটি সভায় প্রকাশ্যেই খালেকের প্রশংসা করে জানান, একাধিকবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর হিসেবে তিনি মেয়র খালেকের সময়েই কাজ করে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছিলেন।

প্রসঙ্গত, কেসিসির ২৮ বছরের ইতিহাসে ২৩ বছরই বিএনপির দুই নেতা মেয়র ছিলেন। খালেক এক দফা (২০০৮-১৩) দায়িত্ব পালন করেন। মেয়র হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালে খালেক খুলনার জন্য বেশ কিছু উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করেন। বিশেষ করে খুলনার রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, পানি সমস্যা সমাধানে বড় প্রকল্প গ্রহণ এবং জলাবদ্ধতামুক্ত নগরী গড়তে ২২টি খালের অবৈধ দখলমুক্ত করা প্রভৃতি নগরবাসীর ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। উপরন্তু তালুকদার খালেক বৃহত্তর খুলনার সন্তান। নজরুল ইসলাম মঞ্জু মাদারীপুরের সন্তান। এতে খুলনার আঞ্চলিক বেশির ভাগ ভোট, বিশেষ করে কাজীবাড়ি, হাজীবাড়ি, গাজীবাড়ি, খালাসীবাড়ি, বিশ্বাসবাড়ি, বন্দ পরিবার, মোড়ল পরিবার ও অন্যান্য স্থানীয় পরিবারের হর্তাকর্তারা তাঁর পক্ষে নেমে কাজ করেছেন। এসব বাড়িভিত্তিক পরিবারগুলো মুসলিম লীগ নেতা খান-এ সবুরের অনুসারী ও সুবিধাভোগী হওয়ায় অতীতে তাদের সমর্থন বিএনপির দিকে যেত।

অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী খালেকের পাশাপাশি নিজ দলের একাংশের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়েছে। বিএনপি সমর্থিত একাধিক কাউন্সিলর পদপ্রার্থী ও দলের স্থানীয় নেতাদের একাধিকজন তাঁর বিপক্ষে অবস্থান নেন। শেখ হাফিজুর রহমান ছাড়াও ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আনিছুর রহমান বিশ্বাস, নগর বিএনপি নেতা আরিফুর রহমান মিঠু, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মোদাচ্ছের হোসেন বাবুল, ১২ নম্বর ওয়ার্ডের মনিরুজ্জামান মনি, ২০ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির কাউন্সিলর পদপ্রার্থী গাউসুল আজম, ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি প্রার্থী আশফাকুর রহমান কাকন, যুবদল নেতা আক্কাস আলীসহ বেশ কিছু নেতা মঞ্জুর বিরোধিতা করে তাঁর বিপক্ষে কাজ করেছেন বলে আলোচনা রয়েছে। তাঁদের অনেকেই প্রকাশ্যে বা গোপনে মেয়র পদে নৌকার পক্ষে ভোট চান। তালুকদার খালেকের প্রশংসা করায় গত ৫ মে বিএনপি খুলনা মহানগর শাখার যুগ্ম সম্পাদক ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী শেখ হাফিজুর রহমানকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। নগর বিএনপির কোষাধ্যক্ষ ও খালিশপুর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান মিঠুর সঙ্গে মেয়র পদপ্রার্থী মঞ্জুর অনেক আগে থেকেই প্রকাশ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। একপর্যায়ে মিঠুকে নগর বিএনপির কোষাধ্যক্ষ পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। নির্বাচনকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যস্থতায় তাঁদের মধ্যে বিদ্যমান সংকট নিরসনের চেষ্টা হয়, যা খুব একটা কাজে লাগেনি।

নির্বাচনী প্রচারণায় তালুকদার আব্দুল খালেক নগরবাসীর কাছে বারবার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। বিপরীতে নজরুল ইসলাম মঞ্জু নির্বাচনকে আন্দোলনের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে ভোট প্রার্থনা করেন। তিনি বলেছিলেন, তাঁকে নির্বাচিত করলে এই সরকারের ‘স্বেচ্ছাচারিতা, দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের জবাব’ দেওয়া হবে। এ ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য খুলনাবাসী মেয়র নির্বাচনের ক্ষেত্রে খুব একটা বিবেচনায় আনেনি, উন্নয়নের বিষয়টিকেই তারা বেশি গুরুত্ব দেয়। এ বিষয়ে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির মহাসচিব শেখ আশরাফ উজ জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খুলনার উন্নয়নচিত্র আলোচনা করলে তালুকদার আব্দুল খালেকের উদ্যোগসমূহ ছিল অনেক এগিয়ে। তিনি তাঁর আমলে তাঁর কাজ দিয়ে নগরবাসীর মন জয় করেছিলেন। গতবারে তাঁকে নির্বাচিত না করায় নগরবাসী যে বঞ্চিত হয়েছে, তা সকলে উপলব্ধি করেই তাঁকে আবারও নির্বাচিত করেছে। ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে খুলনা আসার পথে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আজ দৃশ্যমান। মোংলা বন্দর সচল ও মোংলাকেন্দ্রিক উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে তালুকদার খালেকের ভূমিকা রয়েছে।’

 

 



মন্তব্য