kalerkantho


চাকরিপ্রার্থীর আত্মহত্যা নানা প্রশ্ন

এমরান হাসান সোহেল পটুয়াখালী   

১৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



চাকরিপ্রার্থীর আত্মহত্যা নানা প্রশ্ন

কুষ্টিয়া শহরে রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় নামের একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর গুরুতর অভিযোগ তুলেছে পরিবার। শিক্ষক দেবাশীষ মণ্ডলের বাবা ও ভাই ঘটনার জন্য পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) উপাচার্যকে দায়ী করছেন। তাঁদের ভাষ্য, ভিসি ১০ লাখ টাকায় দেবাশীষকে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার আশ্বাস দেন। পরে তিনি টাকার অঙ্ক ১৫ লাখ করলে সে চাপ সইতে না পেরে দেবাশীষ গত ১৪ মে আত্মহত্যা করেন। কালের কণ্ঠ’র কাছে অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন পবিপ্রবির ভিসি হারুনর রশিদ।

পবিপ্রবির কৃষি অনুষদ থেকে ২০১৪ সালে স্নাতক ও মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০১৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন দেবাশীষ প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে। পবিপ্রবির নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু না হওয়ায় কুষ্টিয়া শহরের বেসরকারি রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন তিনি। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ অনুষদের শিক্ষক ও দেবাশীষের রুমমেট আব্দুল মান্নান বলেন, ‘বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে দেবাশীষ অফিস থেকে বের হন। কিছুক্ষণ পর আমি ও অন্য আরেক রুমমেট বাসায় গিয়ে দেখি ফ্ল্যাটের মূল দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। ধাক্কাধাক্কির পরও সাড়া না পেয়ে বাড়িওয়ালা রিপন ভাইকে খবর দিই। রিপন পাশের বাসার তৃতীয় তলার সানসেট থেকে উঁকি দিয়ে দেবাশীষকে বসা দেখতে পান এবং দরজা খুলতে অনুরোধ করেন। দেবাশীষ তাতে সায় দিয়েও দরজা না খুললে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখি ফ্যানের সঙ্গে তাঁর দেহ ঝুলছে।’

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২৪ এপ্রিল পবিপ্রবির বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষকসহ প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিলে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক পদের জন্য আবেদন করেন দেবাশীষ। ১২ মে তিনি মৌখিক পরীক্ষায়ও অংশ নেন। দুই দিন পরই অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। কুষ্টিয়ায় ময়নাতদন্তের পর মরদেহ নিজ বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কাঁঠালিয়া গ্রামে নিয়ে গত মঙ্গলবার সৎকার করা হয়।

দেবাশীষ মণ্ডলের বাবা পরিমল মণ্ডল বলেন, ‘ওর কথা অনুযায়ী চাকরির জন্য ১০ লাখ ব্যাংকে জমা রেখেছিলাম। চাকরি না দিয়ে আমার ছেলেটাকে মেরে ফেলল।’ তিনি জানান, মৌখিক পরীক্ষার পর দেবাশীষ ফোন করে বাবাকে বলেন, ঘুষের জন্য আরো পাঁচ লাখ টাকা লাগবে। পরিমল আশ্বাস দেন চেষ্টা করার। এ ছাড়া তাঁর বড় ছেলের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতেও পরামর্শ দেন।

দেবাশীষের ভাই আশীষ মণ্ডল কালের কণ্ঠকে বলেন, বাড়তি পাঁচ লাখ টাকা দুয়েক দিনের মধ্যে দেওয়ার দাবি করলে তিনি ছোট ভাইকে বলেন, ‘তুই কিছু জোগাড় কর, আমিও করছি। ম্যানেজ হয়ে যাবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে আশীষ বলেন, ‘আমার ভাই ভিসি হারুন স্যারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছিলেন। পরে তাঁকে জানানো হয় এক দিনের মধ্যে ১৫ লাখ টাকা না দিলে কোনো এক আওয়ামী লীগ নেতার ভাইজিকে  চাকরিটা দেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, চাকরির জন্য আগেই জমি বিক্রি করা, বাবার বকাঝকা, নতুন করে চাপ দেওয়া—এসব হয়তো মানসিকভাবে দেবাশীষ সামলে উঠতে পারেননি।

আশীষ আরো বলেন, আগে থেকেই দেবাশীষ ঘুষে এই চাকরি নেওয়ার কথা বলছিল বলে তাঁরা পাঁচ মাস আগেই তিন বিঘা জমি বিক্রি করেন ও ছয় বিঘা জমি বন্ধক রাখেন। এ ছাড়া আরো দুই লাখ টাকা সুদে এনে মোট ১০ লাখ টাকা জোগাড় হয়।

মরদেহের সঙ্গে খুলনা গিয়েছিলেন দেবাশীষের এমন কয়েকজন সহযোগী কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁরা ভাই ও বাবার মুখে শুনেছেন, ঘুষের বাড়তি পাঁচ লাখ টাকা জোগাড় নিয়ে হঠাৎ দুশ্চিতায় পড়ে যান দেবাশীষ।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পবিপ্রবির ভিসি হারুনর রশিদ বলেন, ‘দেবাশীষ আমার ছাত্র ছিল। তার কাছে টাকা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এটা ষড়যন্ত্র। একটি মহল আমাকে হেয় করতে এসব করছে। চাকরির একটি নিয়োগ বোর্ড থাকে। আমি চাইলেও কাউকে একা নিয়োগ দিতে পারি না। সে কোন কারণে আত্মহত্যা করছে, তা আমার জানা নেই।’

 

 


মন্তব্য